এখানে লেখকেরা তাদের হয়ে কথা বলেন, যাদের নিজস্ব কোনো স্বর নেই
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:১৭
কার্লোস ফুয়েন্তেসের জন্ম ১৯২৮ সালে পানামায়; বড় হয়েছিলেন ওয়াশিংটন ডিসিতে। তিনি নিজের পরিচয় দিতেন একজন মেক্সিকান লেখক হিসেবে। বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় সমাজকে ভেতর ও বাইরে থেকে দেখার অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিভাত হয় তাঁর লেখায়, তুলে ধরে মেক্সিকোর ইতিহাস ও বর্তমানের অন্তর্দ্বন্দ্বের এক জটিল উপলব্ধি। পুরাণের ঘটনার সাথে বাস্তবজীবনের দুর্নীতি, লোভ, প্রেম, ভয় ও আত্মপরিচয়ের সংকটের অসাধারণ বুনোটে নির্মিত হয় তাঁর উপন্যাস। গত বছরের ১৫ মে কার্লোস ফুয়েন্তেস মৃত্যুবরণ করেন। নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত গুয়ের্নিকা পত্রিকার জন্য সাক্ষাত্কারটি নিয়েছিলেন লিলি ক্যান্সো। এতে সাহিত্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও তিনি কথা বলেছেন। ইত্তেফাক সাময়িকীর জন্য এর ভাষান্তর করেছেন শমীক ঘোষ
প্রশ্ন:আপনি একজন প্রভাবশালী লেখক। আপনি সবসময় সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে ভীষণ সোচ্চার। অথচ আমেরিকায় কোনো বড় কবি, সাহিত্যিক বা শিল্পী কখনো সরকারি পদ নেবেন, এটা ভাবাই কঠিন। আমেরিকা ও লাতিন আমেরিকায় শিল্পী, লেখক ও রাজনীতির সম্পর্ক কীভাবে আলাদা বলে আপনার মনে হয়?
উত্তর: আমেরিকার সবকিছুই লাতিন আমেরিকার চেয়ে ভালো হবে। সরকারের কথা ধরলে বলতে হয়, তা খুবই নিম্নমানের, আপনি যদি মনে রাখেন, এই দেশ কত অসাধারণ বুদ্ধিজীবীর জন্ম দিয়েছে, কত অসাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় আছে এই দেশে, কিন্তু সরকারি পদে যাঁরা আসেন, তাঁরা খুবই মধ্য মেধার। লাতিন আমেরিকার পরিস্থিতি প্রথম থেকেই আলাদা, কারণ এখানে লেখকেরা তাদের হয়ে কথা বলেন, যাদের নিজস্ব কোনো স্বর নেই। লাতিন আমেরিকার সাক্ষরতার হার, দারিদ্র্য, বেকারত্ব আমাদের গোটা ইতিহাসজুড়েই থেকেই এত বেশি যে, এখানে যদি লেখকেরা এদের কথা না বলতেন, কেউই বলতেন না। আমাদের সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। এখন লাতিন আমেরিকার বেশির ভাগ জায়গাতেই আমাদের গণতান্ত্রিক সরকার আছে, অতএব লেখকের স্থানটাও বদলেছে। আজ পরিস্থিতি আর সে রকম নয়, যেমন নেরুদা বলতেন যে, একজন লাতিন আমেরিকান লেখক সবসময়ই তাঁর পিঠে একটা বিরাট অংশের মানুষের ভার বয়ে নিয়ে চলেন। এখন আমাদের নাগরিকেরা আছেন, আমাদের প্রকাশের জন্য গণমাধ্যম আছে, রাজনৈতিক দল, কংগ্রেস, ইউনিয়ন আছে। তাই লেখকদের স্থান বদলেছে। আমরা নিজেদেরকে সবার মুখপাত্র নয় বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী নাগরিক হিসেবেই বিবেচনা করি।
আপনি সরকারি পদে বসার কথা বলছিলেন, কিছু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সাম্মানিক পদ, যা একসময় লেখকদের জন্য ছিল। মেক্সিকোর বেশির ভাগ লেখকই রাষ্ট্রদূত বা সচিব পদে আসীন হয়েছেন। কিন্তু আজ তা আর হয় না। এখন একজন লেখক লিখে জীবনযাপন করতে পারেন। তাঁর নিজের একদল শ্রোতা আছে; অনেক প্রকাশনাসংস্থা, সংবাদপত্র আছে। এতএব আজকের পরিস্থিতি আর তত খারাপ নয়। যখন লেখকদের অর্থোপার্জনের, জীবিকা নির্বাহের কোনো মাধ্যম ছিল না, তখন তাঁকে সরকারি চাকরি যেমন রাষ্ট্রদূত বা ক্যাবিনেট মন্ত্রী ইত্যাদি হতে হতো। এখন পরিস্থিতি এমনভাবে বদলাচ্ছে যে নাগরিক সমাজের গুরুত্ব বাড়ছে। নতুন এক গণতান্ত্রিক সমাজে লেখকও এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে, যা অতীতের চেয়ে কম প্রভাবশালী নয়।
প্রশ্ন:আপনি কি নিজেকে একজন নির্বাসিত লেখক বলে মনে করেন?
