আমার কথা
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:৪০
১৯৭৩ সাল। দু’বছর আগে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমি তখন আমার গ্রাম ছিলোনীয়ায় (ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম), উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সদ্য স্বাধীন দেশের সদ্য তরুণ আমরা, সবকিছুই তখন নতুন লাগে। সব কিছুই আকর্ষণীয় মনে হয়। বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক ও কথাসাহিত্যিক সুব্রত বড়ুয়া সম্পর্কে আমার দাদা হন, আমার ছাত্র বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠিত লেখক। ১৯৬৯ সালে মানুষ যখন চন্দ্রপৃষ্ঠে পা রাখে, তখন সেই চমকপ্রদ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুব্রত বড়ুয়া ‘চাঁদে প্রথম মানুষ’ নামে একটি বই লিখে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য জগতে হৈ-চৈ ফেলে দেন। আমার শ্রেণিপাঠ্য সাধারণ বিজ্ঞান বইয়ে সুব্রত বড়ুয়ার নামসহ ‘চাঁদে প্রথম মানুষ’ বইটির নাম ছাপা হয়। প্রতিদিন আমি আবেগ ভরে এ নাম দেখি আর রোমাঞ্চিত হই। সুব্রত বড়ুয়ার ছোট ভাই সনজীব বড়ুয়া আমার এক বছরের বড়, তিনি চট্টগ্রাম শহরে থেকেই লেখাপড়া করেন আর বড় ভাই সুব্রত বড়ুয়ার মতোই দেশের পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত ছড়া-কবিতা গল্প লেখেন। আমি গ্রামে থাকলেও পত্র-পত্রিকা পড়ার সুবাদে সনজীবদা’র লেখালেখির খবর জেনে যাই এবং তিনি মাঝেমধ্যে গ্রামে বেড়াতে আসলে তার সঙ্গে লেখালেখি বিষয়ে আলাপ হয়। তার দেখাদেখি ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার ইচ্ছে জাগে আমার মনে। আমিও কয়েকটি পদ্য ধরনের লেখা লিখে ফেলি এবং সনজীবদাকে দেখতে দিই। তিনি আমার ছন্দের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেন এবং যত্নের সঙ্গে বিভিন্ন ছন্দের মাত্রা গণনার কায়দা-কানুন শিখিয়ে দেন। সেদিন তিনি আমার একটি কাঁচা লেখা পত্রিকা অফিসে পৌঁছে দেবেন বলে সঙ্গে করে শহরে নিয়ে যান এবং সেটিই আমার প্রথম প্রকাশিত লেখা। ১৯৭৩ সালের জুন মাসে চট্টগ্রামের ‘দৈনিক মিছিল’ নামক পত্রিকার ‘ছোটদের মিছিল’ পাতায় সে লেখাটি ছাপা হয়। এভাবেই আমার লেখালেখির সূচনা।
আমি ছড়া রচনা দিয়ে শুরু করলেও ধীরে ধীরে ছোটদের কবিতা লেখার দিকে ঝুঁকে পড়ি। আমার সমসাময়িক লেখকরা কবিতা-পদ্য তখন কমই লিখতেন। ফলে ১৯৭৬-৭৭ সালের দিকে সংবাদের খেলাঘর ‘কিশোর বাংলা’, দৈনিক বাংলার ‘সাত ভাই চম্পা’, বাংলার বাণীর ‘শাপলা কুঁড়ির আসর’-এর পাতায় প্রকাশিত আমার পদ্যধর্মী লেখাগুলোর জন্য খানিকটা প্রশংসা সূচক মন্তব্য পেতাম। তারপর ১৯৮২ সালে যখন ঢাকায় চলে এলাম তখন কিশোর বাংলা অফিসে ‘চাঁদের হাট’ সাহিত্য আসরে রফিকুল হক দাদুভাইসহ অনেক অগ্রজ সাহিত্যিকের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেতে শুরু করি, সম্ভবত ১৯৮৩ সালে চাঁদের হাট সাহিত্য আসলেই ‘পাহাড়, আমি তোমার মিতা’ শিরোনামে আমি একটি কিশোর কবিতা পড়ি, শ্রদ্ধেয় রফিকুল হক দাদুভাই-সহ উপস্থিত অনেক অগ্রজ লেখক সেদিন আমার লেখাটির অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন। এরপর দৈনিক সংবাদপত্রিকার ‘খেলাঘর’-এর সাহিত্য আসরে ‘যেতে যেতে’ শিরোনামে রেলগাড়ি বিষয়ে একটি কিশোর কবিতা পড়ি। সে কবিতাটির জন্যও খ্যাতিমান ছড়াকার মোহাম্মদ মোস্তফা ও আখতার হুসেন কর্তৃক প্রশংসিত হই। আমার এ সময়ের লেখা কিশোর কবিতাগুলো দিয়ে ১৯৮৫ সালে আমার প্রথম বই ‘বাড়ির সঙ্গে আড়ি’ প্রকাশ করি। বইটি প্রকাশের পরপরই প্রিয় শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন পত্রিকায় আলোচনা লিখে আমাকে অভিনন্দন জানান। সে বছরই আমার প্রথম বই ‘বাড়ির সঙ্গে আড়ি’র জন্য আমি অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার লাভ করি। এরপর আমি আরো অনেক পুরস্কার-সম্মাননা পেলেও প্রথম বইয়ের জন্য পুরস্কৃত হওয়ার আনন্দ-স্মৃতি এখনো আমাকে আপ্লুত করে।
পত্রিকায় প্রথম লেখা প্রকাশের অনুভূতির সঙ্গে কোনো অনুভূতির তুলনা হয় না। গ্রামে ছিলাম বলে আমার প্রথম লেখা প্রকাশের দিনই আমি তা দেখতে পাইনি। সেই যে আমার জ্যাঠতুত দাদা সনজীব বড়ুয়া পত্রিকায় ছাপানোর জন্য পৌঁছে দেবেন বলে গ্রাম থেকে আমার একটি লেখা সঙ্গে করে শহরে নিয়ে গিয়েছিলেন, আগেই বলেছি সেটাই আমার প্রথম প্রকাশিত লেখা। লেখাটি প্রকাশের পর সনজীবদা শহর থেকে বাবাকে দিয়ে আমার কাছে পত্রিকার কপি পাঠান। গ্রামে বসে আমি সেই পত্রিকার কপিটা পাই দু’দিন পর। তখন বর্ষাকাল, জুন মাস। বাবা যেদিন আমার প্রথম প্রকাশিত লেখার পত্রিকার কপিটা নিয়ে গ্রামে আসেন তখন বন্যার পানিতে গ্রাম থইথই। আমাদের বাড়ির উঠানে এক গলা পানি। উঠানের উপর দিয়ে নৌকো চেপে এসে বাবা সরাসরি আমাদের ঘরের বারান্দায় পা রাখেন। নেমেই পকেট থেকে বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরেন একটি পত্রিকা, বলেন, এটি সনজু দিয়েছে, এতে নাকি তোমার লেখা ছাপা হয়েছে, দেখো। ছাপার অক্ষরে প্রথম নিজের নাম দেখে যে আনন্দ ও গর্ব হয়েছিল বন্যার কারণে তার প্রকাশ আমি সেদিন পুরোপুরি ঘটাতে পারিনি। পাড়ার ও স্কুলের সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকাটি দেখাতে পারিনি বলে সেদিন আমার কষ্টের অনুভূতিও কম হয়নি, তবে পত্রিকাটি বগলদাবা করে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি অনেক দিন, তখন আমার কেবল মনে হত আমাদের অজপাড়া গাঁয়ে আমিই একমাত্র মানুষ যার নাম পৃথিবীর সবাই জানে।
ছেলেবেলায় আমি কলেজের মাস্টার হতে চেয়েছিলাম। নানা কারণে তা আর হয়ে উঠতে পারিনি। এখন আমি এক সরকারি দপ্তরের মুদ্রণ ও প্রকাশনা কাজ তদারকি করি। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমি প্রিয় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার নায়ক ‘অমলকান্তি’ যে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল, কিন্তু সে রোদ্দুর হতে পারেনি, সে এখন অন্ধকার একটি ছাপাখানায় কাজ করে। আমি অনেকটা সেই অমলকান্তির মতোই।
প্রিয় লেখাটি মনে হয় এখনো লিখতে পারিনি। কোনো নতুন লেখা লেখার দু’তিন পরই তা আমার কাছে খুবই সাধারণ মানের মনে হতে থাকে। তবু আমার লেখাগুলোর মধ্যে ‘কৃষ্ণচূড়ার কাছে’, ‘মাগো আমি যুদ্ধে যাবো’, ‘কোনো একদিন’, ‘দিদিকে লেখা চিঠি’, ‘প্রিয় বন্ধু’, ‘লালীর জন্যে’, ‘আমি এখন ভূত’ কিশোর কবিতাগুলো এবং ‘বন পাহাড়ের আমি’ কিশোর উপন্যাসটি আমার মাঝে মাঝে পড়তে ইচ্ছে করে। পড়ে চমত্কৃত হই, ভাবি, এ লেখা সত্যি আমি লিখেছিলাম!
আমাদের গ্রামে ‘মনা’ নামের একটি ছেলে ছিল। বয়সে সে আমার চেয়ে বছর পাঁচেকের ছোট। তার আপন মা বেঁচে নেই। সত্ মায়ের অত্যাচারে সে ছিল অতীষ্ঠ। কষ্ট সহ্য করতে না পেরে একদিন সে বিষপানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। নির্জন দুপুর বেলা রাস্তার মোড়ে তার আব্বার দোকানের ভেতরে একা একা বিষপান করে সে গোঙ্গাতে থাকে। তার গোঙ্গানির শব্দ শুনে আমি দোকানের দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে উঁকি দিই এবং তাকে দরজা ভেঙে উদ্ধার করি। রিকশা ডেকে তাকে তখনই সরকারি ডাক্তারখানায় নিয়ে গিয়ে সারিয়ে তুলি। সেই মনা এখনো বেঁচে আছে। সে এখন রিকশা চালায়। আমি গ্রামে গেলে বাসঘাট থেকে তার রিকশায় করে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। কিন্তু রিকশা ভাড়া নিতে চায় না আমি জোর করে তার হাতে ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা গুঁজে দিই। আর মনে মনে বলি মনা তুই বেঁচে থাক।