ফরিদা বারী বীথি
শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীরের ক্যানভাসে
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:১৮
বরেণ্য শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর এঁকেছিলেন ফরিদা বারী বীথির ছবি। সেই ১৯৫৭ সালের কথা। শিল্পী জাহাঙ্গীর তখন যুবক, থাকেন বড় ভাই সিকান্দার আবু জাফরের বাসা ‘তারাবাগ’। প্রতিবেশী সবাই গণ্যমান্য মানুষ; সুফিয়া কামাল থেকে শেরে বাংলা ফজলুল হক। তারাবাগ তখনকার ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত আবাসিক এলাকা। স্বামী শহীদসহ তারাবাগেই থাকতে এসেছিলন তখনকার পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে ও পোর্ট ট্রাস্টের প্রথম চেয়ারম্যান এমএ বারী আর ফিরোজা বারীর একমাত্র কন্যা ফরিদা বারী বীথি।
চলনে বলনে এত স্বাবলীল যে চোখে পড়ার মতো। দুই-দুটি সরকারি সংস্থার প্রধান এমএ বারী এবং রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ছাত্রী ফিরোজা বারীর একমাত্র কন্যা এত সাদামাটা কেন! অবাক হতো সবাই। সেই সময় সবে পাকিস্তান হয়েছে, মেয়েদের পর্দানশিন থাকাই যেন নামী পরিবারগুলোর প্রধান কাজ। সেখানে কালো ব্লাউজ আর সাদা সুতার শাড়ি চিকন কালো পাড়। টানটান করে চুলে বেণি কিংবা টাইট খোঁপা। সারাক্ষণ ঠোঁটে মার্জিত সুরেলা কণ্ঠে সারাবেলা রবীন্দ্রনাথের গান। তেল রং দিয়ে আঁকা ছবি নিয়েও খুব উত্সাহ।
আসা-যাওয়ার পথে বীথির শিল্পীর সঙ্গে আলাপ। তেল রং তারপিন আর লিন-সিড তেলের মিলেমিশে ব্রাশের ডগায় করে পৌঁছে যাচ্ছে সাদা ক্যানভাসে। তৈরি হয়ে উঠছে অপূর্ব সব ছবি। আসা-যাওয়ার পথে দেখা হলে পেইন্টিং বিষয়ে বীথি আগ্রহের সঙ্গে অনেক কিছু জানতে চাইতেন। মাঝেমধ্যে ছবি আঁকা দেখতে আসতেন বীথি সিকান্দার আবু জাফরের বাসায় শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীরের স্টুডিওতে। এক দুপুরে বাসায় যাওয়ার পথে এসে থামলেন স্টুডিওতে। দেখলেন ইজেলে সাদা ক্যানভাসের সামনে শিল্পী দাঁড়িয়ে আছেন, রঙের টিউবগুলোর মুখ খোলা। সামনের চেয়ারে বসতে বললেন তিনি বীথিকে। ভেতরে খবর দিলেন চা পাঠাতে।
কী ছবিআঁকবেন আজ?—চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলেন বীথি।
আপনার হাতে ঘণ্টা দুয়েক সময় হবে? এক সিটিংয়ে শেষ করতে পারব, আশা করি!
সেই সময় যেকোনো সম্ভ্রান্ত ঘরের নারী চমকে উঠতেন ছবি আঁকার প্রস্তাবে। বলতেন, ভেবে পরে জানাব অথবা দেখি স্বামী অনুমতি দেন কি না!
ফরিদা বারী বীথি সে রকম মেরুদণ্ডহীন মানুষ নন। স্বামী তাঁর ব্যক্তীগত জীবনে সবার চেয়ে হয়তো প্রিয় মানুষ; কিন্তু তাঁর কর্তা নন।
বীথি খুশী হয়ে বললেন—ও মা! এ তো আমার সৌভাগ্য, একজন শিল্পী আমার ছবি আঁকবেন।
দু-ঘণ্টার চেয়েও দশ মিনিট কম লাগল,আঁকা শেষ হলো।
আজ সৈয়দ জাহাঙ্গীর দেশের বরেণ্য শিল্পী। ফরিদা বারী বীথি আমাদের মাঝে নেই। ছবি কিন্তু সংগৃহীত আছে জাতীয় চিত্রশালা, শিল্পকলা একাডেমীতে।
১৮ এপ্রিল ফরিদা বারী বীথির জন্মদিন।
আমরা এবার কিছুটা বিস্তারিত জানতে চেষ্টা করি ফরিদা বারী বীথি সম্পর্কে, তিনি কতটুকু করে গেছেন আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে।
দেশ ভাগ হওয়ার পর, নব্য পূর্ব পাকিস্তানে এক বিপরীত স্রোতে রবীন্দ্র সংগীতকে প্রাণপণ চেষ্টা হচ্ছিল বধের, ঠিক তখন যাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের গান ধরে রাখার, তাঁদের প্রথম সারিতে ফরিদা বারী বীথি ছিলেন।
রবীন্দ্র সংগীতেই রয়েছে বাঙালির সকল অনুভূতিকে ছুঁয়ে যাওয়ার ক্ষমতা, এই বিশ্বাসই ছিল তাঁর আজীবন। ষাটের দশকের শুরু থেকে রবীন্দ্র সংগীতকে প্রাণে ধারণ করে এগিয়েছেন তিনি। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান আসত অন্তর-প্রাণ থেকে এক অন্যরূপে। যাঁরা তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন, কণ্ঠ আর গায়কীতে তাঁরা আজ স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। যেমন শিল্পী কলিম শারাফী, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, ড. আনিসুজ্জামান, জামিল চৌধুরী, ড. অনুপম সেন, সুরকার আজাদ রহমান,শিল্পী হাশেম খানসহ আরও অনেকে। হাশেম খান তাঁর বইয়ে লিখেছেন ফরিদা বারী বীথির কথা।
তিনি লিখেছেন—কী মমত্ব বোধ থেকে বীথি রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে ঢাকার বাইরে ছুটতেন শুধুমাত্র ছোট শহর আর গ্রামে রবীন্দ্রনাথকে আরও বেশি ছড়িয়ে দিতে। বিস্তারিত করতে রবীন্দ্র বারতা।
হয়তো তাঁর ছোটবেলা আর বালিকাবেলা কেটেছে শান্তিনিকতনে। হয়তো মা ফিরোজা বারীর শিক্ষাজীবন কেটেছে রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা ছাত্রী হিসেবে; সে কারণে। বাবা মালিক আবদুল বারী রবীন্দ্রনাথের অনুসারী ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য ছিলেন। দেশভাগের পর তাঁকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কলকাতা ছেড়ে চলে আসতে হয় চট্টগ্রামে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম পোর্ট ট্রাস্ট তাঁর হাতেই গড়া, তিনি পোর্ট এবং রেলের একসাথে চেয়ারম্যান ছিলেন। শত কর্মব্যস্ততায়ও তিনি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এগিয়েছেন। হাতেগোনা দু-চারজন পর্দানশিন ছাত্রীর মধ্যে তাঁর মেয়ে ফরিদা বারী বীথি ছিলেন ব্যতিক্রম। পরতেন সাধারণ শাড়ি, কপালে থাকত কালো টিপ, রবীন্দ্র সংগীত করতেন চট্টগ্রাম কলেজসহ অন্যান্য মঞ্চে। এতই সাদামাটা, সহজ-সরল থাকতেন যে, কেউ বুঝে উঠে পারত না তিনি পূর্ব পাকিস্তানের পোর্ট ট্রাস্ট ও রেলের চেয়ারম্যানের কন্যা। ১৯৬১ সালে আবদুল বারী তাঁর কর্মস্থলের ডেপুটি আরএন বাগচীকে নিয়ে একজন সরকারি বড় কর্মকর্তা হয়ে নিজের সাহস ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আয়োজন করেন চট্টগ্রাম সেন্ট প্লাসিড স্কুলের বিশাল হলে আট দিনব্যাপী ‘রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উত্সব’। সাত দিন হবে ঠিক করা হয়েছিল; আরও এক দিন বাড়ল দর্শক-শ্রোতার অনুরোধে। শেষ দিন ঝড়ের ১০ নম্বর সংকেত উপেক্ষা করে লোক এসেছিল, চট্টগ্রাম পাথারঘাটায় সেন্ট প্লাসিড স্কুল