কল্পলোকের সন্ধানে
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:৫১
শিল্পী রফিকুন নবী বাস্তবধর্মী রীতির কাজের সাথে যোগ করেন জ্যামিতি, রেখা আর রঙের সুষমা। ছবি কথা বলতে থাকে দর্শকদের সঙ্গে। শিল্পীর স্মৃতিতে জমে থাকা বাংলার রং, রূপ, ছন্দ অবিরাম এঁকে যান ক্যানভাসে। বাংলার বন-বনানী, সবুজ প্রান্তর, মেঠোপথ, নগরের কোলাহল, অতি চেনা পাখির ঝাঁক ছবিতে জীবন্ত করে তোলেন। বাস্তবরীতির ছবিতে আলো-ছায়ার উপস্থিতি দ্বিমাত্রিক তলে ত্রিমাত্রিকতা স্পষ্ট করে তুলেছে। গত ১২ এপ্রিল ঢাকা আর্ট সেন্টারে শুরু হয়েছে শিল্পী রফিকুন নবীর ২৮টি শিল্পকর্মের একক প্রদর্শনী; শিরোনাম ‘ইন টাচ উইথ রিয়েল’। প্রদর্শনীতে কাগজে জলরং মাধ্যমের ছবি রয়েছে ১৪টি। ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক মাধ্যমের কাজ ১৪টি। শিল্পী রফিকুন নবীর শিল্পকর্মে আমরা সবসময়ই আবহমান বাংলার রং-রূপ দেখি। এবারের প্রদর্শনীর কাজ সম্পর্কে শিল্পী তাঁর মত প্রকাশ করেন এভাবে, ‘আঁকতে বসলে যুগোপযোগিতার ব্যাপারটি মনে থাকে না, যা আসে তা হলো নিজের দীর্ঘকালের চর্চা থেকে অভ্যাসে প্রোথিত হওয়া বোধপ্রসূত দিকগুলোই। বলতে দ্বিধা নেই, এবারের ছবিতেও সে-সবই ভর করা। ভিন্ন কিছু ভাবার ইচ্ছে হলেও চিরকালের আমিই রয়ে গেলাম।’ রফিকুন নবী শিল্পীর চোখে যা দেখেন, তা-ই হুবহু আঁকেন।
বাস্তবরীতির প্রয়োগে মানুষ ও প্রকৃতির অবয়ব নির্মাণে শিল্পী দক্ষতা দেখিয়েছেন দীর্ঘসময় ধরে। প্রাচ্য বা পাশ্চাত্য সভ্যতার বিবর্তনে বাস্তবধর্মী শিল্পনির্মাণের হিড়িক দেখতে পাই ১৮ শতক থেকে ১৯ শতকের শেষ পর্যন্ত। ক্রমে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে শিল্পনির্মাণের সংজ্ঞা পাল্টে গিয়ে বাস্তব আকৃতিতে ভর করে জ্যামিতি; বিষয়ে পরিবর্তন আসে। দৈনন্দিন জীবনযাপনের সাথে সম্পৃক্ত সকল অনুষঙ্গ ছবি আঁকার বিষয় হয়ে ওঠে। প্রকৃতি অথবা মানুষের জীবনযাপনের নানা মুহূর্ত নিয়ে বাংলাদেশের অনেক শিল্পীর কাজের মধ্যে রফিকুন নবীর কাজ আলাদা করে চেনা যায়। নিসর্গচিত্রে শিল্পীর কাজের ধরন একেবারেই ভিন্ন। চড়া আকাশ, দূর দিগন্তের গায়ে প্রবহমান নদীর স্রোত স্পষ্ট করে তোলেন রঙের সূক্ষ্ম রেখায়। ক্যানভাসের গায়ে সাজানো বিষয়কে অনুপুঙ্ক্ষভাবে ফুটিয়ে তোলেন আলো-ছায়ার ব্যবহারে। গাঢ় হালকা রঙের মাঝে ঐক্য তৈরি করেন শিল্পী। সবুজ, গাঢ় রংয়ের উঁচু পাহাড় নির্মাণ করেন বাস্তব ঢঙে। দক্ষতার সঙ্গে স্থূল ও সূক্ষ্ম রেখার প্রয়োগে চিত্রতলে শক্তি তৈরি হয়েছে। এমন নিখুঁত পর্যবেক্ষণে ছবির বিষয় তৈরি ও সৃষ্টি সম্পর্কে শিল্পী জানান, ‘বাস্তবের সাথে কল্পনার মিশ্রণ কেমন হয়—তা ধরার চেষ্টা রয়েছে ক্যানভাসে; সাথে স্বপ্নীল এক ধরনের ভাব আনার চেষ্টাও। সেটি কী রকম তা-ও একটু বলি। আমি যখন প্রকৃতির দিকে তাকাই, মনে হয় দৃশ্যপট তা বদলে ভিন্ন চেহারা পেয়েছে। কিন্তু বিষয়ভিত্তিকতা ও বাস্তবধর্মীতাকে এড়ানো যায়নি।’ বাস্তবধর্মী আবহে থেকেও শিল্পী কীভাবে চিত্রতলে নিজস্ব রীতি তৈরি করতে হয় তা দর্শকদের দেখিয়েছেন। নকশাদারিত্ব শিল্পীর স্বভাবজাত হলেও হালকা রেখায় চিত্রতলে জ্যামিতির প্রয়োগ ছবিতে নিজস্ব রীতির আভাস দেয়। এ প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় আকৃতির কাজ রয়েছে দুটি। দুটি ছবির বিষয় হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষ, গণমানুষের নিত্য দিনযাপন। ‘জেলেদের অবসর’ ছবিতে ঘাটে মাছ ধরার নৌকা বাঁধা। জেলের দল অবসরে কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে, কেউ হুক্কা হাতে শায়িত বা অর্ধশায়িত, তাস খেলায় মগ্ন একদল জেলেপাড়ার মানুষের জটলা। ছবির ক্যানভাসের উপরিভাগে নীল আকাশ। তামাটে বর্ণের মানুষের ভিড়ে দূর দিগন্তে নদী মিলিয়ে যায়। প্রদর্শনীর আরেকটি বড় আকৃতির ছবিতে মানুষের নিত্য যাওয়া-আসার মাধ্যম স্টেশন বা জংশন। অপেক্ষায় থাকা একদল মানুষের জটলা এঁকেছেন নিখুঁত আলো-ছায়ার ব্যবহারে।
গত সাতটি একক প্রদর্শনী ও অসংখ্য দলীয় প্রদর্শনীতে শিল্পী রফিকুন নবীর কাজ দর্শক উপভোগ করেছেন। রং, রেখা, আলো-ছায়ার সুষম ব্যবহারে গড়ে ওঠা শিল্পকর্মগুলো দেখে আমাদের আবহমান বাংলার চিরচেনা রূপের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রদর্শনীটি শেষ হবে আগামী ২৬ এপ্রিল।
রফিকুন নবী:জন্ম ১৯৪৩ চাপাইনবাবগঞ্জ। ১৯৬৪ সালে ঢাকা কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা অনুষদ) থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৩-৭৬ সাল পর্যন্ত গ্রিসের এথেন্স স্কুল অব ফাইন আর্টসে বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করেন। দেশে-বিদেশে ৭টি একক প্রদর্শনী ও ১০০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় ও আন্তর্জঅতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেন। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে।