সংখ্যালঘুদের নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে দেয়া হবে না
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৫৩
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, যারা ফটিকছড়ির বর্বর সহিংস ঘটনার সমর্থন দিয়ে হুমকি দেয়, তারা খালেদা জিয়ার নির্দেশে মানবতা ও গণতন্ত্র হত্যা করতে মাঠে নেমেছে। এদের কাছে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, জাতীয় পতাকা, শহীদ মিনার কোন কিছু্ই নিরাপদ নয়। দেশ, জাতি ও মানবতার শত্রু এই অপশক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল শুক্রবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অষ্টম জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার ১৮ দলের সমাবেশে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা বলেছিলেন, ‘বিএনপি নেতাদের ফটিকছড়ির মত সারাদেশে সাহসী ভূমিকা রাখতে হবে।’ মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপি সারাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মন্দির ও ঘরবাড়িতে আগুন দিচ্ছে। ধর্মের নামে উন্মাদনা সৃষ্টি করছে। ওই দলটি বর্ণ চোরা। তবে এদের প্রকৃত চেহারা দেশের মানুষ চিনে ফেলেছে। তিনি এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা মহানবীর ইসলামে বিশ্বাসী। আমরা জামায়াত আর হেফাজতের ইসলাম মানি না, বিশ্বাস করি না।
ধর্মের নামে সহিংসতা বন্ধ ও রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠার শপথের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অষ্টম জাতীয় সম্মেলন। পরিষদের সভাপতি সিআর দত্ত বীরোত্তমের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার, মাঈনউদ্দিন খান বাদল এমপি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা নির্মল রোজারিও, অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, উষাচরণ তালুকদার চাকমা, কাজল দেবনাথ, তাপস কুমার পাল প্রমুখ। সম্মেলনে অংশ নেয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সহিংসতা রোধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ধর্মকে পুঁজি করে আবারো নামে-বেনামে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি। ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করে কাউকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে দেয়া হবে না।
‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’—শ্লোগানে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট থেকে শুরু হয় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের শোভাযাত্রা। এক পর্যায়ে তা এক বিশাল মিছিলে পরিণত হয়। শোভাযাত্রা শেষে আয়োজিত সমাবেশে ঐক্য পরিষদের নেতারা মানবতা বিরোধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উপাসনালয়, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরে নিজেদের মতো করে তাদের প্রশ্নের জবাব দেন বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা।
সম্মেলনে অনেক বক্তা ধর্মীয় উস্কানিতে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে জামায়াত, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির (এ) জড়িত থাকার সমালোচনা করেন। সম্প্রতি ফটিকছড়িতে হত্যা ও নাশকতার পর বিএনপির অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন তারা। তবে এর আগেই সম্মেলনে নিজের বক্তব্য শেষ করে চলে যান বিএনপি নেতা এমকে আনোয়ার।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, একদল দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে, আরেক দল বসে বসে তামাশা দেখে। আমরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বহুদলীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। আমরা এদেশে কারোর একক ভোট ব্যাংক নই। কারোর করুণা বা অনুগ্রহ নিয়ে আমরা বাস করতে চাই না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর যা ঘটেছে তার জন্য আমি লজ্জাবোধ করছি। আগামী দিনে যেন এমন কোন ঘটনা আর না ঘটে তার জন্য সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। এদেশে একজন মুসলমানের যে অধিকার একজন হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টানেরও একই অধিকার।
গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, আমাদের ঐক্য সমুন্নত রাখতে হবে। ঐক্য ধরে রাখতে পারলে কোন শক্তিই আমাদের পরাজিত করতে পারবে না। আমরা সবাই এদেশের মালিক। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, বিএনপি-জামায়াতের নেতারা একদিকে হিন্দুদের মন্দিরে আগুন দেয়। আরেক দিকে খালেদা জিয়া ঘটনাস্থলে গিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে সহানুভূতি জানায়। সাপ হয়ে দংশন করে আবার ওঝা হয়ে ঝাড়ার এই নীতি বন্ধ করার জন্য তিনি বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজ দেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।
মাঈনউদ্দিন খান বাদল এমপি বলেন, কোন এমপি যদি তার মন থেকে চান নিজ এলাকার জনগণকে শান্তি ও স্বস্তিতে রাখবেন, তা হলে কোন শক্তি নেই তা বিঘ্নিত করে। তিনি বলেন, আরবের পয়সা খেয়ে দেয়া কোন ব্যাখ্যা ইসলামের ব্যাখ্যা নয়। হেফাজতে ইসলাম যে দাবি তুলেছে তা গত ৪২ বছরে কোন পাগলও তোলেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাদল জামায়াত ও হেফাজতের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা এদেশ থেকে ২ কোটি হিন্দু তাড়িয়ে দিয়ে ইসলামকে হেফাজত করতে চান। কিন্তু ভারতের বিজেপি যদি আপনাদের মত সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে সেখানকার ১৮ কোটি মুসলমান ভাই-বোন কোথায় যাবেন?
কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, সারাদেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লব গড়ে তুলতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য প্রয়োজনে আত্মরক্ষা বাহিনী গঠন করতে হবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, একটি দেশের নাগরিককে তার নিজে দেশে নিরাপদে বেঁচে থাকার জন্য কারো কাছে করুণার পাত্র হতে হয় -এটা লজ্জাজনক।