উত্তর:আমি নিজেকে কখনোই একজন নির্বাসিত লেখক মনে করি না, কারণ আমি বড় হয়েছি স্বদেশের বাইরে, যেহেতু আমার বাবা ছিলেন একজন কূটনীতিক। অতএব আমি বড় হয়েছি ব্রাজিল, চিলি, আর্জেন্টিনা, আমেরিকা। আমার পড়াশোনা সুইজারল্যান্ডে, তাই সব সময়েই আমার নিজের দেশ সম্পর্কে একটা অবস্থানগত ধারণা ছিল। এ জন্য আমি জন্য কৃতজ্ঞ।
আমাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হুয়ান রুলফো, যিনি ‘পেদ্রো পারামো’র রচয়িতা, কোনোদিন হালিসকোর বাইরে যাননি। মেক্সিকোর প্রদেশগুলোর বাইরে যাননি। তিনি টায়ার বিক্রি করতেন এবং গাড়ি চালিয়ে ঘুরে ঘুরে গল্প শুনতেন। তিনি হলেন সেই ধারার লেখকের মহান উদাহরণ, যে লেখক দেশে বড় হয়েছেন, সেই দেশ তাঁর শেকড়। তিনি এমন লেখক, যিনি তাঁর শোনা কথাকেই মহান শিল্পে পরিণত করেছেন। আমার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ আমার ছোট থেকেই মেক্সিকো সম্পর্কে একটা অবস্থানগত ধারণা ছিল। আমি একটা দশ বছর বয়সী কিশোর, যখন প্রেসিডেন্ট কারদেনাস বিদেশি তেল কোম্পানিগুলোর মালিকানা নিয়ে নিচ্ছিলেন। সেই সময় আমেরিকাজুড়ে মেক্সিকো-বিরোধিতার ঢেউ। বড় বড় হেড লাইন খবরের কাগজে, ‘মেক্সিকানরা আমাদের তেল চুরি করছে।’ সেইসময় আমি স্কুলের (আমি তখন গ্রেড স্কুলে) বন্ধুদের হারিয়েছি, আমাকে দেখা হতো সন্দেহের সাথে। এবং আমি একজন কূটনীতিকের সন্তান, আমি যখন মেক্সিকোর পক্ষের যুক্তিগুলো জানলাম, তখন আমি মেক্সিকোর কারণগুলো সমর্থন করতে লাগলাম। আমি আমার পনেরো বছর বয়স অবধি একধরনের নির্বাসনের মধ্যে থেকেছি—সব সময় মেক্সিকোর বাইরে। অথচ প্রতি মুহূর্তে খুব সচেতন ছিলাম যে আমি একজন মেক্সিকান। কিন্তু যে লোকটা কোনোদিন মেক্সিকোর বাইরে যায়নি, তার থেকে আমার সচেতনতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অতএব এটা দুভাবেই কাজ করেছে।
কয়েক মুহূর্তের জন্য আমি হয়তো আর্জেন্টাইন বা চিলিয়ান হতে পারতাম। আমি আমার বন্ধু এবং সান্তিয়াগো ও বুয়েনস অ্যায়ারসের স্কুলের টানে বাঁধা পড়েছিলাম। কিন্তু না, মেক্সিকো আমাকে জিতে নিয়েছিল। কারণ মেক্সিকো চিরকাল আমার জন্য রহস্যাবৃত এবং ভবিষ্যতেও তেমন একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়েই থাকবে। এই দেশটা কিসের জন্য? আমি কী করে সেটা বুঝব? আপনি জানেন, যখন গার্সিয়া মার্কেজ মেক্সিকোর নাটকীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারেননি, তখন তিনি জাতীয় নৃ-তত্ত্ব জাদুঘরে গিয়ে কোতলিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। কোতলিক অ্যাজটেকদের মাতৃদেবী—সাপ পরিবেষ্টিত ব্লকে নির্মিত দৈত্যাকার মুণ্ডহীন, সুবিশাল এক মূর্তি—যিনি বলছেন, ‘আমি একজন দেবী, কোনো ব্যক্তি নই। আমার মধ্যে কোনো ব্যক্তিত্ব খোঁজার চেষ্টা কোরো না। আমি ভেনাস নই, আমি কোত?লিক; সাপের দেবী।’ তিনি সেখানে পাঁচ মিনিট দাঁড়ানোর পর বলেন, ‘এবার আমি মেক্সিকোকে বুঝতে পারছি।’ পরে সেখান থেকে চলে আসেন।
এটা একটা জটিল, রহস্যাবৃত দেশ। আমি এই দেশকে কোনোদিন পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারব না। তাই আমি এই দেশকে নিয়ে লিখি, যাতে একে বুঝে উঠতে পারি।
প্রশ্ন:আপনি একজন নির্বাসিত লেখক সম্পর্কে অনেক কথা বলেছেন, যিনি আপনার খুব ভালো বন্ধু, স্প্যানিশ লেখক হুয়ান গোয়েতিসলো—
উত্তর:হুয়ান গোয়েতিসলো সম্পর্কে অনেক মতামত দেওয়ার আছে। খোলাখুলি বললে, উনি হলেন স্পেনের সব থেকে বড় জীবিত লেখক। কিন্তু আমি সব সময়ই গোয়েতিসলোকে শুধু স্প্যানিশ লেখক বা স্পেনের লেখক বলতে অস্বীকার করেছি। আমি তাঁকে হিস্প্যানো-অ্যামেরিকান সাহিত্যের অংশ বলে মনে করি। একটা বড় সময় ধরে গোয়েতিসলো স্পেনে প্রকাশিত হননি। ফ্রাঙ্কোর সেন্সরশিপ তাঁকে প্রকাশিত হতে দেয়নি, তাই উনি মেক্সিকো থেকে প্রকাশিত হয়েছেন, বুয়েনস অ্যায়ারস থেকে প্রকাশিত হয়েছেন। উনি আসলে স্প্যানিশ ভাষার একতার আদর্শ উদাহরণ—এই বাস্তবতার যে, আমরা পাঁচশ মিলিয়ান মানুষ আছি যারা স্প্যানিশে ভাবি, স্প্যানিশে কথা বলি।
আমি গোয়েতিসলোকে একজন স্প্যানিশ অ্যামেরিকান লেখক বলে মনে করি; গার্সিয়া মার্কেজ কিংবা কোয়ের্তেজার কিংবা আমি নিজে যেমন। এবং নিশ্চয়ই যেকোনো পরিমাপে একজন বিশ্বমানের লেখক, একজন সর্বোচ্চ গুণসম্পন্ন সর্বজনীন লেখক। একজন মানুষ যিনি অসাধারণ সব পরীক্ষা করতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন, যিনি কখনোই নিজের কাজ নিয়ে আত্মতুষ্ট নন, যা একজন বড় লেখকের চিহ্ন। একবার যদি আপনি আপনার নিজের কাজ নিয়ে আত্মতুষ্ট হয়ে পড়েন, নিজের লেখা নিয়ে স্বস্তি পেতে শুরু করেন, আমার মনে হয় আপনার কোনো সমস্যা আছে। আপনাকে হতে হবে খুব রাগী, খুব বিরক্ত, সবসময় নতুন কিছু খুঁজতে হবে। আমার মনে হয়ে উনি হলেন মূল নমুনা; আমার থেকেও বেশি, আমাদের যেকোনো কারওর থেকে বেশি। গোয়েতিসলো স্প্যানিশ ভাষার একজন খুব নিরীক্ষামূলক, সাহসী, ঝুঁকি নেওয়া লেখক।
প্রশ্ন:গোয়েতিসলো একজন স্প্যানিশ লেখক যিনি স্পেন ত্যাগ করে আরব সংস্কৃতিকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি সপ্তম শতাব্দীতে স্পেনে আরব অধিগ্রহণ নিয়ে প্রচুর লেখেন। তাঁর অবস্থান সম্পর্কে আপনার নিজের কী মতামত?
