ককটেল বিস্ফোরণ, গাড়ি ভাংচুরের মধ্য দিয়ে রাজধানীতে হরতাল চলছে
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩৪
আটক শীর্ষ নেতাদের মুক্তি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ৩৬ ঘণ্টার হরতাল চলছে। হরতালের প্রথম দিন গতকাল মঙ্গলবার হরতাল সমর্থকরা রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ, ঝটিকা মিছিল, গাড়ি ভাংচুর ও সড়ক অবরোধ করাসহ বিভিন্ন ধরনের নাশকতার চেষ্টা করে। অন্যান্য হরতালের তুলনায় রাজধানীর সার্বিক পরিস্থিতি ছিল শান্ত। অধিকাংশ এলাকায় দোকানপাট খোলা ছিল। সড়কে যানবাহন চলাচল ছিল চোখে পড়ার মত। তবে দূরপাল্লার বাস ছাড়েনি। ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল ছিল স্বাভাবিক। সতর্ক অবস্থায় ছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে নগরীতে বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল তালাবদ্ধ। সেখানে জোটের কোনো নেতা-কর্মীকে দেখা যায়নি। জুরাইন ও নয়াবাজার এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণে আহত হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও শিশুসহ তিন জন। এদিকে যানবাহন ভাংচুরের অভিযোগে পুলিশ ১৯ জনকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত মহিলা দলের কর্মীসহ ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন।
সকাল সাড়ে ৬টার দিকে আজিমপুর ছাপড়া মসজিদ এলাকায় হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের করে হরতাল সমর্থকরা। এসময় দুইটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। পুলিশ আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা সটকে পড়ে। সকালে আগারগাঁও এলাকায় কয়েকজন যুবক একটি সিএনজি ভাংচুর করে। মিরপুর বাঙলা কলেজের সামনে পরপর দুইটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় পিকেটাররা। প্রায় একই সময় যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকায় শিবির কর্মীরা একটি ঝটিকা মিছিল বের করে। ধোলাইখাল এলাকায় শিবিরের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশ সেখান থেকে একজনকে গ্রেফতার করে। সেখানেও কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সকাল পৌনে ৭টার দিকে মালিবাগ এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে একটি মিছিল বের হয়। পুলিশের ধাওয়ার মুখে মিছিলকারীরা পালিয়ে যায়। এসময় বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ১০টি ককটেল। আসাদ গেট এলাকায় ছাত্রদলের একটি মিছিল পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিস্ফোরিত হয় ৫টি ককটেল। আগারগাঁও তথ্য কমিশনের প্রধান ফটকে বিস্ফোরিত হয় দুইটি ককটলে। তেজগাঁয়ের হাতিরঝিল এলাকায় ছাত্রদল ঝটিকা মিছিল বের করে। তারা এসময় একটি সিএনজি অটোরিকশা ভাংচুর ও টায়ারে আগুন দেয়। পুলিশ ধাওয়া করলে তারা পালিয়ে যায়। এসময় বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে।
গোপীবাগ দ্বিতীয় লেনে সকালে মহিলা দল মিছিল বের করে। এসময় পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়লে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পুলিশ ধাওয়া করে মহিলা দলের এক নেত্রীকে গ্রেফতার করে। দুপুরের দিকে পুলিশ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে দুইটি ককটেল সদৃশ বস্তু উদ্ধার করে। পুরনো ঢাকার প্যারীদাস রোডে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কর্মীরা একটি মিছিল বের করে। পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুঁড়লে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সকালে নারিন্দা এলাকায় হরতাল সমর্থকরা কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে। দুপুর দেড়টার দিকে জজকোর্টের সামনে দুইটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। নয়াবাজার এলাকায় দুপুরে ককটেল বিস্ফোরণে আব্দুর রাজ্জাক (৪৫) নামে এক রিকশা চালক ও তাঁতীবাজার এলাকায় আহত হন পথচারী শাজাহান (৫০)। তাদেরকে স্যার সলিমুল্লাহ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তেজকুনিপাড়া এলাকায় সকালে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের হয়। পুলিশ ধাওয়া করে এ সময় একজনকে গ্রেফতার করে। সকালে খামারবাড়ী এলাকায় দেড় লিটার পেট্রোলসহ ৫ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। সকালে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে ছাত্রশিবির একটি মিছিল বের করে। তারা টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করার চেষ্টা করে। পুলিশের ধাওয়ার মুখে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে অর্কিড কমিউনিটি সেন্টারের সামনে একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করে। এছাড়াও ফকিরাপুল বকশি হোটেলের সামনে ও গুলিস্তান ইমপেরিয়াল হোটেলের সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়।
মোহাম্মদপুর আওরঙ্গজেব রোডে গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নি সংযোগের চেষ্টাকালে জাকির হোসেনকে ও রিংরোডস্থ হক সাহেবের গ্যারেজের সামনে থেকে শহিদুল ইসলামকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদেরকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। খিলগাঁওয়ে গাড়ি ভাংচুরের ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় মহিলা দলের কর্মী সৈয়দা দিলারা ইসলাম (পলি), নীলুফার ইয়ামীন নীলু ও মিলি জাকারিয়াকে। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদেরকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। তেজগাঁওয়ের গ্রিনরোডস্থ মোস্তফা গলির সামনে গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নি সংযোগের ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় তারিকুল ইসলাম ওরফে ঝন্টু, সোহেল ও রফিকুল সিলাম ওরফে জনি, আবুল হাশেম, আলমগীর হোসেন ও মো. আলমগীরকে। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদেরকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। সাজা ভোগের জন্য ১১ জনকেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
হরতালে মাঠে নেই ছাত্রদল
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, হরতালে রাজধানীতে কোনো কর্মসূচি পালন করেননি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা। এমনকি কয়েকটি শাখার উদ্যোগে মিছিল হলেও তাতে অংশ নেননি কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ। কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গকরণের আট দিনের মাথায় এ হরতালে ছাত্রদলের নেতাদের অনুপস্থিতি হতাশ করেছে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের। অন্যদিকে হরতাল বিরোধী মিছিলে বিভিন্ন ক্যাম্পাস ও সড়ক সরব রেখেছে ছাত্রলীগ। সরকার সমর্থক এ ছাত্র সংগঠনটি হরতাল প্রত্যাখ্যান করে বিরোধীদলকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে মহড়াও দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল মঙ্গলবার হরতালের সমর্থনে রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেট এলাকায় সংক্ষিপ্ত মিছিল করেছে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মহিদুল ইসলাম হিরু। সাধারণ সম্পাদক মাসুদ পারভেজ ও মাইনুলসহ ১১-১২ জন ওই মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া রাজধানীর মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকায় ছাত্রদলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের উদ্যোগে স্বল্প সময়ের মিছিল হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল বলেন, হরতালে পুলিশ নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করেছে। কোথাও কোনো নেতা-কর্মী জড়ো হতে পারছে না। এরপরও রাজধানীতে ১৬-১৭টি এলাকায় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের উদ্যোগে হরতালের পক্ষে মিছিল হয়েছে। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগের সভাপতিত্বে সমাবেশ পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম।
বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা না করে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে বারবার হরতাল দিচ্ছে বিরোধী দল।