কাঁদছে সাভার
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪০
রানা প্লাজায় হূদয়বিদারক দুর্ঘটনায় গোটা সাভার শোকে মুহ্যমান। কে কার স্বজন এ প্রশ্ন নেই কারো মনে। যে যার মতো স্বেচ্ছায় পাশে দাঁড়িয়েছেন হতাহতদের। উদ্ধার তত্পরতায় সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা সরকারের যে কোন বাহিনীর তত্পরতাকে ছাড়িয়ে গেছে। সকাল থেকেই ভেতরে আটকে পড়াদের খাবার পানি, স্যালাইন পানি ও অক্সিজেন সরবরাহে নারী-পুরুষ একসঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। এদের সবার চোখে মুখে ছিল স্বজন হারানোর বিমর্ষ ছাপ। ঘটনার ভয়াবহতায় নিজের অজান্তেই চোখে অশ্রু গড়িয়েছে। নিখোঁজদের খোঁজে অনেক স্বজন নিরবে চোখের জল ফেলছেন।
ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা গেছে, আপনজনের খোঁজে দিশেহারা হাজারো স্বজন। কখন দেখা মেলবে প্রিয় মানুষটির এ প্রতীক্ষা ছিল সবার। কারো মা, কারো স্ত্রী-সন্তানকে ফিরে পাবার প্রতীক্ষায় করুণ চিত্র ছিল বাজার বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশ এলাকাজুড়ে। ঘটনাস্থল থেকে সাভারের সবকটি হাসপাতালের বারান্দা সবখানেই নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে আপনজনদের ভিড় ছিল। অবর্ণনীয় পরিস্থিতিতে স্বজন হারাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে সাভারের বাতাস। প্রতিদিনের মতো গতকালও জীবনের তাগিদে কাজে আসেন ধসে পড়া ভবনের ৩ থেকে ৮ তলা পর্যন্ত অবস্থিত ৪টি গার্মেন্টের শ্রমিকরা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে শ্রমজীবী এই মানুষগুলোকে দিতে হলো চড়া মূল্য। ভবন ধসের প্রায় আধ ঘন্টার মধ্যে সর্বত্র খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজারো মানুষ সেখানে ছুটে যায়। এরপরই ঘটনাস্থল থেকে একে একে নিহত ও আহতদের নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে। স্বজন হারানো লোকজন ভিড় জমান হাসপাতাল ও ঘটনাস্থলে।
পরিবারের সাতজনকে খুঁজে পাচ্ছেন না সানিয়া বেগম। একসঙ্গে এতোজনকে না পেয়ে তিনি যে পাগল প্রায়। বিলাপ করতে করতে ঘটনাস্থান থেকে হাসপাতালের বারান্দা ছুটে চলছেন তিনি। তিনি জানান, তার ছেলে খোরশেদ, দেবর মাসুদ, সালিম, ইমরান, রনি, ননদ মনি ও তার স্বামী মজিদ এরা ওই ভবনে কাজ করতেন। আরেক ছেলে ফারুককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। সানিয়া বেগমের পরিবারের ৭ জন নিখোঁজ রয়েছে। এরা ৫ম তলার পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।
নিখোঁজ মোমেনা ও সজিবকে খুঁজতে আসেন মধ্য বয়সী নারী হাসনা বেগম। তিনি জানান, গত এক মাস আগে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পর থেকে তারা দু’জনেই চাকরি নেন ধসে পড়া ভবনের ৪র্থ তলায় অবস্থিত নিউ ওয়েব বটনস লিমিটেড নামের পোশাক কারখানায়। মঙ্গলবার ওই কারখানাটিতে ফাটল দেখা দিলে কারখানা থেকে তারা বেরিয়ে আসেন। তবে সেদিন বেরিয়ে আসলেও গতকাল বুধবার সকালে পেটের তাগিদে আবারও যোগ দেন ওই কারখানায়। এরা আটকা পড়েন ৪র্থ তলায়। এরপর কয়েকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হলেও দুপুর ২টার দিকে তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। হাসনা বিলাপ করতে থাকেন পথে পথে।
শুধু সামিয়া বেগম, হাসনা বেগম নয় চাপাইনের নূরজাহান বেগম খুঁজছেন তার মেয়ে নার্গিসকে, ছেলে সাইদুর খুঁজছেন তার মা সালেহাকে, সোলেমান খোঁজ করছে শিল্পী ও শাহাদাতকে একইভাবে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার তাদের প্রিয় নিখোঁজ মানুষটিকে খুঁজছেন। হাসপাতালগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর এম্বুলেন্স করে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আর সে সকল এম্বুলেন্সে পিছু ছুটে নিখোঁজ স্বজনরা। প্রতিটি হাসপাতালের সামনে ও ভেতরে পাগলের মতো খুঁজতে থাকেন তারা। অনেকেই আপনজনকে খুঁজতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন।