ইসলামে শ্রমের মর্যাদা ও মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক
লে. কর্নেল (অব) আকম জাহিদ হোসেন
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৭:৫২
ইসলাম একটি পুর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় মানব জীবনের প্রতিটি দিক সম্পর্কে সুন্দরভাবে নির্দেশনা রয়েছে। একজন মালিকের যেমন নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে; তেমনি শ্রমিকেরও নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। অপর দিকে, একজন শ্রমিকের তার নিজ কাজের জন্য যেমন দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তেমনি তার মালিকের প্রতিও অনুরুপ দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। একজন মালিক তার অধীনস্থ শ্রমিকদের প্রতি হবেন সহানুভূতিশীল। তাদের দুঃখ কষ্টে থাকবে মালীকের আন্তরিক সহমর্মিতা। তাদের দুঃখে তিনি দুঃখিত হবেন, তাদের সুখ ও আনন্দে তিনি আনন্দিত হবেন। শ্রমিকের প্রতি যেমন সহানুভূুিতশীল হবেন তেমনি শ্রমিকের শ্রমের প্রতিও তিনি মর্যাদা প্রদর্শন করবেন। একজন শ্রমিক যে কাজই করুক না কেন; সে তো কাজ করে হালাল উপায়ে বেতন নিচ্ছে। সে তো কোন চুরি, রাহাজানি, ছলচাতুরী, অন্যায় বা দুর্নীতি করে অর্থোপার্জন করছে না। সে তো তার শ্রম দিয়ে হালাল উপায়েই মালীকের নিকট হতে অর্থ উপার্জন করছে। তাই, শ্রমিক যে ধরনের কাজই করুক না কেন তার শ্রমের মূল্যায়ন করা উচিত। শ্রমিকের অন্যায়, অনিয়ম, অনৈতিক ও শৃঙ্খলা বিবর্জিত কাজের জন্য অবশ্যই মালিককে বিধি মোতাবেক তাকে শাসন করবে। তবে শাসন যেন শোষনের পর্যায়ে না পড়ে। শাসক যখন শোষন করে তখন সেই মালিক আর সুশাসক থাকে না। তখন তাকে শোষক বলা হয়। শোষকের শোষনের কারণে শ্রমিক অনেক সময় নিষ্পেষিত, অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হতে থাকে। তখন মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক সাপে-নেউলে সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায়। তখনই শুরু হয় বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, অশান্তি ও ধ্বংসাত্মক মনোভাব। মালিক পক্ষকে শ্রমিকের মনোভাব, মনের অবস্থা, মনের গতি, তাদের ইচ্ছা-বাসনা ইত্যাদি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই মালিক শ্রমিকের মাঝে সম্পর্ক ভাল ও সুমধুর হবে। তাদের উভয়ের মাঝে সম্পর্ক যথেষ্ট উন্নত হবে। প্রতিষ্ঠানে কাজ কর্মের জন্য পারস্পরিক ভাল ও সুমধুর পরিবেশ সৃষ্টি হবে। মালিককে হতে হবে দয়াবান ও ক্ষমাশীল। অধীনস্থরা ভূল-ভ্রান্তি করতেই পারে। একজন মালিক হিসাবে তা অত্যন্ত ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে তাকে মার্জনা করবে। মালিক হবে অত্যন্ত সহিঞ্চুশীল। শ্রমিকের প্রতি সহিঞ্চুতাই মালিকের পরম আদর্শ। তিনি হবেন সহনশীল। অধীনস্থদের কাজ-কর্ম, ভূল-ভ্রান্তিতে তিনি হবেন অশেষ সহন ক্ষমতাশালী। ক্ষমাই হবে মালিকের প্রকৃত ও পরম ধর্ম। শ্রমিকের অন্যায় ও অপরাধ তিনি নিজ হাতে ক্ষমা করে দেবেন। সাহাবীগণ নবীজি (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন কোন খাদেম অপরাধ করলে তার প্রতি কি আচরণ করব; উত্তরে নবীজি (স.) জানালেন, একজন খাদেম দিনে সত্তর বার অপরাধ করলেও তাকে ক্ষমা করে দিও। এ হচেছ শ্রমিকের প্রতি মনিবের মমতাবোধ। শ্রমিকের ওপর ততটুকু কাজ বা দায়িত্ব অর্পন করা উচিত যতটুকু সে সম্পন্ন বা বহন করতে পারবে। শ্রমিক দায়িত্ব বা বোঝা বহন করতে পারবে না এমন কোন দায়িত্ব বা বোঝা তার ওপর অর্পন বা বোঝা চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। শ্রমিক কাজ করার সময় তার ধারে-কাছে থাকাই ভাল। প্রয়োজনে তার কাজে