বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ ইউসিজি!
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩৬
দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কার্যত ব্যর্থ। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারের নিয়ম না মেনে চললেও প্রশাসনিক দুর্বলতায় এদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে পারছে না ইউজিসি। এ সব বিবেচনায় ইউজিসির নাম ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ‘উচ্চ শিক্ষা কমিশন’ করার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খসড়া জমা দিলে তা বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ইউজিসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিষ্ঠানটির আইনী দুর্বলতার কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার হচ্ছে। শিক্ষা বহির্ভূত খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, নীতিমালা না মেনে জনবল নিয়োগ, বিদ্যুত্ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়-ব্যয় সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি না করেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছে। আর অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই কোনো নিয়মই মানছে না। অবৈধ শাখা বানিয়ে শিক্ষা বাণিজ্য শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা দ্বন্দ্বে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে তৈরি হচ্ছে দুটি বা ততোধিক অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয়। একই ভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে একের অধিক উপাচার্য। কিন্তু এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না ইউজিসি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনী ও প্রশাসনিক দুর্বলতায় দেশের উচ্চ শিক্ষার গুণগত মান, পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন এবং বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সংগ্রামে ইউজিসি কাঠামো অচল। ১৯৭৩ সালে ৬টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা, প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা এবং বিভিন্ন কার্যক্রম দেখাশুনার জন্য ইউজিসি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৩৪টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৬৪টি। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের তদারকি করা ইউজিসির পক্ষে অসম্ভব।
ইউজিসির সচিব ড. মো. খালেদ বলেন, ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির ১০ নং আদেশ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্ব, কর্তব্য ও কর্মপরিধি পূর্বের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কমিশনের যে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও আইনী কাঠামো রয়েছে তা বর্তমান বিশ্বের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান ইউজিসিকে অন্যান্য দেশের আদলে উচ্চশিক্ষা কমিশন হিসেবে রূপান্তরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে অধিকতর শক্তিশালী, স্বাধীন, অর্থবহ ও কার্যকর করা দরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে উচ্চ শিক্ষা কমিশন গঠনের জন্য একটি খসড়া ইউজিসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও ইতিবাচক কোন সাড়া পাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। ইউজিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ শিক্ষা কমিশনের বিষয়ে ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাদের মতামত দিয়েছে। এই মতামত ইউজিসির ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না, বরং কমাবে। ইউজিসি মন্ত্রণালয়ের আওতামুক্ত হতে চায়। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাদের মতামতে এই কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকার পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। ফলে ইউজিসি এই কমিশনের পক্ষে সায় দেবে না।
খসড়ায় কমিশনের চেয়ারম্যানকে একজন পূর্ণমন্ত্রী, ৫ সদস্যকে প্রতিমন্ত্রী এবং কমিশনের সচিবকে সরকারের সচিবের মর্যাদা দেয়ার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু কমিশনের চেয়ারম্যানসহ অন্যদের পদমর্যাদার বিষয়ে আপত্তি দিয়েছে অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কমিশনের চেয়ারম্যান শিক্ষকতা পেশার মধ্য থেকে আসবেন এমন বলা হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় এই পদটি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার পক্ষে।
ইউজিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতামুক্ত থেকে এই কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করবে খসড়ায় এমন বলা হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যে মতামত দিয়েছে তাতে উচ্চ শিক্ষা কমিশন গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। এই দুটি মন্ত্রণালয় প্রতিটি ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে কাজ করার কথা বলছে। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপসারণ সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিদের মাধ্যমে করার প্রস্তাব করা হয়। এসব ক্ষেত্রেও অর্থ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আপত্তি রয়েছে। ইউজিসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় উচ্চ শিক্ষা কমিশন গঠন অনিশ্চয়তার পথে রয়েছে।