অপর্ণা সেনের মুখোমুখি

(গতকালের পর) আপনি বললেন আপনার ‘গয়নার বাক্স ’ নির্মাণে বিলম্ব হয়ে পারতপক্ষে ভালো হয়েছে। কিন্তু সেটা কী রকম? এই যে ধরুন। আমার ‘গয়নার বাক্স’-তে যে রকম স্পেশাল এফেক্টের কাজ করা হয়েছে, তা কিন্তু আজ থেকে ১০ বছর আগে ভাবতেও পারতাম না। তখন চাইলেও ছবিটা এত আধুনিক, এতটা দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে পারতাম না। কিন্তু ছবির মূল চরিত্রে মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় কেন? অভিনেত্রী অপর্ণা সেনকে কেন ক্রমাগতভাবে আমরা হারাচ্ছি? না আসলে ছবিটার জন্য প্রথম পর্যায়ে ভাবছিলাম শর্মিলা ঠাকুরকে নেব। কিন্তু পরে তা চেঞ্জ করি। এবং সেই একই কারণে আমিও নিজে অভিনয় করিনি। কী সেই কারণ? দেখুন, আমার বা শর্মিলার স্ক্রিন ইমেজটা কিন্তু অনেকটা শহুরে। সেখানে মৌসুমীর জায়গায় আমাকে কিছুটা আরোপিত মনে হতো। আমি সেই রিস্কটা নিতে চাইনি। আর শর্মিলা ঠাকুরের ক্ষেত্রেও কিন্তু একই ব্যাপারটা দাঁড়ায়। তাকে আমি একটি শহুরে চরিত্রে যতটা ফুটিয়ে তুলতে পারি, সেই অর্থে কিন্তু গ্রামীণ চরিত্রে শর্মিলা একেবারেই বেমানান। আর অভিনয় তো করছি টুকটাক। সৃজিত ওর একটা ছবির জন্য বলছে আমাকে... দেখা যাক। কলকাতায় দুই ধারার চলচ্চিত্র হয়ে আসছে। সেটা আপনি প্রথাগত ধারা বিশ্বাস করুন আর নাই করুন। একটা দেব, জিত্রা যে ধারার ছবিতে অভিনয় করছে—ধুমধারাক্কা-গান-ফাইটিং থাকছে বড় বাজেটের। অন্যটি আপনারা যে ধারার ছবি করছেন। এই বিভাজনকে আপনি কীভাবে দেখেন? আপনারা কি তাহলে দুই ধারার অডিয়েন্সের জন্য ছবি করছেন? দেখুন আমি, ঋতুপর্ণ বা বুদ্ধ’দা যেমন ছবি করে আসছি—এটা আমাদের মতো ভাষায়, এখানে ফ্যান্টাসিটা কম, রিয়েলিটিটা বেশি। আর অন্য চার-পাঁচটা যে ছবি হচ্ছে তাতে রিয়েলিটি কম ফ্যান্টাসিটা বেশি। এখন দুই ধারার ছবিই কিন্তু ভেঙ্কটেশ ফিল্মস বা অন্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বাজারে আনছে। দুটোই কমার্শিয়াল ধারা। কারণ ‘রয়েল বেঙ্গল রহস্য’ কিন্তু আমাদের ভাষার ছবি। এ ছবিটি কিন্তু কলকাতার বক্স অফিসে শাহরুখের ‘ডন টু’-কে হারিয়েছে। তাই ভালো-দর্শকদের হূদয় ছুঁতে পারাটাই বিষয়। পরিচালকরা নিজেদের অভিরুচির ছবি তৈরি করে। আমি যেমন ‘ইতি মৃণালিনী’ ছবিতে অনেকের গান ব্যবহার করেছি। কিছু লিপেও স্ক্রিনিং হয়েছে। সেটাও আজগুবি নাচানাচি দিয়ে নয়। এখন আমি ওই নাচকেও অবজ্ঞা করছি না। কিন্তু আমার পছন্দ না। আর সবচেয়ে বড় কথা আমাদের ছবিগুলোর গানগুলো দেখবেন একেকটি ছোট গল্প। তাই এখানে ধারাটা একান্ত নিজস্ব। ছবির মূল ধারা দুটিই—ভালো ছবি ও মন্দ ছবি। আমাদের এই ভাষার চলচ্চিত্রেও খারাপ ছবি যে হচ্ছে না তা নয়। সেগুলোও কিন্তু দর্শকেরা ফিরিয়ে দিচ্ছে। তাই নির্মাতা তাদের নিজস্ব রুচিটাই তার ছবির ফ্রেমে তুলে ধরছে। এটা সারা বিশ্বে বর্তমান। আমরা সবাই ম্যাস পিপলের জন্যই ছবিটা তৈরি করি। সব ধরনের নির্মাতারই একটাই ইচ্ছে থাকে—সারা বিশ্ববাসী তার ছবিটা দেখবে। কেউ সফল হয়, কেউ ব্যর্থ। এবার আসা যাক, আপনার সম্পাদনায়। সারদা গ্রুপের যে ফিন্যান্সে আপনার ‘পরমা’ বের হচ্ছে সেখানে নাকি কিছুটা ঝামেলা চলছে। কলকাতায় এসেই তো শুনলাম এ দেশে সারদা গ্রুপের তারা মিউজিকও নাকি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাত্ একই গ্রুপের এই পত্রিকাটিও কি তাহলে থাকছে না? না, সেটা হতে দেবো না। ‘পরমা’র প্রকাশনা বন্ধ হবে না। দেখা যাক। পাঠকরাই এই পত্রিকাটিকে নিজের করে নিয়েছে। তাই তারা মিউজিকও যেমন বন্ধ হয়নি। ‘পরমা’ও বন্ধ হবে না। কারণ দর্শকদের চাহিদাই এটিকে টিকিয়ে রেখেছে। তাহলে একটি প্রশ্ন করি, কিছুদিন আগে তারা মিউজিকে রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের উপস্থাপনায় ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ অনুষ্ঠানে আপনাকে দেখলাম আপনার রবীন্দ্র অনুরাগ নিয়ে অনেক কথা বললেন আপনি। সেই সূত্রে যদি বলি আপনার ‘পরমা’য় যারা সংগীত নিয়ে লিখছেন নিয়মিত বা অনিয়মিত কলাম, সেখানে মূল ধারার শিল্পীদের উপস্থিতি কম কেন? নাকি আপনি এটাকে কম মনে করছেন না? (বাপরে, অনেক খোঁজখবর রাখো দেখছি!) না দেখুন, এটা ঠিক নয়। রুপম আমার পত্রিকায় লিখছে একেবারেই ওর মতো করে। বা দুয়েকজন এ সময়ের কবিও লিখছে। যারা লিখছে তারা কেউই কিন্তু রবীন্দ্রনাথ-বিদ্বেষী নয়। সিনিয়র আর্টিস্টদের দিয়ে লেখানোর কথা ভাবিনি। হয়তো সামনে ভাবব। এবারে খানিকটা কৌতূহলী প্রশ্ন করি... আপনার সুযোগ্য কন্যা কঙ্কনা সেনের ভক্ত বাংলদেশ জুড়ে ব্যাপক। হয়তো তিনি নিজেও তা জানেন না। এই যে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে তার বিয়ে বিচ্ছেদ, স্ক্যান্ডাল নিয়ে কথা ওঠে। এ বিষয়গুলো মা অপর্ণা কীভাবে শেয়ার করে মেয়ের সাথে? শুনুন, এগুলোর সাথেই আমার বসবাস আজন্ম। আর কঙ্কনা তো জন্ম থেকেই দেখছে এই সব। মজার ব্যাপার হলো, এই স্ক্যান্ডাল, গসিপ সবকিছুই কেন জানি আমার কানে সবার পরে আসে। একটা কমন প্রশ্ন দিয়ে শেষ করি, এটা আমরা অতিথি যেকোনো তারকাকেই করে থাকি। অর্থাত্ বাংলাদেশি কোনো চলচ্চিত্রের অফার এলে করবেন কি না? (একগাল হেসে) আমিও তাহলে আমার কমন উত্তরটাই দিই। আমার কাছে চলচ্চিত্রের বাজারটা একেবারে গোটা বিশ্ব জুড়ে। তাই শুধু বাংলাদেশ কেন বিশ্বের যেকোনো চলচ্চিত্রের অফার এলেই আমি আগে আমার চরিত্রের প্রাধান্য, গল্প, নির্মাতার পোর্টফোলিও এইসব দেখেই সিদ্ধান্ত নেব। তবে বাংলা যেহেতু আমার প্রাণের ভাষা, তাই কিছুটা অগ্রাধিকার তো থাকবেই।