পোশাক কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করা যাবে

এখন থেকে পোশাক কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করা যাবে। আর পোশাক শ্রমিকদের জন্য আলাদা বিধিমালা করে কল্যাণ তহবিল গঠন করা হবে। তৈরি পোশাক কারখানায় পাঁচ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করলে সেখানে স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিক স্থাপন বাধ্যতামূলকভাবে করতে হবে। এসব বিধান রেখে শ্রম আইন-২০০৬’র সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হুসাইন ভুঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, বৈশ্বিক পরিবেশ এবং বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও বিদ্যমান বাস্তবতার ?আলোকে শ্রম আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। আগে শ্রমিকরা গ্র্যাচুয়িটি (মহার্ঘ্য ভাতা) পেতেন এক বছরের বিপরীতে এক মাসের বেতনের সমান। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, চাকরির মেয়াদ ১৫ বছরের বেশি হলে দেড় মাসের বেতনের সমান গ্র্যাচুয়িটি পাবেন। এছাড়া সংশোধনীতে রয়েছে কারখানা থেকে বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখা যাবে না। দুর্ঘটনা ঘটলে কারখানা থেকে বের হওয়ার সময় কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। এছাড়া মন্ত্রিসভার বৈঠকে ইট প্রস্তুত নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩’র খসড়া নীতিগত অনুমোদন, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ (সংশোধন) আইন-২০১৩’র খসড়া অনুমোদন ও ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) বিদায়ী মহাসচিবকে মৈত্রী পদক প্রদানের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়া সফর সম্পর্কে অবহিত করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ইটভাটার বিদ্যমান ১৯৮৯ সালের আইনটিকে (সংশোধনী ১৯৯২ ও ২০০১) নতুন করে প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা মন্ত্রিসভা নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। ইটভাটায় জ্বালানির ক্ষেত্রে কাঠ ও উদ্ভিদজাত বস্তু ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ আইনের ব্যত্যয় ঘটলে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও তিন লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ইটভাটার জন্য নিষিদ্ধ স্থান (আবাসিক জনবসতিপূর্ণ, সংরিক্ষত বন বিভাগ, বাণিজ্যিক, পৌর এলাকা, কৃষি প্রধান এলাকা, জলাভূমি, বাগান ও সরকার ঘোষিত সংকটাপন্ন এলাকা) নির্ধারণ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ এলাকায় ইটভাটা নির্মাণ করলে অনধিক এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ইট তৈরিতে উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করলে দুই বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান থাকছে। ওআইসির বিদায়ী মহাসচিব একমেলেদ্দীন ইহসানোগন্তুকে বাংলাদেশের মৈত্রী পদক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। বাংলাদেশের সঙ্গে সর্ম্পক উন্নয়ন এবং ওআইসির আধুনিকায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখায় তাকে এই পদক দেয়া হবে। তিনি আগামী ৫ মে বাংলাদেশে আসবেন। ৬ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে এই পদক তুলে দিবেন। তিনি বাংলাদেশের এই পদক পাওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি। বৈঠক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অন্যতম শরীক জাতীয় পার্টির (এ) একমাত্র মন্ত্রী বাণিজ্য মন্ত্রী জি এম কাদের সরকারের সমালোচনা করা বক্তব্য দিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হয়। তার বক্তব্যে দল ও সরকারের মধ্যে ব্যাপক প্রক্রিয়ার সৃষ্টি হলেও সরকার প্রধান ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারের সমালোচনা করে কাদেরের বক্তৃতাকে সহজভাবে দেখেছেন। দলীয় নেতা ও বিক্ষুব্ধ মন্ত্রীরা শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ তুলে কাদেরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানালেও শেখ হাসিনা বলেন, এই ঘটনা নিয়ে বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। মনে রাখতে হবে জি এম কাদের আমাদের দলের নন। অন্য দলের মন্ত্রী তাই তার সরকার বিরোধী মনোভাব পোষণ করে বক্তৃতা দেয়া স্বাভাবিক। প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার লালমনিরহাট একটি অনুষ্ঠানে জি এম কাদের বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে সংসদ অকার্যকর হওয়ায় গণতন্ত্রও অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ কাদের। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সংসদ সদস্যদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাইরে কথা বলার সুযোগ নেই। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি উল্লেখ করে গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, দেশের মানুষ বড় দুই দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। জনগণ তাদের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচতে চায়। তাই তারা জাতীয় পার্টির পতাকা তলে দলবদ্ধ হচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এক নূর হোসেনের জন্য হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে স্বৈরাচার বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে অসংখ্য মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। যারা আজ মানুষ হত্যা করছে তারা কি স্বৈরাচার নয়? গত শনিবার অপর একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ৯০-সালের পর থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো সরকার ক্ষমতায় এসেছে সবাই স্বৈরাচারী। সরকার, বিচার বিভাগ ও সংসদ এখন প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে বিধায় সংসদ ও গণতন্ত্র এখন অকার্যকর। মন্ত্রিসভা বৈঠক সূত্র জানায়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী জি এম কাদেরের বক্তব্যের সমালোচনা করে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনেন। এরপর আরো কয়েকজন মন্ত্রী এই নিয়ে কথা বলেন। পরে সরকার প্রধান শেখ হাসিনা বলেন, বাণিজ্যমন্ত্রীর এ ধরনের বক্তৃতা কৌশলের অংশ। হয়ত চাপে পড়ে এ ধরনের কথা বলেছেন। সভায় প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরো বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করতে হবে। আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে চাই।