রেলকাহন
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২৮
ন’টার গাড়ি ক’টায় ছাড়ে—ট্রেনের ক্ষেত্রেই এ প্রবাদের জন্ম। নানা বিড়ম্বনার পরও ট্রেন ভ্রমণ আমার কাছে আকর্ষণীয় সেই ছোটবেলা থেকেই। আজকের এই লেখা রেলের সময়ানুবর্তিতা নিয়ে নয়— অন্য কিছু।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনে ঢাকা আসবো বলে সময়মতো স্টেশনে গেলাম। অবাক হলাম, ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে। কাউন্টারের দিকে ঢুকতেই ইউনিফর্ম পরা এক ভদ্রলোক বললেন, ঢাকা যাবেন, উঠে পড়েন, ট্রেন এক্ষুণি ছেড়ে দেবে। তার কথা না শোনার মতো করেই কাউন্টারে গেলাম। টিকেট মাস্টারের সহাস্য জবাব—‘কোনো ক্লাসেই সিট নেই।’ না থাকারই কথা। কারণ সড়ক যোগাযোগ কয়েকদিনের জন্য বন্ধ। টিকেট মাস্টার পরম শুভাকাঙ্ক্ষীর মতোই ইশারা করে বললেন, উনার সাথে যান, সিটের ব্যবস্থা করে দেবেন। পেছনে ফিরে দেখি সেই ইউনিফর্ম পরা ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। সিটবিহীন একটি টিকেট নিতে চাইলাম। না, তা হলো না সময় নেই বলে। দৌড়ে গিয়ে ট্রেনে উঠলাম। সেই ভদ্রলোকও সঙ্গে। আমাকে চ-৩ নম্বর সিটটিতে বসিয়ে দিলেন যত্নসহকারেই। কয়েক মিনিট পরেই তিনি টিটি সাহেবকে নিয়ে এলেন। বললেন, টিকেটের টাকা দিন। কত? ২০০ টাকা। ২০০ টাকা তার হাতে দিলাম। সহযাত্রী চ-৪, চ-৫ ও চ-৬ থেকেও ২০০ টাকা করে নেওয়া হলো। টিকেট চাইলে বললেন, পরে দিচ্ছি। কিছুক্ষণ পর গার্ড সাহেব এলেন। সঙ্গে আরো কয়েকজন। পুরো বগির কারো কাছে টিকেট না চেয়ে শুধু আমাদের চারজনের টিকেটই চাইলেন। ভাবলাম আমাদের যে টিকেট নেই এটা গার্ড সাহেব জানলেন কেমন করে? আর এই দায়িত্বও তার নয়। যা হোক তাকে বললাম, টিটি সাহেব টিকেটের টাকা নিয়ে গেছেন, টিকেট এখনো দেননি। আর একজন রেল কর্মচারী তাকে কী যেন বললেন। তিনি বিদায় নিলেন। কিছুক্ষণ পর লম্বা গড়নের সেই টিটি সাহেব আবার এলেন। বললেন, নিশ্চিন্তে বসে থাকুন, গেইট পার করে দেবো। বিমানবন্দর পর্যন্ত উল্লিখিত চার সিটের দাবিদার কাউকে দেখিনি। যদিও বগির অবস্থা ছিল গুলিস্তান-গাবতলীর বাসের মতো ঠাসা। এখন প্রশ্ন—আমরা যে টিকেটছাড়া যাত্রী এতজন রেলকর্মী তা জানলেন কেমন করে? সব টিকেট বিক্রি হয়ে থাকলে এই চার সিটের যাত্রী কোথায় গেলো? আর কাকতালীয়ভাবে এই চার যাত্রী যদি নাই আসবেন তা রেলের লোকেরা জানলেন কেমন করে? আমার বিশ্বাস এই চারটিই কেবল নয়, এমন আরো বহু আছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি মোট টিকেট বিক্রি মেলালে কালো বিড়াল ধরা পড়বে অবশ্যই।
আর একদিনের কথা। ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে। টিটি সাহেব ইশারায় গাড়িতে উঠতে বললেন। ট্রেনের অবস্থা—ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোট সে তরী। অনেক কষ্টে বুফেকারে দাঁড়াবার মতো একটু ঠাঁই হলো। খাবার গাড়ির মধ্যম বয়সের এক কর্মচারী এসে ঢাকা যাবো কিনা জানতে চাইলেন। হ্যাঁসূচক জবাব দিলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি একটা টুল এনে বসতে দিলেন। এই অপ্রত্যাশিত খেদমতে নিজেকে বড় ভাগ্যবান মনে হলো। ধন্যবাদ দিয়ে বসে পড়লাম। অল্প পরেই এলেন টিটি সাহেব। হয়তোবা আমাকেই খুঁজছিলেন। ভাড়া চাইলেন। পুরো ভাড়াই দিলাম। টিকেট চাইলে পরে দিচ্ছি বলে প্রস্থান করলেন। ভদ্রলোক আড়াল হতে না হতেই টুল দিয়ে খেদমত করা ব্যক্তি হাজির। রুক্ষকণ্ঠে টুলটা ছেড়ে দিতে বললেন। আমার সঙ্গে সহযাত্রীরাও প্রতিবাদ করলেন। তর্কের এক পর্যায় ম্যানেজার সাহেব উঠে এসে যা বললেন তা হলো ওরা ভেবেছিল আমি বিনা টিকেটের যাত্রী। আর খাবার গাড়িতে এমন যাত্রীই থাকে সাধারণত বেশি। টিটি সাহেবকে পুরো ভাড়া দিয়ে দেওয়াতে সে ভাবছে তার টাকাটা মার গেলো। যা হোক ম্যানেজার সাহেবের ম্যানেজারিতে বিমানবন্দর পর্যন্ত টুলের দখল বজায় রাখতে সমর্থ হলাম। ঘণ্টা দুই পর টিটি সাহেব আবার এলেন। টিকেট চাইলাম। নিশ্চয়তা দিলেন টিকেট অবশ্যই দেওয়া হবে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছাবে। টেনশন ক্রমেই বাড়ছে। না, তিনি কথা রাখলেন। হাতে একগোছা টিকেট। আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা। কৌতূহলী মন নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম তিন নম্বর নয়, দু’নম্বরও নয়, খাঁটি এক নম্বর চৌমুহনী-ঢাকা। টিটি সাহেবের কেরামতি নিয়ে অনেক ভেবেছি, কূল-কিনারা করতে পারিনি আজও।
ভাড়া বৃদ্ধির আগের কথা। চৌমুহনী স্টেশন। উপকূলের টিকেট চাইলে সাফ জবাব, টিকেট নেই। অনুনয়-বিনয় করার পর চেয়ার কোচে দুটি সিট পাওয়া গেলো। পাঁচশো টাকার নোট দিলাম। টিকেটসহ ফেরত দিলেন দেড়শো টাকা। হিসেব করে দেখলাম ৫০ টাকা কম। ফিরে গিয়ে বললাম, ভুল হয়েছে, ৫০ টাকা কম দিয়েছেন। কোনো কথা না বলে কিছু খুচরা টাকা আমার হাতে দিলেন। গুনে দেখি ২০ টাকা। ফের গেলাম কাউন্টারে। ভিড় কমলে জানতে চাইলেন কিছু বলব কিনা। হ্যাঁ, বলার জন্যই আবার এলাম। সংক্ষেপে বলছি, শুনুন। ঢাকার দুটি টিকেট ছাড়াও কুমিল্লার একটি টিকেট নিয়েছি ৩০ টাকায় খেয়াল আছে তো? মাথা নেড়ে সায় দিলেন। বললাম, গতকাল এই ট্রেনেই ঢাকা থেকে নোয়াখালী এসেছিলাম। ভুলক্রমে টিকেট কাটা হয়েছিল লাকসামের। ভুলটি আমার না কাউন্টারের তা নিশ্চিত নই। কুমিল্লার একটি টিকেট কিনে রেলের পাওনাটা শোধ দিতে পারলাম বলে আমি এখন টেনশনমুক্ত। কিন্তু আপনাকে বাড়তি ৩০ টাকা দেওয়ার জন্য রাতে ঘুম ঠিকমতো হবে কিনা সন্দেহ। ভদ্রলোক কোনো কথা না বলে ৩০ টাকা ফেরত দিলেন। এই বিজয়ে প্রথমে খুব উত্ফুল্লবোধ করলাম। কিন্তু এই খোশ মেজাজটা বেশিক্ষণ ধরে রাখা গেলো না। ভিন্ন চিন্তা মনটাকে গ্রাস করলো। ভাবলাম একটা ক্ষুদ্র কালো বিড়ালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে এমন কী বীরত্ব আছে? রেলে সাদা বিড়ালও আছে। আছে চিতাবাঘ, এমনকি রয়েল বেঙ্গলের মতো হিংস্র শক্তিধরও। তাহলে বিড়াল মারায় বীরত্ব কী, এমন কাপুরুষতা ছাড়া বাঘের গালে চড় মারা আর চিকা মেরে হাত গন্ধ করা কি এক কথা? মন চাচ্ছিল এক কেজি ফল কিনে দেই তার ছেলেমেয়েদের জন্য। কিন্তু সেই সুযোগ হলো না। সান্ত্বনা—তিনি হয়তো তা নিতেনও না।
