জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার চারু ও কারুকলা প্রস্তুতি
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৩, ১৭:৫৬
বাংলাদেশের অভ্যুদয় চারুশিল্প ও শিল্পীরা
সুপ্রিয় ছাত্র/ছাত্রীরা শুভেচ্ছা রইল, আশাকরি ভালই আছ। আজ তোমাদের চারু ও কারুকলা বই থেকে ১ম অধ্যায়ের ১টি প্রশ্ন অশোক কে ছিলেন? কেন তাকে শক্তিশালী সম্রাট বলা হতো?
২য় অধ্যায় “বাংলাদেশের অভ্যুদয় চারুশিল্প ও শিল্পীরা” থেকে আরো দু’টি প্রশ্ন আলোচনা করবো। আশা করি প্রশ্নোত্তরগুলো তোমরা সংগ্রহে রাখবে।
প্রথম অধ্যায়
প্রশ্ন :অশোক কে ছিলেন? কেন তাকে শক্তিশালী সম্রাট বলা হতো?
উত্তর :অশোক ছিলেন মৌর্য বংশের এক শক্তিশালী সম্রাট। সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বংশের পত্তন করেন। তার পৌত্র অশোক (২৭২-২৩২ খ্রি.পূ.) রক্তক্ষয়ী কলিঙ্গ যুদ্ধের পর বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি উত্তর ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলকে একীভূত করতে সক্ষম হন। তার রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র যা বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যের রাজধানী পাটনার পার্শ্ববর্তী স্থান। মৌর্য সাম্রাজ্য বাংলায় সম্ভবত উত্তরবঙ্গেই সীমাবদ্ধ ছিল। সম্রাট অশোকের সময়ই পুন্ড্র রাজ্য মৌর্য-সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। অশোক খুব পরাক্রমশালী সম্রাট ছিলেন। চার হাজার সুসজ্জিত হাতিসহ তার এক বিরাট বাহিনী ছিল। এই রাজ্যের রাজধানী এক বন্দর নগরীতে পরিণত হয় যা থেকে বাংলার সূক্ষ্ম সূতি বস্ত্র পাশ্চাত্যের দেশে রপ্তানি করা হতো।
সম্রাট অশোকের প্রাসাদ পারস্যের পার্সেপলিসে অবস্থিত আকামেনীয় প্রাসাদের অনুরূপভাবে নির্মিত হয়েছিল। সম্রাট অশোক হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তার আমলে উত্তর ভারতে নির্মিত স্থাপত্যকর্মের মধ্যে অশোক স্তম্ভের গড়ন ও শিল্পরীতি ক্যাপিটালটি পদ্মপাতাকৃতির। অশোক স্তম্ভ ব্যবহূত ভাস্কর্যগুলোর এক একটি প্রতীকী অর্থ আছে। অতি প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন শক্তি ও দেবদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। যেমন- বৃক্ষ, পাহাড় ইত্যাদি, যা পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ও হিন্দুধর্মে ক্রমে ক্রমে অনুপ্রবিষ্ট হতে থাকে। তার সময়ে প্রাকৃতিক পাহাড় কেটে বিভিন্ন ধর্ম মন্দির তৈরি হতো। সম্রাট অশোক অত্যন্ত সুন্দরভাবে তার রাজ্য পরিচালনা করতেন। প্রজারাও তার প্রতি অনুগত ছিল। এই পরাক্রমশালী সম্রাট খ্রিষ্টপূর্ব ২৩২ সালে পরলোকগমন করেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়
প্রশ্ন :চারু ও কারুকলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোন সালে ও কবে প্রতিষ্ঠিত হয়? এর পেছনে শিল্পীদের উদ্দেশ্য কী ছিল তা আলোচনা কর।
উত্তর :শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। তার প্রচেষ্টায় ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে ছবি আঁকার প্রতিষ্ঠান চারু ও কারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। তার সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন কামরুল হাসান, শফিউদ্দিন আহমদ, খাজা শফিক আহমেদ, শফিকুল আমিন, মোহাম্মদ কিবরিয়া। তারা সবাই চিন্তায় ও চেতনায় ছিলেন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সচেতন। শুধু ছবি আঁকা বিষয়টি হাতে-কলমে শিখবে সেজন্য শিল্পী বানাবার জন্য চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেননি। তারা চেয়েছিলেন এই চারুকলা ইনস্টিটিউটকে কেন্দ্র করে ছবি আঁকা, ভাস্কর্য ও অন্যান্য শিল্পের মাধ্যমে অন্যান্য সংস্কৃতি চর্চা ও ভাষার চর্চা ও সম্মান ইত্যাদিও প্রসারিত হবে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে, দেশ পৌঁছাবে উন্নতির লক্ষ্যে।
দ্বিতীয় অধ্যায়
প্রশ্ন :নবান্ন কী? নবান্ন চিত্র প্রদর্শনী কখন হয়েছিল ও কোন উদ্দেশ্যে হয়েছিল?
উত্তর :সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা অপরূপ প্রকৃতির দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের আছে ছয়টি ঋতু; তাই এদেশ ষড়ঋতুর দেশ। এদেশের যেমন আছে কালবৈশাখী ঝড়ের আতঙ্ক, তেমনি আছে অগ্রহায়ণ মাসে কৃষকের পাকা ধান ঘরে তোলার আনন্দ। সারাবছর পরিশ্রম শেষে চাষির ঘরে ঘরে আনন্দ। নতুন ধানের পিঠা, পায়েস খাওয়া, আনন্দ অনুষ্ঠান করা; যেমন- কবিগানের লড়াই, হা-ডু-ডু, দাড়িয়াবান্দা খেলা, যাত্রাপালার আয়োজন এবং কখনো কখনো মেলা। অগ্রহায়ণ মাসে কৃষকের ধান ঘরে তোলাকে কেন্দ্র করে যে আনন্দ উত্সব হয় তাই হচ্ছে নবান্ন। ১৯৭০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে ১০/১২ জন তরুণ চিত্রশিল্পী, কবি ও সাংবাদিকের উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমীতে বিশাল আকারে অনুষ্ঠিত হয় নবান্ন চিত্র প্রদর্শনী। এই নবান্ন প্রদর্শনী উপলক্ষ্যেই শিল্পাচার্য তার বিখ্যাত স্ক্রল ছবি নবান্ন আঁকলেন। যার দৈর্ঘ্য ৬০ ফুট ও প্রস্থ ৬ ফুট।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে সেই সময়ে নবান্ন চিত্র প্রদর্শনী ছিল বিশাল ও বিপ্লবী পদক্ষেপ। যারা এই প্রদর্শনীর উদ্যোগ নেন তাদের জন্য ছিল অনেক বাধা ও ভয়ভীতি। সেই সময়ের পাকিস্তানী সামরিক সরকার এ ধরনের উদ্যোগকে মনে করত পাকিস্তানের আদর্শ বিরোধী। অন্যদিকে কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি অপপ্রচার করে বলতে লাগল এই প্রদর্শনীর পেছনে শিল্পাচার্য জয়নুল ও উদ্যোক্তা শিল্পীদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে ইত্যাদি। কিন্তু শিল্পীরা অশেষ চেষ্টায় সব শিল্পীকে দিয়ে ছবি আঁকিয়ে এমন একটা প্রদর্শনী করলেন যা দেখে মানুষ বিস্মিত ও বিমোহিত। প্রায় হারিয়ে যাওয়া নবান্ন উত্সবের আনন্দকে শহরের মানুষদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিলেন শিল্পীরা। প্রায় সব শিল্পীই এঁকেছেন বাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার নানারকম চিত্র। অন্যদিকে আছে মহাজনের শোষণ ও নানাভাবে বঞ্চিত হওয়ার ছবি। বাংলাদেশের নদী-নালা, মাঠ-ঘাট ও বিভিন্ন ঋতুতে প্রকৃতির রূপ-বৈচিত্র্যের ছবি। নবান্ন চিত্র প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল শিল্পাচার্যের ৬০ ফুট লম্বা স্ক্রল ছবি। পরিশেষে বলা যায়, চিত্রশিল্পীদের চিন্তা-চেতনা ও শিল্পকর্মের মাধ্যম হিসেবে নবান্ন চিত্র প্রদর্শনী বাংলার মানুষকে নিজের দেশের প্রতি, নিজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসায় স্নিগ্ধ হতে ও গর্ববোধ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং আজো চর্চার মাধ্যমে তা করে যাচ্ছে।