অগ্রগতির সিঁড়ি বেয়ে শ্রীলংকা
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:১১
গত ফেব্রুয়ারির গোড়ায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে শ্রীলংকা পালন করে স্বাধীনতার ৬৫ বছর পূর্তি উত্সব। এ বছর উত্সবের থিম ছিলো ‘জাঁকজমকপূর্ণ মাতৃভূমি— উন্নত আগামী’। সিনহলি ভাষায় ‘আসিরিমাথ মাউবিনাক— ইসুরুমাথ হেথাদিনাক’। স্বাধীনতার ৬৫ বছর পর শ্রীলংকার অর্থনীতি আজ কোথায় দাঁড়িয়ে? ২৫০০ বছরের ইতিহাস যেহেতু দেশটির, সেহেতু অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ার জন্য পঁয়ষট্টি বছর হতে পারে কম সময়। কিন্তু শ্রীলংকাকে ঘিরে থাকা বাকি বিশ্বের উন্নয়নের মান, গতি ও প্রকৃতির প্রেক্ষিতে বলা যায, ৬৫ বছর নেহাত কম সময় নয়। সেই পূর্তি উত্সবের এক অনুষ্ঠানে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিভারদ কাবরাল তার ভাষণে বলেন, ‘৫৪ বছর সময় নিয়ে শ্রীলংকার মাথাপিছু আয় ১ হাজার ডলারে পৌঁছে ২০০৪ সালে। ২০০৫ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বিস্ময়কর অগ্রগতি দেখানোর পর শ্রীলংকার মাথাপিছু আয় পৌঁছে যায় ২৮৩৬ মার্কিন ডলারে।’
শ্রীলংকা ইতিমধ্যে বনে গেছে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ। পণ্যের পর্যাপ্ততা, কাঠামোগত পরিবর্তন, আধুনিকীকরণ, নগরায়ণ ও উন্নত অবকাঠামোসহ অর্থনীতির অনেক চিহ্নই এখন উচ্চ আয়ের দেশের মতো প্রদর্শন করে দেশটি। সরকারি উপাত্ত বলছে, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের হার খুবই নিম্ন এবং ক্রমহ্রাসমান। অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আধুনিক মানের সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, হাইওয়ে, ফ্লাইওভার, রাস্তা সংস্কার ও বহু উেসর বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্র নির্মাণের কর্মসূচি এগিয়ে চলেছে মহাউদ্যমে। প্রাক্কলন জানান দিচ্ছে, সামনের বছরগুলোতে পর্যটক, এফডিআই, রফতানি আয় ও রেমিটেন্স আরো বাড়বে। গড় আয়ু উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো নয়। শিক্ষিতের হার ৯৫ শতাংশেরও বেশি। মোদ্দাকথা, শ্রীলংকার অনেক কিছুতেই এখন আধুনিকীকরণ ও সমৃদ্ধির গন্ধ পাওয়া যায়।
স্বাধীনতার পর থেকে নানা অর্থনৈতিক মডেল গ্রহণ করেছে শ্রীলংকা। এর মধ্যে আছে শিল্পায়ন, জাতীয়করণ, বেসরকারিকরণ, মিশ্র (সমাজতান্ত্রিক গন্ধে পুঁজিবাদী কাঠামো), রাষ্ট্র ব্যবস্থাপিত, আবদ্ধ, সংরক্ষণ, আমদানি বিকল্প ও কাঠামোগত সংস্কার। সবশেষে তারা গ্রহণ করে পুরোপুরি উন্মুক্ত ও উদার পদ্ধতি। সকল মডেল, সুচিন্তা, প্রচেষ্টা এবং বিদেশি বিনিয়োগ ও অনুদানের সাহায্য নিয়েই শ্রীলংকার অর্থনীতি আজ বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। সম্প্রতি শ্রীলংকার এক অর্থনীতিবিদ সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে লিখেছেন, ৬৫ বছর আগে এই শ্রীলংকা (তখনকার সিলন) যখন স্বাধীনতা লাভ করলো তখন মাথাপিছু আয় ছিলো ৩৯৭ রুপি (তখনকার ১২০ মার্কিন ডলার)। যা ছিলো জাপানের সমান। ওই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু বার্ষিক আয় ছিলো মাত্র ৮৬ মার্কিন ডলার। হংকং তখন কেবল মত্স্য আহরণ কেন্দ্র। তার মানে ব্রিটিশ শাসনামলে ভালোই ছিলো শ্রীলংকার অর্থনীতি। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময়ও তাদের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিলো।
স্বাধীনতার সময় শ্রীলংকার মোট দেশজ উত্পাদনে কৃষির অবদান ছিলো ৫০ শতাংশ। ধান প্রধান গার্হস্থ্য কৃষি ছিলো তখন আকর্ষণীয়। এই ৬৫ বছরে দেশটি নানান ক্ষেত্রে সাফল্য দেখালেও গার্হস্থ্য কৃষিতে আহামরি কিছুই দেখাতে পারেনি। নতুন প্রযুক্তি, উন্নত বীজবৈচিত্র্য, প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধাদি, গুদামজাতকরণ ও যথাযথ বিপণনের অভাব স্পষ্টতই চোখে পড়ে। যে কারণে শিক্ষিত তরুণরা কৃষির সঙ্গে জড়াতেই চায় না। তবে বাগান কৃষিতে উল্টো অবস্থা। চা উত্পাদন বৃদ্ধিতে চোখ ধাঁধানো সাফল্য দেখিয়েছে তারা। আলাদা স্বাদ ও গন্ধের জন্য শ্রীলংকার চায়ের সুনাম আজ দুনিয়াজোড়া। স্বাধীনতার সময় শ্রীলংকার প্রধান রফতানিদ্রব্য ছিলো চা। আজ সেই স্থানটি দখল করে নিয়েছে তৈরি পোশাক। মাঝে তামিল সমস্যার কারণে শ্রীলংকার ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। এখন তারাই আবার দলে দলে আসতে শুরু করেছে। দারিদ্র্য নিরসনে গার্মেন্ট শিল্পকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তামিল অধ্যুষিত অঞ্চল পর্যন্ত। এতে করে তামিলদেরকে দেশের মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে যাওয়ারও সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আশপাশের যে কোনো দেশের তুলনায় ভালো। ফলে দিনে দিনে আরো স্ফীত হচ্ছে তাদের পর্যটন শিল্প।
শ্রীলংকার সমস্যার পাল্লাটা এখন পর্যন্ত কম ভারী নয়। শুধু তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সবকিছু বোঝা যায় না। শুধু জিডিপির বিচারে দেশটির মূল্যায়ন করলে ভুলই করা হবে। জিডিপি সম্পদের বিন্যাস বোঝাতে সহায়ক নয়। সরকারের সরবরাহকৃত উপাত্ত অনুযায়ী দেশটির ১৫ শতাংশ লোক অফিসিয়াল দারিদ্র্যসীমার (মাসিক আয় ৩০৮৭ রুপি) নিচে বাস করে। কিন্তু বিশ্ব ব্যাংকের হিসেবে আরেকটু বেশি, ২৩ শতাংশ। জাতিসংঘ তথ্য প্রকাশ করেছে শ্রীলংকার ৪৫ শতাংশ লোক দিন পার করে দিনে দুই মার্কিন ডলারেরও কম খরচ করে। ১০ শতাংশ ধনী লোকের কাছে প্রায় ৪০ শতাংশ সম্পদ বন্দী। অতিদরিদ্র ১০ শতাংশের হাতে রয়েছে মাত্র ১ শতাংশ সম্পদ।। জাতীয় আয়ের ৫০ শতাংশ সরবরাহ করে পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ। তার মানে দেশের সকল অঞ্চলে সমানভাবে উন্নয়ন ঘটছে না।
—বিজনেস টাইমস অনুসরণে