জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

১৪ দিনে ভারত দেখা

ট্যুরের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল অনার্স পরীক্ষার ঠিক পরেই। দীর্ঘ ৪ মাস ধরে চলে পাসপোর্ট ও ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ। এরই মধ্যে ট্যুর কোম্পানির সাথে যাওয়ার চুক্তি চূড়ান্ত হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সকলের ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অবশেষে ২৩ মার্চ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্সের ১৯ জন শিক্ষার্থী ও বিভাগের প্রফেসর ড. তাইবুল হাসানের নেতৃত্বে ৩ জন শিক্ষক ক্যাম্পাস থেকে রাত ১১টায় বাসে রওনা হলাম কলকাতার উদ্দেশ্যে। বিকাল প্রায় ৪টার দিকে আমরা কলকাতায় পৌঁছলাম। রাত ১০.৪৫ টায় শিয়ালদহ-আজমির এক্সপ্রেস ট্রেনে রওনা হলাম আগ্রার উদ্দেশ্যে। পরদিন ভোরে আমরা ছুটলাম মুঘল সম্রাট শাহজাহানের প্রেমের অমর র্কীতি তাজমহল দেখতে। তখনো তাজমহলের গেট খোলেনি। গেটে প্রচুর বিদেশি পর্যটক অপেক্ষা করছিল প্রবেশের জন্য। তাজমহলে প্রবেশের তিনটি গেট থাকলেও আমরা প্রবেশ করলাম পূর্বদিকের গেট দিয়ে। যমুনা নদীর তীরে শ্বেতশুভ্র মার্বেল পাথরের তৈরি এ সমাধি সত্যিই বিস্ময়কর। তাজমহল দেখা শেষ করে আমরা যাই আগ্রাফোর্টে। লাল পাথরের দেয়ালঘেরা উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত ফোর্টটি। এরপর আমরা চললাম ফতেহপুর সিক্রিতে। ফতেহপুর সিক্রি থেকে আমরা পিংক সিটি হিসাবে খ্যাত রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর যাই। এরপর আমরা জয়পুরে শহরে ফিরে দেখতে গেলাম মানসিংহের প্রাসাদ আম্বরফোর্ট, জলমহল, হাওয়ামহল, এশিয়ার বিখ্যাত সিনেমা হল রাজমন্দির। জয়পুরে দুইদিন কাটিয়ে আমরা আবার রওনা হলাম শিমলার উদ্দেশ্যে। জয়পুর থেকে বাসে দিল্লী স্টেশনে। এরপর রাত ১০টায় কালকা মেইল ট্রেনে কালকা স্টেশনে। সকাল ৭ টায় ট্রেন কালকা স্টেশনে পৌঁছাল। কালকা থেকে আবার ট্রয় ট্রেনে সকাল ৯টায় শিমলার উদ্দেশ্যে রওনা হই। কালকা থেকে প্রায় ২৩০ কি.মি. দূরে প্রায় ৬০০০ ফিট উঁচুতে হিমাচল প্রদেশের রাজধানী শিমলা। হিমাচল প্রদেশকে বলা হয় দেবভূমি। ট্রেন চলতে শুরু করল আকা বাকা পাহাড়ী পথ ধরে। কিছুক্ষণ পরে নিচের সবকিছু খুবই ক্ষুদ্র দেখাচ্ছিল। পাহাড় কেটে ট্রেনের পাশাপাশি গাড়ীর রাস্তাও চলে গেছে এঁকে বেঁকে। পাইনগাছে আবৃত পাহাড়গুলো পুরোটাই পাথুরে। ট্রেন কোন স্টেশনে থামলেই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে ছবি তুলতে থামল। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড় পার করে ট্রেন চলতে থাকল। কখনো পাহাড়ের বুক চিরে, আবার কখনো পাহাড়ের ভিতর টানেলের মধ্যদিয়ে এগিয়ে চলল। প্রায় ১০৩টি টানেল অতিক্রম করে শিমলা স্টেশনে যখন পৌঁছালাম তখন অঝোড় ধারায় বারি ঝরছিল। পরেরদিন সকালে শিমলা থেকে প্রায় ২৫৭ কি.মি. দূরে বরফে আচ্ছাদিত মানালির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বিয়াস নদীর তীরে কুল্লু পার হওয়ার পরেই সাদা বরফে ঢাকা মানালীর পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছিল। পাইন আর দেবদারু গাছে ঢাকা পাহাড়গুলো। কোথাও পাহাড়ের কান্না ঝরণা হয়ে পতিত হয়েছে বিয়াস নদীতে। রাস্তার দু’পাশে মাইলের পর মাইল শুধু পাতাহীন আপেল বাগান। পরেরদিন সকালে মানালী থেকে ১৭ কি.মি. দূরে সোলানভ্যালিতে গেলাম বরফের পাহাড়ে ওঠার জন্য। বরফে ওঠার জন্যা সবাই ওভারকোট ও বুট ভাড়া করলাম। চারিদিকে সাদা বরফে আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল। রাত ১০ টার ট্রেনে আবার রওনা হলাম দিল্লীর উদ্দেশ্যে। খুব ভোরে আমরা দিল্লীতে পৌঁছলাম। বিকালে গেলাম দিল্লীর রেড ফোর্ড দেখতে। আগ্রাফোর্টের মতই এটি লাল পাথরের উঁচু দেয়ালে ঘেরা। ফোর্টে ডুকতেই চোখে পড়ল মিনা বাজার যা এখনও মুঘল সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এবার ফেরার পালা। রাত ৮টায় দুরন্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে দিল্লী থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। প্রায় ১৪৩০ কি.মি.পথ পাড়ি দিয়ে ট্রেন কলকাতায় পৌঁছতে প্রায় ১৭ ঘন্টা সময় নিল। স্টেশনে থেকে সোজা হোটেলে। বিকালে বেরিয়ে পড়লাম কলকাতা শহর ঘুরতে। এখনও কলকাতা শহরে মানুষে টানা রিক্সা দেখতে পেলাম। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ইডেন গার্ডে, হাওড়া ব্রীজ, নিউ মার্কেট ঘুরে হোটেলে পৌঁছতে রাত ১০টা। পরেরদিন সকালেই আমাদের কলকাতা থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। তাই রাতেই সবাই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখল। ৬ এপ্রিল সকালে বাস ছাড়ল। বাস ছুটে চলল যশোহর রোড হয়ে বেনাপোল সীমান্তের দিকে। দুপুর ২টার দিকে বেনাপোল পৌঁছালাম। দেশের মাটিতে পা ফেলে এক অন্য রকম সুখ অনুভব করলাম। এতদিন পর দেশের মাটির ঘ্রাণে মন প্রাণ জুড়িয়ে এল। ফেলে এলাম এক রোমাঞ্চকর স্মৃতি। এই ট্যুরের সমাপ্তি টানতে গিয়ে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষিকা আনিছা পারভীন বলেন ‘ভ্রমণ সব সময়ই আনন্দদায়ক তবে শুধু আনন্দ নিলেই চলবে না, শিক্ষাও গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বকে দেখার মাধ্যমে নিজেকে জানতে হবে, নিজের দেশকে ভালবাসতে হবে’।