উত্তর:হুয়ান গোয়েতিসলো হলেন লাতিন আমেরিকান সাহিত্য এবং আরব সাহিত্যের প্রকৃত সমন্বয়ক। আরবি সাহিত্যের জগতে তিনি হচ্ছেন স্প্যানিশ ভাষা সংস্কৃতি এবং আরবি ভাষার সংস্কৃতির যোগাযোগ মাধ্যম। স্প্যানিশ ভাষার চল্লিশ শতাংশ শব্দের উত্স হলো আরবি। আরবরা সপ্তম শতাব্দী কাটিয়েছে স্প্যানিশ উপদ্বীপে। তারা আমাদের পানি এনে দিয়েছে, স্থাপত্যশিল্প এনে দিয়েছে, সঙ্গীত এনে দিয়েছে... পরিচ্ছন্নতা এনে দিয়েছে, কারণ তার আগে স্পেনীয়রা স্নান করত না, কিন্তু আরবরা করত। আরববিশ্বে পানি ছিল, কিন্তু স্পেনে ছিল না। তাই তাদের কাছে আমাদের অনেক ঋণ। আর গোয়েতিসলো হলেন লাতিন আমেরিকা ও আরববিশ্বের বিস্মৃতপ্রায় সংস্কৃতির ‘সেতু’ বা যোগাযোগের মাধ্যম।
প্রশ্ন:আপনি কি গোয়েতিসলোর সাথে নিয়মিত সময় কাটান?
উত্তর:হ্যাঁ, আমার স্ত্রী সিলভিয়া আর আমি তাঁর সাথে মারাকেশে এক সপ্তাহ কাটিয়েছি, শহরে ঘুরে ঘুরে উনি শহরটাকে এমনভাবে জানেন, যদি গোয়েতিসলো আপনাকে পথ না দেখান, আপনি চিরকালের জন্য পথ হারাবেন—আপনার কথাও কেউ শুনতে পাবে না আর। আমরা তাঁকে মেক্সিকোয় অভ্যর্থনা জানাই, আমরা স্পেন, প্যারিস, মারাকেশে দেখা করি। এটা আমাদের শক্তিশালী বন্ধুত্ব; এ জন্য আমি খুবই কৃতজ্ঞ।
প্রশ্ন:আমেরিকাতে অভিবাসন নিয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
উত্তর:যা হচ্ছে তা হলো শাখের করাত। আমেরিকার একটা দায় আছে—সেখানে শ্রমিক দরকার। আমি বলতে চাই, আমেরিকানরা মেক্সিকান শ্রমিক ছাড়া খেতে পাবে না, প্রাতরাশ করতে পারবে না। ওরাই কমলালেবু পাড়ে, টমেটো তোলে, ওরা সেই সব কাজ করে যা সবাই করতে চায় না—কিন্তু কেউ কেউ করতে চায়। আমি আশা রাখি, একদিন মেক্সিকো নিজেই তার সমস্ত শ্রমিকদের কাজ দিতে পারবে, তখন আমেরিকাকে অন্য কোথাও শ্রমিক খুঁজতে হবে। পাপুয়া নিউগিনিতে, নর্থ পোলে, আমি জানি না কোথায়—কিন্তু এই লোকগুলোকে ওদের দরকার সেই সব কাজে, যা একটা পোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল সমাজের কেউ করবে না। আমেরিকা এখনো ভাবে যে এটা ঊনবিংশ শতকের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সমাজ। কিন্তু তা তো নয়, নতুন বাস্তবতার সথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। আবার মেক্সিকোরও একটা বড় দায় আছে—তার নিজের লোকদের কাজ দিতে হবে। যত দিন আমাদের পঞ্চাশ শতাংশ শ্রমিককে কাজ দেওয়ার অপারগতা থেকে যাবে, তত দিন আমেরিকায় অভিবাসীদের পাওয়া যাবে।
যখন আমাদের এর চেয়ে ভালো, আরও সামাজিক, আরও দায়বদ্ধ, কম আত্মকেন্দ্রিক, দুর্নীতিমুক্ত সিস্টেম হবে, আমরা মেক্সিকোর লাখ লাখ মানুষকে কাজ দিতে পারব—যাঁরা আমাদের সড়ক বানাবেন, বাঁধ, নালা, স্কুল—সেই সব যা মানবসম্পদ থাকা সত্ত্বেও মেক্সিকোতে গড়ে তোলা হয়নি। আমি দেখতে পাই অসংখ্য মেক্সিকান শ্রমিক ট্রেনে চড়ে উত্তরে যাচ্ছেন। আমি বলি কেন তাঁরা ওয়াহ?হাক্কা, তাবাস্কো, চিয়াপাস, ইয়ুকাতানের মতো জরুরি জায়গাগুলোতে যান না? কেন? এখানে খুব খারাপ কিছু চলছে, সীমান্তের দু-ধারেই। কিন্তু একজন শ্রমিক শ্রমিকই, অপরাধী নন। তাই আমি কেনেডি-ম্যাককেইনের মতো প্রস্তাবগুলো সমর্থন করি, যা সেই সব কাজ করার কথা বলে যাতে এই সত্যটা মানা যায় যে ইউনাইটেড স্টেটসে বিদেশি শ্রমিকের দরকার আছে, সেইগুলোকে। আমি শুধু মেক্সিকান শ্রমিকদের কথা বলছি না; বলছি সমস্ত বিদেশি শ্রমিকদের কথা যারা সেই সব কাজ করবে যা আর কেউ করতে চায় না। একটা কোনো আইনি সমাধান চাই, এমন একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান, যা শ্রমিককে অপরাধী করে না।
প্রশ্ন:আমরা কি এমন একটা পরিস্থিতির [আমেরিকায়] মুখোমুখি হচ্ছি, যা লাতিন আমেরিকার মানবগোষ্ঠীর মধ্যে একটা ভয়ের বাতাবরণ ছড়িয়ে দিতে পারে?
উত্তর:আমি যা দেখতে পাচ্ছি তা হলো ভয়ের উলটো—আমি দেখছি প্রবল সাহস। যখন আমি দেখি লাখ লাখ মানুষ [প্রতিবাদী] লস অ্যাঞ্জেলস, সিয়াটল, ওমাহাসহ অন্য সব জায়গার রাস্তায়, তখন প্রবল সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই, ভয় নয়। আজ এক জায়গায় পড়লাম, তাঁদের কেউ কেউ এসব প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেওয়ার জন্য শাস্তি পাচ্ছেন; চাকরি থেকে বরখাস্তও করা হয়েছে। তাঁরা ফিরে আসবেন অথবা অন্য কেউ আসবেন, কারণ কারও না কারও কাজগুলো করতে হবে। এটাই স্বাভাবিক। আমার মনে হয় কোনো ভয় নেই। বরং এটার তুলনা টানা যায় সিজার শ্যাভেজের আন্দোলনের সঙ্গে, যখন শ্রমিকেরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল রাস্তায়। এখন অভিবাসীরাও বেরিয়ে আসছে, সব থেকে খারাপ এটাই হতে পারে যে, সেই মহাপ্রলয়ের দিন যখন মেক্সিকানদের ছাড়া এই দেশটা থেমে যাবে। তখন দাবি উঠবে মেক্সিকান শ্রমিকদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরিয়ে আনবার। কারণ মেক্সিকান শ্রমিক ছাড়া এই দেশটা নিজেকে খাওয়াতে পারবে না, নিজেকে শিক্ষিত করতে পারবে না, যাতায়াত করতে পারবে না।
প্রশ্ন:গণতন্ত্র প্রসঙ্গে, আমি আমাদের এই কথোপকথন দুনিয়ার অন্য এক প্রান্তে নিয়ে যেতে চাইব। যখন ইরাকে গণবিধ্বংসী কোনো অস্ত্র পাওয়া গেল না, উত্তর আমেরিকার প্রশাসন তাদের অবস্থান বদলে বলল, তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। অন্য দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই আমেরিকান অঙ্গীকারের প্রসঙ্গে আপনি কী বলতে চান? আপনার কি মনে হয়—এটা ম্ভব?