মিলায়তনে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। অথচ তখন ঢাকায় মাত্র দু-দিনের রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠান ঝড়ের আভাসের জন্য বাতিল করা হয়। আজ ১৫০তম রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী লগ্নে এখনো এমএ বারী ও আরএন বাগচীর আট দিনব্যাপী সেই রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উত্সব ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এই ঐতিহাসিক রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটিতে তখনকার গণ্যমান্য অনেকে ছিলেন। তার মধ্যে বেঁচে আছেন মাত্র তিনজন—চট্টগ্রাম আর্ট প্রেসের মালিক সৈয়দ মোহাম্মদ শফি, গিটারিস্ট মানবেন্দ্র বড়ুয়া ও আনসার আলী কোরেশী।
এমনতরো বাবা-মায়ের মেয়ে ফরিদা বারী বীথি কীভাবে চুপ থাকতে পারেন নিজের প্রাণের ভাষা বাংলার ওপর উর্দুর আক্রমণ এলে। ফরিদা বারী বীথি তখন চট্টগ্রাম কলেজের পর শান্তিনিকেতন থেকে অনার্স শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন। নারী ভাষাসৈনিক হিসেবে নিজের দায়িত্ব মনে করে নিজের খরচে পোস্টার-ফেস্টুন তৈরি করে ছাত্রী সহযোদ্ধাদের নিয়ে রাজপথে মিছিল বের করেন এবং রাস্তা থেকে পুলিশের হাতে আটক হয়ে জেলে যান। একই কারণে জেলে তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন আজকের মন্ত্রী, নেতা-নেত্রীরা, যাঁরা পুলিশের খাতায় মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন। তখন এককমাত্র ফরিদা বারী গোঁ ধরে বসে ছিলেন—মরে গেলেও পুলিশি খাতায় সাইন করে মুক্তি চাই না।
একলা জেদি এই নারীকর্মীকে পুলিশ শেষপর্যন্ত আটকে রাখতে পারেনি। পুলিশি খাতায় সাইন ছাড়াই সসম্মানে মুক্তি দিয়েছিল।
ফরিদা বারী বীথি ও জহরত আরার নেতৃত্বে মিছিলের ছবিটি তুলেছিলেন ড. রফিকুল ইসলাম নিজের ক্যামেরায়। যা যুগের পর যুগ একুশে ফেব্রুয়ারি বিশেষ সংখ্যায় ছাপা হয়ে আসছে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিকসহ অনেক জাগায়; অবশ্য শিরোনাহীন ভাবে।
এমনকি ২০১১ সালের বেঙ্গল ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত পত্রিকা ‘বেঙ্গল বারতা’ ছবিটি দিয়ে বিরাট প্রচ্ছদ করেছে শিরোনামহীন ভাবে। অবাক লাগে, যাঁদের সাহসিকতায় দেশ আজ অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে নতুন প্রজন্মের জন্য সুবাতাস এনে দিয়েছে, তাঁদের নামটি পর্যন্ত খুঁজে নিতে আমরা ক্লান্তি বোধ করি। আজ রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনের আগে একবার স্মরণ করে না কেউ যে, পঞ্চাশ বছর আগে ধর্মঝড়ে চরের মতো ভেসে ওঠা এক দেশের অন্ধকার যুগে অন্তরে রবীন্দ্রশক্তির জোরেই আট দিনব্যাপী রবীন্দ্রনাথের শত জন্মবার্ষিকী উত্সব করে দেখিয়েছিলন এমএ বারী, আরএন বাগচী আর সহযোগী ছিলেন রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী ফরিদা বারী বীথি, একমাত্র রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া যিনি জীবনে অন্য কিছু গাননি। ছায়ানটের প্রথম দিকে রবীন্দ্র সংগীত শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর মেধাবী ছাত্রীদের মধ্যে ছিলেন সেলিনা মালেক, ইফফাত আরা দেওয়ান, নাসরীন বাহার প্রমুখরা।
তাঁর সময়ে অন্যান্য স্বনামধন্য রবীন্দ্র সংগীতশিল্পীরা ছিলেন কলিম শরাফী, সন্জীদা খাতুন, আফসারী খানম, মালেকা আজিম, আতিকুল ইসলাম, বিলকিস নাসিরুদ্দীন প্রমুখ। কেউ চাইলেও মুছে ফেলতে পারে না রবীন্দ্রনাথকে—তা আজ প্রমাণিত। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে এক বিশাল রবীন্দ্র-জগত তৈরি হয়েছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অতিকায় হয়ে আকাশ ছুঁইছে।