বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম :পাঠপ্রতিক্রিয়া
বাংলা বানান বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনা
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:২০
বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম-২০১২ প্রণয়ন ও প্রকাশ করেছে। এটি একটি চমত্কার কাজ হয়েছে। দেশে চারিদিকে বানানের নৈরাজ্য চলছে। যিনি যেভাবে পারছেন, লিখছেন। আশা করা যায়, বাংলা একাডেমীর প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম এ নৈরাজ্যকর অবস্থা অবদমন করতে সক্ষম হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরকারের সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তরকে প্রমিত বানানের নিয়ম অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এতে বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানানের নিয়ম বাস্তবায়ন একধাপ এগিয়ে গেল।
বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানানের নিয়ম-২০১২-তে বেশকিছু খুঁত থেকে গেছে। এ খুঁত দূর করে সংশোধিত সংস্করণ বের হওয়া প্রয়োজন। প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম-২০১২-এর ১.১ অনুচ্ছেদে কিছু সংস্কার ছাড়া তত্সম বা সংস্কৃত বানান যথাপূর্ব রাখা হয়েছে। এটি একটি চমত্কার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এখানে কোনো উদাহরণ দেওয়া হয়নি। উদাহরণ স্বরূপ ৫০-৬০টি শব্দ উল্লেখ করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতো। যেমন: অংশুমালি (অংশু + মালা + ইনি = অংশুমালিন > অংশুমালি), অগ্রগামি (অগ্র + গম্ -ণিনি = অগ্রগামিন > অগ্রগামি), আগামি (আ + গম্- ণিনি = আগামিন > আগামি)। অনুরূপভাবে অঙ্গুলি, অঞ্জলি, অটবি, অধিকারি, অধিবাসি, অপরাধি, অনুগামি, অনুগ্রাহি, অনুচারি, অনুযায়ি, অনুযোগি, অনুরাগি, অন্তর্বতি, অন্তর্যামি, অভিঘাতি, অভিলাষি, অভিসারি, অবিমৃষ্যকারি, অহংকারি, আততায়ি, উত্তরাধিকারি, ঋণি, একাকি, কর্মি, সহকারি, সহচরি, স্বাক্ষরকারি, ক্ষয়ি, গুণি, জ্ঞানি, গৃহি, গ্রন্থি, গ্রাহি, চক্রবর্তি, জননি, জয়ি, জলহস্তি, দশমি, দিঘি, নন্দি, নিরস, নির্বাহি, প্রাণি, মঞ্জরি, মণ্ডলি, সদালাপি, মালি, মুখি, সুখি, সাথি, মেধাবি, যশস্বি, যামি, যোগি, বাগ্মি, বাদি, বিনাশি, বিরহি, বিরাগি, বিলাসি, বিবেকি, বিশ্বাসি, বিষয়ি, বিহারি, বৈরাগি, ব্যাপারি, সংযমি, সংসারি, স্থায়ি, সঞ্চয়ি, সঞ্চারি, সধর্মি, সমবায়ি, সম্বন্ধি, সাক্ষি, সারথি, দূরদর্শি, স্বামি, স্বেচ্ছাচারি, হঠকারি, হূয়দগ্রাহি প্রভৃতি শব্দ উল্লেখ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতো। এ ক্ষেত্রে স্মর্তব্য, তত্সম শব্দ সম্পূর্ণরূপে সংস্কৃত শব্দ নয়। তত্সম অর্থ তার সম; অর্থাত্ সংস্কৃতের সমান। কিন্তু সংস্কৃত নয়। যেমন মাতৃসম; কিন্তু মা নন—মাতৃস্বসা। পিতৃ সম; কিন্তু পিতা নন—পিতৃব্য। সংস্কৃত শব্দ যামিনিম, তত্সমে হয় যামিনি, সংস্কৃত ভাষার শব্দ আগামিন তত্সমে হয় আগামি। আমরা অধিকাংশ সংস্কৃত শব্দের সর্বশেষ ঙ, ণ, ন, য, ম, ং, ঃ ফেলে দিয়ে আমাদের ভাষায় এনেছি। ‘সুজলাম সুফলাম মলয়জ শীতলাম শস্য শ্যামলাম’কে আমরা বলছি—সুজলা সুফলা মলয়জ শীতল শস্য শ্যামলা। ‘শুভ্র জ্যোত্স্না পুলকিত যামিনিম’কে বলছি—শুভ্র জ্যোত্স্না পুলকিত যামিনি। এ ধরনের বর্জন সর্বজন সমর্থিত; কিন্তু বানান পরিবর্তন জনসমর্থিত নয়। যামিনিকে ‘যামিনী’, আগামিকে ‘আগামী’ লেখা অনুচিত।
অনুচ্ছেদ ১.২-এ সংস্কৃত বিকল্প বানানে দীর্ঘ স্বর রহিত করে একমাত্র হ্রস্ব স্বর গ্রহণ করা হয়েছে। এটি খুবই সুন্দর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখানে উদাহরণ হিসেবে অনেক শব্দের উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রকার শব্দ আর মাত্র গোটা বিশেক অবশিষ্ট আছে। বাকি শব্দগুলো উল্লেখ করলে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ হতো। যেমন :অঙ্গুলি, অঞ্জলি, অটবি, অন্তরিক্ষ, অবনি, তরি, শাল্মলি, বৈতরণি, পক্ষি, ব্রততি, পরিপাটি, বেণি, বসতি, বল্লরি, বলভি, নিরস, নিবারধান্য প্রভৃতি।
১.৫ অনুচ্ছেদে গুণি, প্রাণি ও দায়ি শব্দগুলোকে গুণী, প্রাণী ও দায়ী প্রতিপন্ন করা হয়েছে। একে একধরনের বিভ্রান্তি বলে মনে হয়েছে। সে কারণে এ অনুচ্ছেদ লুপ্ত করা প্রয়োজন। যেকোনো শব্দের বানান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য পণ্ডিত গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্নের ‘শব্দসার’, রাজা রাধাকান্তদেব বাহাদুরের ‘শব্দকল্পদ্রুম’, হরিনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গিয় শব্দকোষ’, গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায় ও গোপিকামোহন ভট্টাচার্যের ‘ট্রিল্যাঙ্গুয়াল ডিকশনারি’ আর পণ্ডিত তারানাথ তারকাবাচস্পতির ‘বাচস্পত্যম’ প্রভৃতি অভিধানই পর্যাপ্ত। ২.১ অনুচ্ছেদে চমত্কার নির্দেশনা ও উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। তবে উদাহরণে ‘ভারি’ শব্দের অন্তে বন্ধনিতে ‘অত্যন্ত অর্থে’ কথাগুলো লুপ্ত হওয়া আবশ্যক। সংস্কৃত শব্দ ‘কিং’কে আমরা ‘কি’ লিখি। একে ‘কী’ লেখা মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। সে কারণে ‘কী’-সম্পর্কিত বিধান লুপ্ত হওয়া উচিত। অধিকাংশ দীর্ঘ স্বর যেখানে হ্রস্ব স্বরে রূপান্তরিত হয়েছে, সেখানে হ্রস্ব স্বরকে দীর্ঘ স্বরে রূপান্তর স্ববিরোধিতা ছাড়া আর কিছু নয়।
২.২ অনুচ্ছেদে ‘অনুযায়ি’কে অনুযায়ী লেখা হয়েছে। সংস্কৃত অভিধানে শব্দটি ‘অনুযায়িন’। শব্দের অন্তিমাংশের ‘ন’ কর্তন করলে থাকে ‘অনুযায়ি’। ২.৩ অনুচ্ছেদে একটি চমত্কার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত বাংলা শব্দগুলোর উচ্চারণকে মধুময় করবে।
২.৪ অনুচ্ছেদে ং কে অনুস্বার লেখা হয়েছে। সংস্কৃত অভিধানে এর মূল বানান অনুস্বর বিকল্প বানান অনুস্বার। একে মূল বানানে অনুস্বর বলা উচিত।
২.৫ অনুচ্ছেদে ‘খুর’কে অতত্সম শব্দ প্রতিপন্ন করা হয়েছে। সংস্কৃত অভিধানে ‘খুর’ শব্দটি আছে। ২.৬ অনুচ্ছেদে ‘য’ দিয়ে যা লেখা হয়েছে তা সঠিক নয়। ‘য’ ইংরেজি Y বর্ণের অনুরূপ; Z বর্ণের নয়। ২.৮ অনুচ্ছেদের শেষাংশ দ্রষ্টব্য। তসনস, পসন্দ, মিস্রি, মিসিল প্রভৃতি রূপে বানান অবশ্যই হতে হবে। ব্যত্যয় ঘটালে পুরো প্রয়াস বিধ্বস্ত হয়ে পড়বে। ২.১১ অনুচ্ছেদে উর্ধ, বাণি, এককালিন, দির্ঘ এবং অনুরূপ কিছু তত্সম শব্দকে তদ্ভব শব্দে রূপান্তরের প্রস্তাব করা যেত।
অনুচ্ছেদে ‘সুন্দরি’ শব্দ দ্রষ্টব্য। সংস্কৃত ‘সুন্দরিন’ শব্দটি তত্সমে ন কর্তিত হয়ে ‘সুন্দরি’ হবে। অনুচ্ছেদ ৪-কে নিয়মের বাইরে রাখলে বাংলা বানানে অরাজকতা অব্যাহত থাকবে। অনুচ্ছেদ ৫ অপ্রয়োজনীয়, তার পরও এ অনুচ্ছেদে ২.৩ অনুচ্ছেদের নিরিখে ৯৬টি শব্দের বানানে ও-কার প্রয়োগ করা প্রয়োজন ছিল। স্থানের নামের বানান পরিশুদ্ধপূর্বক আটোয়ারি, কালিগঞ্জ, মধুখালি, রানিনগর, মৌলবিবাজার, নবিগঞ্জ, বিয়ানি বাজার, কোম্পানিগঞ্জ, নবিনগর, গাজিপুর, নরসিংদি, মনোহরদি, ফেনি, নোয়াখালি, ফুলগাজি, মিরসরাই, বাঁশখালি, রাজস্থলি, পটুয়াখালি, দিঘিনালা, আলিকদম, সোনাগাজি, চিলমারি, চিতলমারি, বোয়ালমারি, বেতাগি, আমতলি, গাবতলি, আদমদিঘি, রাজশাহি, নিলফামারি, রানিনগর, ফুলবাড়ি, হাতিবান্ধা, আদিতমারি, ভুরুঙ্গামারি, রৌমারি, নাগেশ্বরি, ঈশ্বরদি, রানিশংকৈল, পিরগঞ্জ, নন্দিগ্রাম, শরিয়তপুর, মাদারিপুর, টুঙ্গিপাড়া, কোটালিপাড়া, কেরানিগঞ্জ, চৌহালি, সরিষাবাড়ি, মির্জাপুর, কটিয়াদি, রাজবাড়ি, ঝালকাঠি, টঙ্গিবাড়ি, টঙ্গি, বালিয়াডাঙ্গি প্রভৃতি প্রস্তাব হওয়া আবশ্যক ছিল। বর্ণিত অবস্থায় প্রমিত বাংলা বানানের পরিমার্জিত সংস্করণ প্রণয়ন ও প্রকাশ করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।