আর একদিনের কথা। চট্টগ্রাম মেইলের টিকেট নিয়েছি দ্বিতীয় শ্রেণির। এই গরিব দেশে ৮০ ভাগ মানুষের জীবনমান দারিদ্র্যসীমার নিচে হলেও এই ট্রেনের যাত্রীবাহী বগির ৭৫ ভাগ দখল করে থাকে শীতাতপ ও প্রথম শ্রেণি। এতে আসন সীমিত হলেও আমাদের বগিগুলোর ক্ষমতা আনলিমিটেড। দেশের ষোল কোটি মানুষও যদি টিকেট চায় রেলওয়ের এতে কার্পণ্য নেই। আধঘণ্টা বিলম্ব আমাদের দেশে কোনো বিলম্বই নয়। তাই বলা চলে ট্রেন সময়মতোই এলো। প্লাটফর্মে শত নয়, হাজার যাত্রী। অথচ বাদুড়ঝোলা হয়ে এসেছে ট্রেন ঢাকা থেকেই। হতাশ হওয়ার মুহূর্তে নজর পড়লো একটা বগিতে ২/১ জন করে লোক উঠছে। নিচে গার্ড সাহেব দাঁড়িয়ে। দৌড়ে গেলাম। অবাক হলাম এই ভিড়েও বগিটা তুলনামূলকভাবে ফাঁকা। দরজার কাছাকাছি হতেই গার্ড সাহেবের প্রশ্ন টিকেট করেছি কিনা? একটু বড় করেই উত্তর দিলাম, অবশ্যই। গার্ড সাহেবও আর একটু চড়িয়ে বললেন, তবে এখানে কেন, কমপার্টমেন্টে যান। অবাক হয়ে বললাম, এটা তাহলে কী? সোজা উত্তর—এই বগিতে যেতে হলে পুরো ভাড়াই দিতে হবে। মনে হলো টিকেটবিহীন যাত্রীদের জন্য রেলওয়ের এটি একটি বিশেষ ব্যবস্থা।
স্মৃতি থেকে আর একটা ঘটনা উল্লেখ করে রেলকাহন শেষ করবো। ঢাকা থেকে গাজীপুর ট্রেনের নাম তুরাগ। সকাল-সন্ধ্যায় ধারণক্ষমতার ৩/৪ গুণ যাত্রী নিয়েই এই ট্রেন চলাচল করে। টয়লেট না থাকলেও মোটামুটি ছিমছাম। সেইদিন ভিড় তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধির সমানুপাতিক হারে বগির সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। চাকরিজীবী বহু মহিলা এই ট্রেনে যাতায়াত করলেও সরকারের লিঙ্গ নিরপেক্ষ নীতির অমর্যাদা হবে বলেই হয়তো তাদের জন্য আলাদা বগির ব্যবস্থা করার কথা চিন্তা করেননি। (অবশ্য ঔপনিবেশিক পাকিস্তান আমলে সবকয়টি ট্রেনেই মহিলাদের জন্য পৃথক বগি থাকতো।) মেয়েদের করুণ অবস্থা দেখে মনে হলো আমার মেয়ে চাকরি না করলেও এই অবস্থা মেনে নিতাম না। আগে এই ট্রেনে প্রায় শতভাগ যাত্রীই টিকেট করতেন। এখন বোধ করি তা পঞ্চাশ ভাগে দাঁড়িয়েছে। এর অন্যতম কারণ তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকদের ট্রেন বলে কাউন্টার রাখা হয়েছে আধ কিলোমিটার দূরে। তাছাড়া ৫ টাকার ভাড়া এখন ১০ টাকা। তদুপরি বিব্রতকর ভিড় তো আছেই।
যুদ্ধজয়ের মতোই শেষ পর্যন্ত পাদানিতে এক পা রাখার সুযোগ পেলাম সহযাত্রীদের সহযোগিতায়। বিমানবন্দর এসে সোনার হরিণতুল্য সিটও পেলাম। এতক্ষণে টিটি সাহেবও এলেন দেখা করতে। যারা টিকেট করেননি বা করতে পারেননি তাদের থেকে পাইকারি রেইটে ১০ টাকা করে নিচ্ছেন দর্শন ফি বাবদ। খুব কষ্ট লাগলো। যখন এক যাত্রী টিকেট চাইলে তার কাছে জরিমানাসহ পুরো ভাড়াই চেয়ে বসলেন। বললাম, ভাই আপনারা বেড়া হয়েই যদি এইভাবে খেত সাবাড় করতে থাকেন তাহলে উপায় হবে কী? ভদ্রলোক কাচুমাচু হয়ে যা বললেন তার সার হলো এই—কালেকশন তার একার পেটে যায় না, এর বেশিরভাগই অদৃশ্য পাইপলাইনে চলে যায় ওপরে অনেক ওপরে। পানিশমেন্ট ট্রান্সফার—কমন অজুহাত সরকারবিরোধী।
গাজীপুর