সেবামূলক কাজই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে অনন্তকাল

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। নিজের অর্থ-সম্পদ নিজের প্রয়োজনের পাশাপাশি সমাজের মানুষের জন্যও ব্যয় করার ক্ষেত্রে তার দায়বদ্ধতা রয়েছে। ইসলাম মানুষের ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের বিকাশের কথা বলে এবং মানুষের সমষ্টিগত মনোনিবেশ ও আচরণকেও উত্সাহিত করে। এজন্য ইসলামের আমল পদ্ধতি নীতিগতভাবে সমাজকেন্দ্রিক। মুসলমানের কর্তব্য হলো, যোগ্যতা, অর্থ-সামর্থ্য ও বিচার-বুদ্ধি দিয়ে সমাজের উপকারে এগিয়ে আসা ও ধর্মীয় ব্যাপারে পরস্পরের হিত কামনায় কাজ করা। সমষ্টি ও সমাজ কেন্দ্রিক কাজ ও ইবাদতের মধ্যে উদ্দীপনা ও বরকত থাকে, ভুলের সম্ভাবনা কম থাকে, ক্ষতিকর দিক থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং সর্বোপরি সামাজিক সুসম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধন অটুট হয়ে ওঠে। রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, “হে মানব জাতি তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা এক। সাবধান অনারবের ওপর আরবের কিংবা আরবের ওপর অনারবের, কালোবর্ণের মানুষের ওপর সাদা বর্ণের মানুষের এবং সাদা বর্ণের মানুষের ওপর কালো বর্ণের মানুষের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া ও আল্লাহ ভীতি” (আল্লামা শিবলী নুমানী, সীরাতুন্নবী, ২য় খণ্ড-১৪২)। মহান আল্ল¬াহ বলেন, “তোমরা ভালো ও খোদাভীতিমূলক কাজে, খোদাভীতির পথে একে অপরকে সহযোগিতা কর” (সূরা আল-মায়িদা-২)। তাকওয়া হলো মানুষের মহত্ত ও শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। আল্লাহভীতি ও তাকওয়া সহকারে আমাদেরকে সমাজবদ্ধ জীবন-যাপন করতে হবে। মৌলিকভাবে সকল মানুষই সমান, নিজের যোগ্যতা, অর্থ-সামর্থ্য ও বিচার-বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে পরস্পরের কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে। অর্থ-সামর্থ্য না থাকলেও আল্লাহভীতি হূদয়ে স্থান দিয়ে সমাজকল্যাণকর কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে, মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান জানাতে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নিজের চিন্তায় বিভোর না হয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করতে ও স্বার্থপরতার মূলোত্পাটন করে ভোগের পরিবর্তে ত্যাগের মনোভাব সৃষ্টিতে কাজ করতে হবে। এ সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট ঘোষণা হলো, রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, “সকল মুমিন এক ব্যক্তির মত। যদি তার চক্ষু অসুস্থ হয়, তখন তার সর্বাঙ্গ অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর যদি তার মাথায় ব্যথা হয়, তখন তার সমস্ত দেহই ব্যথিত হয়” (মুসলিম, মিশকাত, হা-৪৯৫৪)। তিনি অন্যত্র বলেন,“তুমি ঈমানদারদেরকে তাদের পারস্পরিক সহানুভূতি, বন্ধুত্ব ও দয়া-অনুগ্রহের ক্ষেত্রে একটি দেহের ন্যায় দেখবে। যখন দেহের কোন অঙ্গ অসুস্থ হয়, তখন সমস্ত শরীর তজ্জন্য বিনিদ্র ও জ্বরে আক্রান্ত হয়” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত, হা-৪৯৫৩)। রসূলুল্লাহ (স.) অন্যত্র বলেন,“আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত কোন বান্দার সাহায্য করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে” (মুসলিম, মিশকাত, হা-২০৪)। ‘সকলের তরে সকলে আমরা’ এই শ্লোগান হূদয়ে গেঁথে নিয়ে পথ চলার কথাই উপরোক্ত হাদীসগুলোয় ঘোষিত হয়েছে। দেহের অঙ্গসমুহের সতন্ত্র অবস্থান ও কর্মসীমা থাকলেও দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদে তা সমব্যথী, সহমর্মী হয়ে ওঠে। মুসলমানকেও তদ্রূপ পরস্পরের জন্য সমব্যথী ও সহমর্মী হতে হবে। প্রকৃত সহমর্মী ও সমব্যথী হয়ে উঠলে সমাজে অহেতুক ফাসাদ-হানাহানি, খুন-ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি প্রভৃতি অন্যায়-পাপের সাক্ষাত্ কদাচিত্ ঘটতো। ইসলাম তেমনই সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়। আমাদের উপলব্ধি থাকতে হবে যে, অন্যের উপকার করলে নিজের ক্ষতি হয়না বরং সকলের উপকার হয়ে থাকে। সমাজে ধীকৃত, নিন্দিত ও ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি কারো ভালোকে পছন্দ করে না, এমনকি মেনে নিতেও পারে না। তারা মুসলমান নয়, তাদের স্পর্শে সমাজের শান্তি বিনষ্ট হয়ে থাকে। পরকালে রয়েছে তাদের জন্য তদাপেক্ষা কঠিনতর প্রতিদান— শাস্তি। এজন্য মন্দকাজ ও তাকওয়া বহির্ভূত জীবন-যাপন থেকে আত্মরক্ষা করতে আমাদের সচেষ্ট থাকা উচিত্। রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, “এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। কাজেই সে তার ওপর যুলুম করবে না, তাকে লজ্জিত করবে না এবং তাকে হীন মনে করবে না। ‘তাকওয়া’ এখানে একথা বলে তিনি তিনবার নিজের বক্ষের দিকে ইংগিত করলেন। তিনি আরো বলেন, কোন ব্যক্তির মন্দ কাজ করার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে নিজের কোন মুসলমান ভাইকে হেয় জ্ঞান করে। বস্তুতঃ একজন মুসলমানের সব কিছুই অপর মুসলমানের জন্য হারাম। তার জান, মাল ও ইজ্জত” (মুসলিম, মিশকাত, হা-৪৯৫৯)। সমাজে আমরা বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজ করে থাকি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মানবতার সেবায় সাহায্য-সহযোগিতা, ত্রাণ বিতরণ তথা বাসস্থান, চিকিত্সা সামগ্রী, খাদ্য সামগ্রী বিতরণ এবং দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতা ও আত্মকর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে থাকি। এসব কাজ সমাজ উন্নয়নের জন্য খুবই প্রয়োজন। একে প্রকৃতপক্ষে মহত্ ও সফল করতে তাকওয়া বা আল্লাহভীতির মাধ্যমে করা দরকার। যারা একাজের সাথে জড়িত আছি, তারা সেদিক থেকে কতটুকু সফল তা সংশ্লিষ্টরাই বলতে পারবে। পরিতাপের বিষয় হলো, বিশেষ স্বার্থ-চিন্তা মাথায় নিয়ে এমন কাজ হরহামেশা হয়ে আসছে। দেখা যায়, মানুষের সাহায্যের নামে চলে থাকে লুটপাট। আবার অনেক সংস্থা যতটুকু সাহায্য মানুষের হাতে পৌঁছিয়ে দেয় তদাপেক্ষা অনেকগুণ বেশি ব্যয় করে থাকে তাদের নিজেদের পিছনে। আল্লাহ ও তদীয় রসূল (স.)-এর ওপর ঈমান সুদৃঢ় রেখে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারলে আল্লাহ মানুষকে হেফাজত করবেন। রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, “তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা ঈমান গ্রহণ করবে। আর তোমরা ঈমানদার হিসাবে গণ্য হবে না, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে” (মুসলিম, মিশকাত, হা-৪৬৩১)।