উত্তর:আমি একজন মেক্সিকান। আমেরিকা পঁচাত্তর বছর ধরে মেক্সিকোয় পিআরআইয়ের একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা মেনে নিল—একেবারে চোখ বুঁজে, মেক্সিকোয় একবারও গণতন্ত্রের দাবি না করে। মেক্সিকোয় গণতন্ত্র এসেছে, কারণ মেক্সিকানরা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। আমাদের ইতিহাস, সম্ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাযুজ্যসম্পন্ন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। গণতন্ত্র কোকা-কোলা নয় যে আমদানি করা যাবে। গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে লালন করতে হবে, সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে, প্রতিটি দেশের অবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে। আরবের গণতন্ত্র হবে আরবের বিশ্বাস, আচার, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মেনে। আপনি সেটা চাপিয়ে দিতে পারেন না, গণতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কনডোলিত্সা রাইস কি মিসরের হোসনি মুবারকের ওপর গণতন্ত্র চাপিয়ে দেবেন? না কি মিসরের সাধারণ মানুষ মিসরের জন্য একটা গণতান্ত্রিক সমাধান খুঁজে নেবে? আমেরিকা অন্য দেশে গণতন্ত্র চাপিয়ে দেবে—এই ভাবনাটাই হাস্যকর। সমোসা, ত্রুজিলো, বাতিস্তা, ক্যাস্তিলো আর্মাস—এঁদের সাথে বাস করেছে আমেরিকা, লাতিন অ্যামেরিকার কুখ্যাত স্বৈরতন্ত্রীরা ছিল আমেরিকার পুতুল—আমরা কোন গণতন্ত্রের কথা বলছি? গণতন্ত্র আমাদের ভেতর থেকে আসবে, ওদের থেকে নয়।
প্রশ্ন:বেড়ানো এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে ঘুরে ছাত্রছাত্রীদের সাথে কথা বলা কি আপনার খুব পছন্দের?
উত্তর:শুনুন, আমি একজন লেখক। এবং সিলভিয়া যেমন জানে আমার সারা দিন কাটে একটা নোটবুকের সামনে একটা কলম হাতে নিয়ে লিখতে লিখতে এবং লিখতে লিখতে আর পড়তে পড়তে এবং পড়তে পড়তে...। সেটাই আমার জীবন। কখনো কখনো আমার একটা অবসরের দরকার পড়ে। বক্তব্য দেওয়া, ঘুরে বেড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া হলো লেখার নিঃসঙ্গতা থেকে বেরিয়ে আসার একটা উপায়, যা আমার ভালো লাগে এবং আমি ভালোবাসি। নতুন ও তরুণদের সম্পর্কে জানতে কখনো কখনো আমাকে ওই নিয়ম ভাঙতে হয়। ফল পাই আর না পাই—এটা মন্দ নয়। বলা যায়, এটাই আমার বসন্তের ছুটি।
প্রশ্ন:আপনার প্রিয় বই কোনগুলো?
উত্তর:ওহ, আমি এত পড়ি যে আপনাকে বললে আপনি হাঁপিয়ে উঠবেন।
প্রশ্ন:আপনার প্রকৃত বাড়ি কোনটা?
উত্তর:লন্ডনে, বছরের কিছু সময় মেক্সিকোতে, বছরের কিছু সময় ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় ঘুরে ঘুরে কাটাই। বৈচিত্র্যময়জীবন। যেমন সিলভিয়া জানে, আমাদের সব সময় ব্যাগ গোছানোর মধ্যেই থাকতে হয়।