সাহায্য বা সহযোগীতা করা উচিত। শ্রমিকের মজুরী কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করে দেওয়া উচিত। তার শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তাকে তার পারিশ্রমিক প্রদান করা উচিত। কাজ করতে করতে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে গেলে তাকে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম করতে দেয়া উচিত। নামাজ বা এবাদতের সময় হলে তাকে তা আদায় করার সুযোগ দেয়া উচিত। রোজার সময়ে রোজাদার শ্রমিককে হালকা কাজ দেওয়া উচিত; যেন সে রোজা রাখতে পারে। শ্রমিকের পারিশ্রমিক বা মজুরী তার কাজ শুরু করার পূর্বে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করে নেওয়া উচিত। কাজের শেষে বা দিবসের শেষে তাকে মুজুরী প্রদানের মাধ্যমে হাসিমুখে, উত্ফুল্ল চিত্তে শ্রমিককে বিদায় দেয়া উচিত। শ্রমিককে শুধুমাত্র শ্রমিক মনে না করে তাকে একজন মানুষ হিসাবেও গন্য করা উচিত। আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব হিসাবে বিবেচনা করা উচিত। শ্রমিক তার নিজ শ্রম বিনিয়োগ করে কাজ করছে। সেই কাজের প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা উচিত। হালাল কোন কাজকেই খাট বা অবজ্ঞতার দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। দেখা যাবে; মালিকের চেয়ে শ্রমিকই তার কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট অধিক নৈকট্য ও সন্তুষ্ট্যি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। হাদিসে আছে, হযরত নো’মান ইবনে বশীর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীজি (স.) বলেছেন, একে অন্যের প্রতি দয়া প্রদর্শনে, প্রেম ভালোবাসায়, মায়া-মমতায় এবং একের সাহায্যে অন্যের ছুটে আসায় সব ঈমানদারকে তুমি একটি দেহের অনুরূপ মনে করবে। দেহের কোন অঙ্গে ব্যথা লাগলে সমস্ত দেহই অনিদ্রা ও জ্বরে তার শরীক হয়ে যায়। (বুঃ শঃ ৫৫৮০)। শ্রমিকের প্রতি মায়া-মমতা, দয়া-দাক্ষিন্যতা, স্নেহ-প্রীতি প্রদর্শন করা উত্তম কাজ। আল্লাহর সন্তুষ্ট্যি ও নৈকট্যের জন্য সকল উত্তম কাজই এবাদত। এবাদতের উদ্দেশ্যে সকল উত্তম কাজই নেক কাজ। হাদিসে আছে, হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। নবীজি (স.) বলেছেন, প্রত্যেক নেক কাজই ছদকা। (বুঃ শঃ ৫৫৮১)। শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক অত্যন্ত সৌহার্দপুর্ণ হবে। একটি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার উন্নতির জন্য মালিক- শ্রমিক সম্পর্কের বিশেষ অবদান অনস্বীকার্য। মালিক শ্রমিকের নিজেদের মাঝে হতে হবে পারস্পরিক মহব্বত, প্রেম প্রীতি, ভালোবাসা, সমপ্রীতি, সুজনতা, আস্থা, বিশ্বাস, নম্রতা, বিনয়ীতা, সৌজন্যবোধ, যথার্থ মূল্যায়ন, মার্জিত ব্যবহার, শিষ্টাচার, পারস্পরিক কল্যাণ, অনুকুল পরিস্থিতি ইত্যাদি। মালিক ও শ্রমিক উভয়েই নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সদা সচেষ্ট থাকবে। আল্লাহ্ পাক বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ দুস্কৃতির জন্য দায়ী থাকবে। (সুরা মুদ্দাসসির ঃ ৩৮)। তিনি আরও বলেন, কেউ অপরের বোঝা বইবে না। আর মানুষ তা-ই পায় যা সে করে। তার কাজের পরীক্ষা হবে, তারপর তাকে পুরো পা্রতিদান দেয়া হবে। সুরা নজমঃ ৩৯-৪১। মালিক অনেক সময় শ্রমিকের উপর জুলূম নির্যাতন করে। শ্রমিককে তার সঠিক পাওনা থেকে বঞ্চিত করে। শ্রমিককে বিভিন্ন সমস্যায় ফেলে তার সহায় সম্পত্তি গ্রাস করে। মহান আল্লাহ পাক বলেন, হে বিশ্বাবাসিগণ ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; কিন্তু তোমরা অবশ্য পরস্পর রাজি হয়ে ব্যবসা করতে পার।
e-mail : zahid@spcbl.org.bd