নতুন আতংক এনকেফালাইটিস বাড়ছে শিশুমৃত্যু
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪৩
দেশে আরো একটি প্রাণঘাতী রোগে মৃত্যুর হার বেড়েছে। এনকেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমাসে অন্তত শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি। কিছুদিন আগে রাজধানীর ফয়জুর রহমান আইডিয়াল স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র সাকিফ জুহায়ের অর্ণব (১৩) ও সুত্রাপুর এলাকার এইচএসসি পরীক্ষার্থী রাহুল চৌধুরী আবীর (১৭) এনকেফালাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কেউ কিছু বোঝার আগেই অকালে প্রাণ হারান এই দুই জন।
দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান, এ রোগ সম্পর্কে সচেতন থাকলে এবং সময়মতো সুচিকিত্সা নিলে মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এ রোগের প্রধান লক্ষণ হচ্ছে মস্তিষ্কে তীব্র প্রদাহ। অন্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, খিচুনি ও অজ্ঞান হওয়া।
সাকিফ জুহায়ের অর্ণবের বাবা দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার সাকির আহমেদ জানান, ২১ মার্চ অর্ণবের জ্বর হয়। সঙ্গে ছিল মাথা ব্যথা। বমিও হয়েছিল কয়েকবার। এরপর শুরু হয় খিচুনি। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। এর দুই দিন পরেই মারা যায় অর্ণব। এ ব্যাপারে দেশের প্রখ্যাত স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করা হলে তারা জানান, এনকেফালাইটিসের ভাইরাস অর্ণবের মস্তিষ্কে ব্যাপক ক্ষতি করে ফেলেছিল।
সুত্রাপুর ৩ নম্বর মালাকায়টোলা লেনের বাসিন্দা রেবেকা ইসলামের ছেলে আবীরের ৪ এপ্রিল রাতে জ্বর হয়। সঙ্গে ছিল মাথা ব্যথা। কিছুক্ষণ পর বমি করতে থাকেন আবীর। পরদিন ভোরে খিচুনি শুরু হয়। আবীর জ্ঞান হারালে প্রথমে তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে স্কয়ার হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে তাকে ভর্তি করা হয়। ১৫ এপ্রিল বিকেলে আবীর মারা যান। আবীরের সহপাঠীরা এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ছেলেকে হারিয়ে তার বাবা-মা এখন পাগল প্রায়।
সম্প্রতি লাকসামের এক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা শাহীনা ইলিয়াছ (৫০) এবং চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলা সহদেবপুর গ্রামের মরহুম ওয়াহিদুর রহমান পাটোয়ারির ছেলে এইচএসসি পরীক্ষার্থী সাকিল আহমেদ মিঠু (১৮) এনকেফালাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এই মুহূর্তে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে তিনজন শিক্ষার্থী এনকেফালাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।
এনকেফালাইটিস রোগের কারণ এখনো প্রায় অজানা। উন্নত দেশে পরীক্ষা করে মাত্র ৫০ ভাগর রোগীর কারণ সনাক্ত করতে পারলেও বাকি ৫০ ভাগের কারণ অজানা থাকে। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ও উপসর্গ দেখে ১০ থেকে ১২ ভাগ রোগের কারণ সনাক্ত করা সম্ভব বলে মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকে জানানো হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও আইইডিসিআর কর্মকর্তারা জানান, এনকেফালাইটিস রোগটি দেশে অনেক আগ থেকে ছিল। হঠাত্ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অজ্ঞান এবং মৃত্যু হলে তখন জ্বীন, ভূত ধরেছে বলে নানা কথা বলা হতো। কবিরাজী, ঝাড়ফুকসহ নানা ‘চিকিত্সা’ দিয়ে রোগীর মৃত্যু আরো দ্রুত নিশ্চিত করা হতো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, এ রোগে আক্রান্ত হলে হঠাত্ জ্বরের সঙ্গে ব্যথা শুরু হয়। এরপর বমি, খিচুনি হতে পারে। মুখ দিয়ে লালা পড়তে থাকে রোগীর। অজ্ঞান হয়ে পড়ে আক্রান্ত ব্যক্তি। জাপানিজ ‘বি’ এনকেফালাইটিস কিংবা হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস এদেশে বেশি দেখা যায়। এই দুই ধরনের ভাইরাস ছাড়াও ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে এনকেফালাইটিসে আক্রান্ত হয়। এছাড়া আরও নানা কারণ রয়েছে যা সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের কাছে কিংবা নিকটতম হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন তিনি। এ ঘাতক ব্যাধি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ালে মৃত্যুর ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। কারণ ভাইরাস দ্রুত মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে ফেলে। অকেজো হয়ে যায় মস্তিস্ক।
আইইডিসিআর এর পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মাহফুজুর রহমান ও সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডাঃ মোশতাক হোসেন একই মতামত পোষণ করে বলেন, ম্যালেরিয়ার মধ্যে এক ধরনের এনক্যাপেলাইটিস রয়েছে। রাজশাহী, রংপুর ও খুলনায় এনক্যাপেলাইটিস নিয়ে আইইডিসিআর এর কার্যক্রম চলছে ২০০৭ সাল থেকে। বর্তমানে চট্টগ্রাম ও সিলেটে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রাজশাহীতে এনক্যাপেলাইটিসে আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ১ লাখে ৩ জন, খুলনা ১.৭ জন ও চট্টগ্রাম .৩ জন এনক্যাপেলাইটিসে আক্রান্ত হয়। কেমিক্যাল ব্যবহূত এলাকায় এ রোগের লক্ষণ দেখা যায়। শুটকিতে কেমিক্যাল মিশ্রিত শ্রমিকদের মাঝে এনক্যাপেলাইটিস পাওয়া যাচ্ছে। এ ঘাতক রোগ সম্পর্কে আইইডিসিআরএর পক্ষ থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম চলছে বলে উক্ত দুই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান।