মধ্যপ্রাচ্যে সামাজিক পরিবর্তন

বিশ্ব ধর্ম ও বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রস্থল মধ্যপ্রাচ্য। কারও কারও মতে, তেল-নির্ভর বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুও মধ্যপ্রাচ্য। আধ্যাত্মিক অনুরাগ আর শক্তিশালী বাহিনীর লোভের তীর্থভূমি দুনিয়ার প্রাচীনতম ঐ এলাকার সামাজিক পরিবর্তন দেখে এখন হয়তো চমকে উঠবেন অনেকেই। তবে তা উপলব্ধি করতে পুরনো স্মৃতি বা গত্বাঁধা ধারণাকে অবশ্যই ঝেড়ে ফেলতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য কীভাবে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, সে সম্পর্কে পাঁচটি ধারণা দিয়েছেন মার্কিন সাংবাদিক ফ্রিডা ঘিটিস। গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন তিনি। কিন্তু ঘড়ি অন্য এক সময়ের জানান দিচ্ছে, যেখানে স্থানভেদে জীবন দর্শন পাল্টাচ্ছে দ্রুত। প্রথমত: মধ্যপ্রাচ্যের তরুণ প্রজন্ম ধর্ম এমনকি রাজনীতির প্রতিও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এর পরিবর্তে তাদের মননে জায়গা করে নিচ্ছে পশ্চিমা বিনোদন সংস্কৃতি। আরব বসন্তে অনেক দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তিত হলেও বাদশাহ আব্দুল্লার স্থিতিশীল জর্ডান টিকে আছে বহাল তবিয়তে। ক্ষমতার পালাবদল না থাকা ও সম্পদে পরিপূর্ণতাসহ বিভিন্ন বিবেচনায় আরব আধুনিকতার শীর্ষে জর্ডান। সন্ধ্যা নামলেই দেশটির রাজধানী আম্মানের নাইটক্লাবগুলোয় জমে রাজনীতি বিমুখ তরুণদের ভিড়। পুরু ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রহস্যজনক আবহে সেখানে লাতিন আমেরিকার ধাঁচে চলে ট্যাঙ্গো ও সালসা নৃত্য। আদর্শের বৈচিত্র্যে দল পাকানোর চেয়ে যুবক-যুবতীদের কাছে এই বিনোদনই সরল ও সেরা। সেখানে লাতিন আমেরিকান ক্লাবারদের মতোই সহকর্মীর সাথে উন্মাদনায় দক্ষতা দেখান তারা। আম্মানের অনেক ক্লাব সুদূর কিউবা থেকেই ভাড়া করে আনে সালসা মিউজিক শিল্পীদের। দ্বিতীয়ত: আরব বসন্তে মধ্যপ্রাচ্যের সব ক’টি বড় নির্বাচনেই জয়ী হয় মুসলিম ব্রাদারহুড। অন্যদিকে উদারপন্থি প্রগতিশীল দলগুলো বিশ্বাসযোগ্য প্রচারণার জোয়ার তৈরিতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। তথাকথিত আধুনিক চিন্তাধারার বুদ্ধিজীবীরা এক্ষেত্রে এক কার্যকরী কৌশল উদ্ভাবন করেন। আর সেটা হলো, যদি তুমি কাউকে পরাজিত করতে না পারো, তবে তাকে নিয়ে রসিকতা করো। খুব সহজেই নয়া এই কৌশলটি কৌতুকপ্রিয় তরুণ প্রজন্মের কাছে মজা লুটে নেয়ার উপাদানে পরিণত হয়। এভাবেই মুসলিম ব্রাদারহুডের ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিতে প্রগতিশীলদের বিদ্রূপ-মশকরা শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যে। বাসেম ইউসেফ নামের এক কমেডিয়ান সমপ্রতি এমন এক মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, ইজিপশিয়ান জন স্টুয়ার্ট নামেই তাকে সবাই চেনে। টুইটারে এই ব্যক্তির ফলোয়ার ১২ লাখেরও বেশি। ইউটিউব আর টিভি শো’তে তার দর্শকও প্রচুর। সব শ্রেণীর মানুষের কাছে তিনি যে কোন রাজনীতিবিদের চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয়। কারণ হাসানোর শক্তিশালী উপাদানগুলো তার জানা। বাসেম ইউসেফ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন স্বর্গীয় জ্ঞানের আধার হিসেবে। তিনি দাবি করেন, তার কাছে পাপ পরিমাপের যন্ত্র- ‘সিন মিটার’ আছে। ঐ মিটারে একে একে সব ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করেন তিনি। তৃতীয়ত: আমেরিকার নীতি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের মধ্যেও এক ধরনের চিন্তা বা এর প্রকাশভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। হয়তো অনেকেই ভাবেন, আমেরিকার ষড়যন্ত্রতত্ত্বই মিসরে ব্রাদারহুডকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। কারো কারো হয়তো অভিযোগ, সিরিয়ার গণহত্যা বন্ধে আমেরিকার তত্পরতা যথেষ্ট নয়। আবার অনেকের মনেই অসন্তোষ ইসরাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের অতি-বন্ধুত্বে। চিন্তার এই বৈচিত্র্য সত্ত্বেও আরব বসন্তের পর সবশেষ যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আম্মান সফর করেন, তখন কাউকে নেতিবাচক কিছু বলতে শোনা যায়নি। অথচ প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন মোটর শোভাযাত্রা করে আম্মানের রাজপথে ঘুরছিলেন, পথে-প্রান্তরে কোথাও তখন কাউকে ভিড় করতে দেয়া হয়নি। তার সফরকে মানুষ গুরুত্বও দিয়েছে কম। বহুতল ভবনের ছাদ থেকে উত্সাহী কেউ কেউ হয়তো উঁকি দিয়েছেন। তারপরও কেউ বলেনি, ওবামার আগমনে নগরী অচল হয়ে গেছে। আমেরিকার নেতাকে নিয়ে ভয়-শ্রদ্ধা মিশ্রিত এক ধরনের আবিষ্টতাই কাজ করছে সবার মনে। চতুর্থত: যুক্তরাষ্ট্রের পরম বন্ধু ইসরাইলকে নিয়েও মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের পুরোনো চিন্তার পরিবর্তন হচ্ছে। আগে যে কোন সংকটেই ইসরাইলকে দোষারোপ করে পার পেয়ে যেতো স্বৈরশাসকরা। ফলে তাদের ক্ষমতার ভিত মজবুত হবার বিপরীতে এই ইহুদি রাষ্ট্রের প্রতি আক্রোশ বদ্ধমূল হতো সর্বসাধারণে। আরব বসন্তের ঝড়ো হাওয়ায় সেই শাসকরা এখন আর নেই। বিপরীতে দেখা দিলো গৃহদ্বন্দ্ব, গৃহযুদ্ধ আর অর্থনৈতিক মন্দা। এখন কেউই আর মনে করছেন না যে, ইসরাইলকে মুছে ফেলে বা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেই তাদের সংকট কেটে যাবে। তাই ‘মধ্যপ্রাচ্যের সব সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু ইহুদীরা’ পুরনো এই তত্ত্ব গুরুত্ব হারাচ্ছে। আম্মানে তাই যখন ইসরাইল বিরোধী মহাসমাবেশের ডাক দেয়া হয়, তখন মাত্র তিনশ’ জনকে রাস্তায় দেখা যায়। পঞ্চমত: মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্তের ফুল সুরভি ছড়ানোর মতো করে ফোটেনি। ঠিক যেমনটি মানুষ চেয়েছিলো, তেমন হয়নি। আর এ কারণেই জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লার প্রতি পরিবর্তনের চাপও অনেক কমে গেছে। তবে বিরোধী দলের সংস্কারের চাপ থেমে থাকেনি। সাংবিধানিক রাজতন্ত্র টিকিয়ে রেখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একমত হয়েছে দুইপক্ষ। সামান্য হলেও কিছু পরিবর্তনের ব্যাপারে রাজি হয়েছেন মরক্কোর রাজাসহ অন্য আরব রাজারা। মধ্যপ্রাচ্যে এভাবেই পরিবর্তনের বৈচিত্র্য লক্ষণীয়।