কিশোর যোদ্ধা রহিম

রহিম বাজার থেকে সওদা কিনতে গিয়ে দেখে, বাজারের পাশে মেইন রোডে পাক-বাহিনীর চার-পাঁচটা গাড়ি থামিয়ে মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয়দের সহযোগিতায় ঝটপট করে তাঁবু টাঙিয়ে বিশাল ক্যাম্প করেছে। অনেক বাজারের লোকও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে এবং রহিম এই ঘটনায় ওই আতঙ্কিত দৃশ্যে রহিমের যেন কলিজায় পানি নেই। সে জলদি করে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এসে সোজা ওর কাকার কাছে চলে যায় এবং কাকাকে বলতে থাকে, কাকা! কাকা গো!! এইবার আর বাঁচা যাইবো না! আর বাঁচতে পারমু না! জানো কাকা? ওই বা-আ-জা-রে চাইর-পাঁচটা গাড়ি থামাইয়া মে-লে-টা-রি-রা ইট্টু সময়ের মধ্যে তাঁবুর ঘর বানাইয়া ফালাইছে। আর গাড়ির উপরে রাইফেল মেশিনগান তাক কইরা রাখছে। আমাগোরে আর বাঁচাইবো না বুঝি কাকা? ..... অহন কী অইবো? কোথায় যামু? কাকা বল না? আবার বললা যে গত কাইল কলাগাছিয়ায় হিন্দুপাড়ার সমস্ত বড় বড় বাড়ি-ঘর পোড়াইয়া ফলাইছে; এবং নামী-দামী লোকজন ধরে নিয়ে নির্যাতন করে, গুলি করে, অর্ধমৃত অবস্থায় মাটিচাপা দিয়েছে! কও কাকা অহন আমাগো কী অইবো? রহিমের কাকা জসিম মনোযোগ সহকারে রহিমের কথাগুলো মাথায় নেয়। আর মনে মনে জটিলতার ভাবনা প্রকাশ না করে রহিমকে বলে ভয় করিসনে। আমি একজন প্রথম শ্রেণির মুক্তিযোদ্ধা আমার নাম পাক-বাহিনীর প্রথম পাতায়। তাতেও আমি ভয় পাই না। যুদ্ধ কৌশল অস্ত্র চালনা বিস্ফোরক সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও চোরাগোপ্তা গেরিলা দুঃসাহসিক লড়াইয়ে কঠোর হামলার ট্রেনিং দিয়েছি। ওদের সাথে যুদ্ধে আমি ভয় পাই না। তাছাড়া তোরও যুদ্ধ কৌশল কিশোর যোদ্ধা হিসেবে অনেক কিছু জানা আছে। সেই মোতাবেক আমার সাথে নেমে পড়বি। তার আগে আজকে বিকেলে তুই সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে আচার বিক্রি করতে যাবি। সেই আচারে মেডিসিন মিশ্রিত থাকবে। তোর তো একটা উপরি পাকিস্তানি ভাষা শেখা আছে। সেই ভাষায় তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করে আচার পরিবেশন করবি ছদ্মবেশে, ওরা ওই আচার সুস্বাদু স্বাদে সবাই খাবে এবং খেয়ে পৃথিবী থেকে চলে যাবে। তারপর দেখবি খেলা! এসব কথা রহিমের মা সবই শুনেছে দূর থেকে, শুনে রহিমকে বলে যাও! যানটা খুয়াইতে যাও!! তই ওখানে গেলে (ক্যাম্পে) আর ফিরে আসতে পারবি না? তুই যাসনে বাবা দেখ? তোর বাবা নেই। তুই একমাত্র সন্তান বুকের ধন তুইও যদি হারিয়ে যাস তাহলে আমি কাকে নিয়ে থাকবো এই পৃথিবীতে। দেশের অবস্থা খুবই খারাপ, পাক-বাহিনীরা যেভাবে নেমে পড়েছে তাতে বাঙালিরা বাঁচতে পারবে কি জানি না বাবা? রহিম মায়ের বারণ না শুনে বলে, না-মা, আমি দেশের স্বার্থে যদি মরে যাই আর একদিন স্বাধীন দেশতো পাবই মা—আর সেদিন আমার মরে যাওয়ার কৃতিত্ব থাকবে। দেশের কোটি কোটি জীবন আজ দিশেহারা, লক্ষ লক্ষ প্রাণ দেশের জন্য বিলিয়ে দিচ্ছে। আর সাধারণ আমি রহিম! ঠিক আছে বাবা ঃ তবে সাবধানে থাকিস? রহিম আজ বিকেলেই ছদ্মবেশে পাক-বাহিনীর ক্যাম্পে যাচ্ছে আচার নিয়ে! সাহসের ডালি ভরে। যেকথা সেই কাজ। আচার সুন্দরভাবে পরিবেশন করছে সব সেনাদের। তাদের নিজ ভাষায় কথা বলছে। ওরাও ওকে ভালবেশে বেশি বেশি করে খাচ্ছে আর রহিম ফাঁকে ফাঁকে লুকানো দৃষ্টিতে সব বুঝে নিচ্ছে। আচার খাওয়া শেষ হলে এক পা-দু পা করে রহিম বেরিয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনীদের সব জানায় রহিম এসে। পরদিন ভোর হতে না হতেই মুক্তিবাহিনীর কমান্ডারসহ আধো আধো ফর্সা কিশোর যোদ্ধা রহিমকে আগে পাঠায়। কি অবস্থায় আছে পাক-বাহিনী ক্যাম্পে। রহিম গোপনে একটা অস্ত্র নিয়ে ছুটছে পাক-বাহিনীর অবস্থা জানার জন্য। মুক্তিবাহিনীর বাংকার ডিঙিয়ে যখনই দেখল তার ওষুধে ভীষণ কাজ করেছে! জেনে রহিম আর বেশি দেরি না করে নিজের হাতে অস্ত্র থাকা গ্রেনেড ছুঁড়ে মারলো ঘুমন্ত পাক-সেনাদের উপর এবং সাথে সাথে এক গ্রেনেডে সবাই নিহত হল! কিন্তু অসতর্কতার কারণে রহিমকে আর বাঁচানো গেল না। জয়বাংলা শ্লোগানে দেশ বিজয় পতাকার পত পত আওয়াজে রহিমের লাশ কাঁধে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয় মুক্তিযোদ্ধারা।