জন কেরির বাজেট
লক্ষ্য বিশ্বে শান্তি নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২০:২৫
বিশ্বজুড়ে নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠা কিংবা এসব মতামতের পক্ষে দেশগুলোকে যুক্ত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মতো যুক্তরাষ্ট্রও তাই নিজেদের বাজেটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেটকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে হিলারি ক্লিনটনের বিদায়ের পর জন কেরি এ বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখতে এবং বহির্বিশ্বে নিজেদের স্বার্থ ধরে রাখার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেটটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের সাথে তাল মিলিয়ে তিনি বলতে শুরু করেছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিদেশে তারা যে অর্থ ব্যয় করছেন তা পানিতে ফেলছেন— এমন মনে করা ঠিক হবে না। বরং এ অর্থ ব্যয়কে তিনি ‘জাতীয় নিরাপত্তা বীমা’ বলে আখ্যায়িত করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে যে কোন মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট চাইতে গেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে গলদঘর্ম হতে হয়। কোন খাতে কত টাকা খরচ করা হবে তা যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর এ বছর এ কঠিন দায়িত্বটি বর্তেছে জন কেরির ওপর। সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কি হবে কোন কোন খাতে কত খরচ করা হবে এসবের বিস্তারিত তিনি মাথায় রেখেছেন। মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান, কোরিয়া, আফ্রিকাসহ দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য প্রচুর ডলার খরচ করে যাবার পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত হাউস কমিটিতে তার দেয়া বক্তব্য তাই প্রমাণ করে।
জন কেরির বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নীতি ঠিক করে কূটনীতির লড়াই চালিয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যতে যুদ্ধ করে বিপুল ডলার খরচ করতে হবে না। গত কয়েক মাসে আমরা বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতির উজ্জ্বল অবস্থান দেখতে পেয়েছি। ইসরাইল এবং তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ওই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রেখেছে। এসব দেশে আমরা যৌথভাবে কাজ করছি। সিরিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা গ্রহণযোগ্য। এ পর্যন্ত বিপর্যস্ত সিরিয়ার মানুষের জন্য আমরা সাড়ে ৩৮ কোটি ডলারের মানবিক সাহায্য দিয়েছি। আমরা এখন গর্ব করে যে কোন দেশের সাথে সিরিয়ার সংকটের বিষয়ে আলোচনা করতে পারছি। সমপ্রতি আমি সিউল, বেইজিং এবং টোকিও সফর করেছি। সেখানে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিলো উত্তর কোরিয়া। আরো একটি বিষয় আমি গর্ব করে বলতে পারি— তা হলো যুক্তরাষ্ট্রই হচ্ছে বিশ্ব নিরাপত্তার অভিভাবক। এটিকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
তবে জন কেরির মতে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য যে বাজেট চাইবেন তা জাতীয় অর্থনীতির বিচারে অযৌক্তিক হবে না। সামনের বাজেটের বরাদ্দ এমনভাবে খরচ করা হবে যা দিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রবাসীর চাকরির সুযোগ তৈরি এবং সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবে। জন কেরি ২০১৪ সালের জন্য এমন একটি বাজেট প্রস্তাব দিয়েছেন যা ২০১২ সাল থেকে ৬ শতাংশ কম। তিনি বলেন, আমরা সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করে আসল কাজটা করতে চাই। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের খরচ করা প্রতিটি ডলারই দেশের জনগণের। ন্যূনতম খরচের মাধ্যমে বিশ্বকে আমরা কিভাবে নিরাপদ করতে পারি সে চেষ্টাই করতে হচ্ছে আমাদের। সম্প্রতি কেনিয়ার নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করার জন্য আমরা মাত্র ৩৫ লাখ মার্কিন ডলার খরচ করেছিলাম। সেখানকার গত ৫ বছরের সহিংসতাকে আমরা পদানত করতে পেরেছিলাম। ভারত, পাকিস্তান এবং লেবাননের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাহায্য করে আমরা সেখানকার লাখ লাখ লোককে আমরা বাঁচিয়েছিলাম। ২০১৪ সালে আমাদের বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা।
জন কেরি মধপ্রাচ্য এবং আফ্রিকায় ৫৮ কোটি ডলারের বাজেট প্রস্তাব দেন। এতকিছুর পরও জন কেরি যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের কথা উল্লেখ করতে ভুলেননি। তিনি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আমাদের শত্রুরা লুকিয়ে আছে। তারা বিভিন্ন জায়গায় আমাদের স্বার্থে আঘাত করছে। তাদেরকে নির্মূলের দায়িত্বও আমাদের ওপর বর্তায়। অবৈধ অস্ত্র এবং মাদক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য তিনি কাউন্টার টেরোরিজম এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উন্নয়নের জন্য ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব করেন। আফগানিস্তান এবং ইরাকে ট্রিলিয়ন ডলার খরচের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে জন কেরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বাইরে থেকে নিরাপদ না হয় তাহলে ঘরেও নিরাপদ থাকবে না। বিশ্বকে নিরাপদ করার মধ্য দিয়ে একটি স্থিতিশীল যুক্তরাষ্ট্র আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারবো।
জন কেরি বলেন, শুধু শান্তি আর স্থিতিশীলতা নয়, বাণিজ্যের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্যে আমরা প্রাণান্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে এসব অঞ্চলের দেশগুলোর অধিকাংশের প্রবৃদ্ধির হার দুই অংকের কাছাকাছি বা দুই অংকের।
জন কেরি অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বেশি বাজেট বরাদ্দ চান। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের দেশগুলোর উন্নয়নে আমরা প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছি। আমাদের মনে রাখতে হবে উন্নয়নে ব্যবহার করা অর্থ কোন চ্যারিটি নয়। এর মাধ্যমে আমাদের স্বার্থও রক্ষা হচ্ছে। আমরা এখন যে ১৫টি দেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করছি তার মধ্যে ১১টি দেশ এর আগে আমাদের উন্নয়ন বরাদ্দ পেয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামাও বিশ্বাস করেন, দেশগুলোর উন্নয়ন খাতে অর্থ ব্যয় একপ্রকার বিনিয়োগ। একসময় দক্ষিণ কোরিয়া আমাদের থেকে উন্নয়নের অর্থ নিয়েছে। এখন দেশটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে উন্নয়ন সহায়তা দিচ্ছে। তার মানে এই নয় যে, আমরা সব কাজ করে ফেলেছি। কিন্তু আমরা যে আরো কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি তা যেন জনগণ অনুধাবন করতে পারে।
এরপর জন কেরি সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসসমূহ এবং অন্যান্য স্থাপনা নিরাপদ রাখার জন্য ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বের সর্বত্র আমাদের স্থাপনাগুলো নিরাপদ না হলে ভবিষ্যত্ আমাদের জন্য কোন সুফল বয়ে আনবে না।