চলে গেলেন সুবীর নন্দী

 

হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে শেষ পর্যন্ত চলেই গেলেন বাংলাদেশের নন্দিত কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দী। অথচ তার সুস্থ হয়ে ফিরে আসবার কথা ছিল। চিকিত্সার, চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না। পরপর তিনটি, এর আগে একটি- মোট চারবার হার্ট অ্যাটাকের পরে আর লড়াই করতে পারলেন না। চলে গেলেন পরপারে। চলে গেলেন ঠিক কিন্তু তার মত শিল্পীর কী মৃত্যু হয়। সুবীর নন্দী অসংখ্য কালজয়ী গানের শিল্পী। তার গান মানুষের মুখে মুখে ফেরে। বাংলার মানুষকে অমর সব গানের জাদুতে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন তিনি। সুরের সেই জাদুর মায়ায় চিরকাল আচ্ছন্ন থাকবে বাংলাদেশের শ্রোতা। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন তার গান গাওয়া হবে। মৃত্যুঞ্জয়ী এ শিল্পীর মৃত্যুতে দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটায় শিল্পীর মেয়ে ফাল্গুনী নন্দী তার পিতার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে তার বাবা ভোর সাড়ে চারটায় মারা গেছেন। শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। তিনি স্ত্রী, এক মেয়েসহ আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘সংগীত ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সুবীর নন্দীর অবদান জাতি দীর্ঘকাল স্মরণে রাখবে’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সুবীর নন্দী তার কাজের মাধ্যমে মানুষের হূদয়ে আজীবন বেঁচে থাকবেন।’ এছাড়াও শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা এইচ এম এরশাদ, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ প্রমুখ।

সংগীত সাধনার অপর এক নাম একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী সুবীর নন্দী। তিনি বলতেনও ‘গান সাধনার বিষয়। এখানে হুট করে সব কিছু জয় করা যায় না। চর্চা ছাড়া গান হয় না। হয়তো চমক দেখিয়ে এক বা দুই বছর টিকে থাকা সম্ভব। কিন্তু চর্চা আর সাধনা না থাকলে সেই চমক টেকসই হবে না।’ নিজের জীবন দিয়েই তা দেখিয়েছেন সুবীর নন্দী। ১৯৭২ সালে প্রথম রেডিওতে ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’ এ গান গাওয়া দিয়ে সংগীত জীবনের শুরু। এরপর আড়াই হাজার গান রেকর্ড করেছেন এ শিল্পী। পরবর্তী প্রায় পাঁচ দশকে তার বয়স বেড়েছে কিন্তু কণ্ঠের সুরমাধুর্য অক্ষুণ্ন ছিল তরুণ বয়সের মতই।

সিএমএইচ-এ চিকিত্সাধীন অবস্থায় সুবীর নন্দীর অবস্থার অবনতি হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে শিল্পীকে গত ৩০ এপ্রিল সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ভর্তির পর দুইদিনের মাথায় তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। পরে সিঙ্গাপুর হাসপাতালে পর পর তিনবার শিল্পী হূদরোগে আক্রান্ত হন। দেশের হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায়ও একবার হূদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন শিল্পী। ঢাকায় সিএমএইচ’এ ১৮টি দিন চিকিত্সাধীন ছিলেন।

সিঙ্গাপুর থেকে সুবীর নন্দীর মরদেহ আজ বুধবার সকালে ঢাকায় এসে পৌঁছাবে। দেশের বরেণ্য এই সংগীত শিল্পীর পরিবারের পক্ষ থেকে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জাতীয় সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন জানান, বুধবার সকাল ৬টা ১০ মিনিটে রিজেন্ট এয়ারওয়েজের একটি উড়োজাহাজে সুবীর নন্দীর মরদেহ ঢাকায় এসে পৌঁছাবে। বিমানবন্দর থেকে তার মরদেহ আনা হবে শিল্পীর গ্রীন রোডের বাসভবনে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানান, বাসা থেকে বেলা ১১টায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সুবীর নন্দীর মরদেহ নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এরপর মরদেহ নেওয়া হবে রামকৃষ্ণ মিশনে। দুপুরে সবুজবাগ বরদেশ্বরী কালীমন্দির ও শ্মশানে সুবীর নন্দীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে।

অসংখ্য কালজয়ী গানের শিল্পী সুবীর নন্দী। তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানগুলি হলো- আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি, একটা ছিল সোনার কইন্যা, পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝরণা বলো, আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়, পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই, দিন যায় কথা থাকে, কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো সে কথা তুমি যদি জানতে, ও আমার উড়াল পঙ্খী রে, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম, কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়, পাখি রে তুই খাঁচা ভেঙে আমার কাছে আয়, তুমি এমনই জাল পেতেছ প্রভৃতি।

বরেণ্য সংগীত শিল্পী সুবীর নন্দী ১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর হবিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। দরদী কণ্ঠের আধুনিক বাংলা গানের অবিস্মরণীয় এই কণ্ঠ শিল্পীর প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গান গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি। বেতার থেকে টেলিভিশন। তারপর চলচ্চিত্রে একের পর এক সুরের মায়া ছড়িয়েছেন। জনতা ব্যাংকে চাকরি করেছেন দীর্ঘদিন। বেশকিছু সংগীতভিত্তিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনাও করেছেন। আধুনিক সংগীতের পাশাপাশি তিনি গেয়েছেন শাস্ত্রীয় সংগীত, ভজন, কীর্তন এবং পল্লী গীতি। সিলেট বেতারে তিনি প্রথম গান করেন ১৯৬৭ সালে। এরপর ঢাকা রেডিওতে সুযোগ পান ১৯৭০ সালে। সেই সময় তিনি নজরুলগীতি গেয়ে রেডিওর অডিশনে পাস করেন। ১৯৮১ সালে তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’ প্রকাশ পায়। চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম গান করেন ১৯৭৩ সালে ‘সূর্যগ্রহণ’ ছবিতে। সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন। তিনি মহানায়ক (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬), শ্রাবন মেঘের দিন (১৯৯৯), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪) ও মহুয়া সুন্দরী (২০১৫) চলচ্চিত্রে গানে কণ্ঠ দিয়ে পাঁচ বার শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। আর একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন এবছর। বাচসাস পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে। এ ছাড়া লন্ডনের ‘হাউস অব কমন্স’-এ ২০০৪ সালে সব সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে গান শুনিয়েছেন এ শিল্পী। যেখানে প্রথম সেতার বাজিয়েছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর।

সুবীর নন্দীর পিতা সুধাংশু নন্দী ছিলেন একজন চিকিত্সক ও সংগীতপ্রেমী। তার মা পুতুল রানী চমত্কার গান গাইতেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভাই বোনদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিতে শুরু করেন ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে। তবে সংগীতে তার হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়বার সময় থেকেই তিনি গান শিখতে শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে গান করেন। তার ওস্তাদ ছিলেন গুরু বাবর আলী খান। লোকগানে ছিলেন বিদিত লাল দাশ।

জেপির শোক

বরেণ্য সংগীত শিল্পী সুবীর নন্দীর পরলোকগমনে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম। গতকাল এক বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বলেন, সুবীর নন্দী ছিলেন দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সংগীত জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো। নেতৃবৃন্দ তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।

এছাড়াও দলের নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন।