বিশেষ সম্পাদকীয়

এই ট্র্যাজেডির দায় কে বহন করিবে

সাভারে আবারও বহুতল ভবন ধসিয়া পড়িয়াছে। মহাবিপর্যয় নামিয়া আসিয়াছে ভবনে আটকাইয়া পড়া অসংখ্য নারী-পুরুষের ভাগ্যে। ইতিমধ্যে হাজারখানেক হতাহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হইয়াছে। মৃতের সংখ্যা একশত ছাড়াইয়া যাইবে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানাইয়াছেন যে, বিধ্বস্ত ভবনের মধ্যে এখনো অনেক মানুষ আটকা পড়িয়া আছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাভার বাসস্ট্যান্ডের পার্শ্ববর্তী রানা প্লাজা নামের নয়তলা এই ভবনটিতে বিপণিকেন্দ্র, ব্যাংক ও একাধিক গার্মেন্টস কারখানাসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ছিল। তৃতীয় হইতে সপ্তম তলা পর্যন্ত পুরোটাই ছিল পোশাক কারখানা। সকালে ভবনটি ধসিয়া পড়ার সময় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই খোলা ছিল। পুরোদমে কাজ চলিতেছিল পোশাক কারখানাগুলিতে। এখন সেইখানে শুধুই হাহাকার। আহতদের আর্তনাদ আর নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিবর্গের স্বজনদের বুকফাটা আহাজারিতে ভারি হইয়া আছে সমগ্র সাভারের পরিবেশ। শোকাহত মানুষকে সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানাইবার ভাষা যেমন আমাদের জানা নাই, তেমনি জানা নাই উপর্যুপরি এই অনভিপ্রেত মৃত্যুর নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশের উপযুক্ত ভাষাও। ইহা নিছক দুর্ঘটনা হইলে কাহারও কিছু বলার থাকিত না। কিন্তু ইহাকে দুর্ঘটনা বলিবার অবকাশই বা কোথায়? ভবনটি কেন ধসিয়া পড়িল এবং ইহা বৈধ ও মানসম্মতভাবে নির্মিত হইয়াছিল কিনা—সেইসব প্রশ্ন তো আছেই। সর্বাপেক্ষা বড়ো প্রশ্নটি হইল, ভবনটি যে মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ তাহা জানিবার পরও কেন পোশাক কারখানা ও দোকানপাট খোলা রাখা হইয়াছিল? দুর্ঘটনার আগের দিনই ভবনটিতে বিপজ্জনক ফাটল দেখা দিয়াছিল। স্থানীয় প্রশাসন ও বিজেএমইএসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে তাহা অবহিতও করা হইয়াছিল তাত্ক্ষণিকভাবে। ইউএনওসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভবনটি পরিদর্শনও করিয়াছেন। সর্বোপরি, বিজেএমইএ প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে শিল্পপুলিশের পক্ষ হইতে সুনির্দিষ্টভাবে কারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশও দেওয়া হইয়াছিল। ইহাও বলা হইয়াছিল যে, বুয়েটের ইঞ্জিনিয়াররা ভবনটি পরীক্ষা করার পর কারখানা খোলা যাইবে কিনা তাহা জানানো হইবে। তাহা সত্ত্বেও ভবনটি সিলগালা না করিয়া এতোগুলি মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া দেওয়া হইল কাহার নির্দেশে? শ্রমিকরা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিতে প্রবেশ করিতে ইচ্ছুক ছিলেন না। কিন্তু জোর করিয়া তাহাদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হইয়াছে বলিয়া আহত শ্রমিকরা অভিযোগ করিয়াছেন। যে বা যাহারা সজ্ঞানে শত শত মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া দিয়াছেন তাহাদেরকে অবশ্যই ইহার দায় বহন করিতে হইবে। অতএব, কিছু ব্যক্তির চরম দায়িত্বহীনতা ও গুরুতর গাফিলতিই যে এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী তাহাতে সন্দেহ নাই। ইতঃপূর্বে সাভারের বাইপাইলে অনুরূপ আরেকটি ভবনধসের ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে হতাহত হইয়াছিল প্রায় পাঁচশত পোশাক শ্রমিক। মাত্র কয়েকমাস আগে আশুলিয়ায় অপর একটি পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অকালে ঝরিয়া পড়িয়াছে শতাধিক শ্রমিকের জীবন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গিয়াছে যে, দুর্ঘটনার মূলে রহিয়াছে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতা ও গাফিলতি, যাহা ক্ষমার যোগ্য নহে। কিন্তু ঘটনার পর কয়েকদিন ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ চলিলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী ব্যক্তিরা পার পাইয়া গিয়াছে। চাপা দেওয়া হইয়াছে অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলিকে। ফলে একের পর এক দুর্ঘটনায় শুধু যে শত শত নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটিতেছে তাহাই নহে, একই সাথে রাজনৈতিক অস্থিরতায় এমনিতেই বিপন্ন পোশাক শিল্পের বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায়ও চিড় ধরিতেছে মারাত্মকভাবে। আমরা জানি যে, গত বুধবার সাভারে যাহা ঘটিয়া গিয়াছে কোনোভাবেই এই ক্ষতি পূরণ হইবে না। ইতিমধ্যে একদিনের জাতীয় শোক ঘোষিত হইয়াছে। গৃহীত হইয়াছে আরও কিছু জরুরি ব্যবস্থা। আহতদের সুচিকিত্সা ও নিহতদের পরিবারকে অবশ্যই উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করিতে হইবে। সর্বোপরি, দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে এবং যতো প্রভাবশালীই হউক না কেন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাইতে হইবে তাহাদেরকে। রোধ করিতে হইবে এই ধরনের দায়িত্বহীন ও মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ইহাই প্রশাসনের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য বলিয়া আমরা মনে করি।