বিচারকরা কি বিচার বিভাগ না সরকারের নিয়ন্ত্রণে?
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩৭
নিম্ন আদালতের বিচারকদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাবেক এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলী বলেছেন, ‘এই বিচারকরা কি বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন? নাকি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন? সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানতে নিম্ন আদালত বাধ্য। কিন্তু আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে রিমান্ডে দেয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশ মানেনি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।’ মাহমুদুর রহমানের রিমান্ডে নেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আনীত রিট আবেদনের শুনানিতে তিনি এ কথা বলেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্ট রবিবার এ বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য করেছে।
বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি জাফর আহমেদের ডিভিশন বেঞ্চে গতকাল বৃহস্পতিবার এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে মোহাম্মদ আলী বলেন, গত ১১ এপ্রিল মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ১৩ দিনের রিমান্ড আদেশ দিয়েছে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। ১০ বছর আগে রাষ্ট্র বনাম বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) মামলায় হাইকোর্ট নীতি ঠিক করে দিয়েছিল, কিভাবে রিমান্ডে নিতে হবে। সেখানে বলা হয়েছে কি করতে হবে। হাইকোর্টের ওই নির্দেশনা এখনও বহাল রয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে হাইকোর্টের এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য আপিল বিভাগেরও নির্দেশ ছিলো। কিন্তু মাহমুদুর রহমানের রিমান্ড আদেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের এ নির্দেশনা মানা হয়নি। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই বিচারকরা কি বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন? নাকি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন?
তিনি বলেন, ‘আমরা বলছি না যে রিমান্ডে নেওয়া যাবে না। রিমান্ডে নেওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মানতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সংবাদ মাধ্যম থেকে জেনেছি যে রিমান্ডে নিয়ে মাহমুদুর রহমানের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে।’ এ পর্যায়ে জেষ্ঠ্য বিচারপতি বলেন, ‘আমরাতো সংবাদপত্রে দেখেছি তিনি তিনদিন ধরে অনশনে আছেন।’ জবাবে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সেটি তার ব্যক্তিগত অধিকার। আমাদের রিট সে বিষয়ে নয়। সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের রায় নিম্ন আদালতের বিচারকরা মানতে বাধ্য। এক্ষেত্রে তারা তা মানছেন না। সংবিধানে মানুষের সাধারণ মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সে প্রশ্ন নিয়ে আমরা এখানে এসেছি। ম্যাজিস্ট্রেট এসে বলুক তিনি কোন আইনে রিমান্ড আদেশ দিয়েছেন।’ মোহাম্মদ আলী বলেন, সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে উল্লেখ রয়েছে কোন ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। কাউকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না। নিষ্ঠুর বা অমানসিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না বা কারো সাথে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু আজকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদেরকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, মাহমুদুর রহমানকে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, এখানে আমরা কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চাইনি। আমরা একটি রুল চেয়েছি। আদালত রুল জারি করতে পারে। ইদানিং দেখতে পাচ্ছি, রুল জারির সময়ও কিছু কিছু বিচারপতি সিনিয়র বিচারপতির সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করছেন। এটা করে নতুন সংস্কৃতি তৈরি করেছেন।
উপস্থিত ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের দিকে ইঙ্গিত করে মোহাম্মদ আলী বলেন, তিনি ৫০ বছর ধরে এই অঙ্গনে আছেন। এই দীর্ঘ সময়ে এ ধরনের ঘটনা অতীতে শুনেননি।
জবাবে এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। হাইকোর্টে রিট হয়েছে এবং নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে দেখেছি। তারই অংশ হিসেবে আমার দেশ পত্রিকায় স্কাইপে সংলাপ প্রকাশ করা হয়েছে। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, বিষয়টি আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, মাহমুদুর রহমানের ওপর কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি। তার রিমান্ড শেষ হয়ে গেছে। তাকে সুনির্দিষ্ট মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সুনির্দিষ্ট মামলায়ও রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, হাইকোর্ট বিভাগে রিমান্ড নিয়ে যে রায় হয়, তা এখনও আপিল বিভাগে বিচারাধীন। মাহবুবে আলম বলেন, মাহমুদুর রহমানের স্ত্রী যে রিট দায়ের করেছেন সেই রিট করার এখতিয়ার তার নেই।
জবাবে মোহাম্মদ আলী বলেন, স্বামীকে নির্যাতনের ঘটনায় যদি স্ত্রী সংক্ষুব্ধ না হন তবে কে হবে? তিনি বলেন, স্বামীর জন্য স্ত্রী রিট করতে পারেন কিনা তার প্রশ্ন যখন উঠেছে তখন আমাদের মনেও প্রশ্ন উঠেছে আমরা মধ্য যুগের অনেক আগে ফিরে গিয়েছি কিনা?
গতকাল রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন এজে মোহাম্মদ আলী। তারসঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন এমপি, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম, ব্যারিস্টার খায়রুল আলম, এডভোকেট সালেহউদ্দিন, ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী প্রমুখ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও মমতাজ উদ্দিন ফকির, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেসুর রহমান প্রমুখ।