নিশিবক

কার্তিকের রাত সলজ্জ মৌনতা ভেঙে কিছুটা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দৃশ্যপটের পরিবর্তন না ঘটলেও শব্দতরঙ্গের ওঠা-নামা লক্ষযোগ্য। এটি উল্টো চিত্রতরঙ্গ। রাতের শুরুতে কোলাহল, দিনের মুখরতা, পট পরিবর্তনের শব্দলহরী অধিক শ্রবণগ্রাহ্য। ধীরে দিনটার পূর্ণ মৃত্যু হলে এসব অন্তর্হিত হয়। কিন্তু এটি একাত্তরের কার্তিকের রাত। শব্দেরা মরে গিয়েও আবার ফিরে আসে। তবে দিগন্ত বা আসমান যে দৃশ্যকল্প তৈরি করেছিল তাতে বিশেষ পরিবর্তন আসে না। কোথাও ঘন কুয়াশা-আস্তরণের মাইলকে মাইল বিস্তৃতি, কোথাও হালকা, বরাবর বিছিয়ে রাখা লম্বা চাদর। কিতাব আলীর জমিতে এক আঙুল পানি। বোরো রোপণের আগেও কীভাবে জমিটার সদ্ব্যবহার করা যায় সেটি চতুর কিতাব আলীর জানা। কিতাব আলী গায়ে-খাটা কৃষক। সারা দিন বাড়িতে সময় কাটায়, রাতে পড়ে থাকে জমিতে। জমির এক কোনায় তুলে নেয় ছন-ছাউনি। কিতাব আলীর সঙ্গী ফুলমিয়া সারা রাত দূরের শ্যালো মেশিন থেকে নালা কেটে পানি আনে জমিতে। এক ভোরে ফুলমিয়া আবিষ্কার করে, সন্ধ্যায় সেচা জমির পানি উধাও। দেখে আইলের নিচ দিয়ে এখানে-সেখানে কয়েকটি নালা। নিশ্চয়ই কাঁকড়ার কারবার। এর পর থেকে ফুলমিয়া জমিতে কাঁকড়া দেখলেই পাঁচন দিয়ে গুতিয়ে মারে। আজও আবছা আলোয় এ কাজ করতে লেগে যায়। এভাবে মাটি ও জলে চপচপ আওয়াজ ওঠে। তবে রাতে বোঝা মুশকিল হয় কোনটি কাঁকড়া, কচ্ছপ কিংবা শামুক। তবু সে অযথাই কাদাপানিতে চপচপ আওয়াজ তোলে। এটি তার এক ধরনের খেয়ালও হতে পারে—ছেলেমানুষী খেয়াল। কিতাব আলীর আসল নেশা পাখি ধরা। দিনের নয়, রাতের পঙ্খীর নেশায় সে বুঁদ হয়ে থাকে। কায়দামতো ধাতব ফাঁদ পেতে রাখে। নিশিবক মাছ ধরে, নিজেও ধরা পড়ে। ওই দিকে মাছ ধরার জন্য যে পাতিলের ফাঁদ পেতে রাখা হয় সেটাও অভিনব। পাতিলটা চাপ দিয়ে কাদার মধ্যে বসিয়ে দেয়। পাতিলের মুখ খোলা। একটা ক্ষীণ ধারার নালা পাতিলের সাথে সংযুক্ত। এ দিয়ে জল তেমন গড়িয়ে পড়ে না। কেবল শিং, মাগুর, কৈ, টাকি মাছ গড়িয়ে গড়িয়ে এসে জমা হয়। আশ্বিন-কার্তিকের পানির টানের সাথে সব মাছ চলে যায় না। যেগুলো থাকে, চলে আসে কিতাব আলীর পাতিলে। কিন্তু মুশকিল হলো নিশিবকের সামনে পড়লে ব্যাঙ, কাঁকড়া, ইঁদুর, কীট বাদ দিয়ে ওগুলো কেবল মাছই ধরে। তাই কিতাব আলীর এ ধাতব ফাঁদ। সে একটা যুক্তিও পেয়ে যায়, মাছ রক্ষার জন্য বক ধরা। পাঁচজনের একটি দল কিতাব আলীর কুঁড়েঘরের কাছে এসে ফিসফিস করে। এই ক্যাডা, ক্যাডা কতা কও? আমরা। আমরা ক্যাডা? আমরা চাচা। কিতাব আলী কাছে এসে বোঝে এরা অস্ত্রধারী। তোমরা কী হর?—কিতাব আলীর কণ্ঠস্বর ভয়মিশ্রিত। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করি। আরে কাম-কাজ কী হর? মুক্তিযুদ্ধ। বুঝলা না, পেশার কথা জিগাই। মুক্তিযুদ্ধ। আরে ধুর মিয়ারা, পেশা অইলো যা-দে পেট চলে।—এরই মধ্যে কিতাব আলী আন্দাজ করে, এরা পরিচয় প্রকাশ করবে না। একজন বলে—ভুল কইলাইন চাচা, দ্যাশের কামার-কুমার কত কষ্ট হইর্যা জিনিস বানায়। হগলের কি পেট চলে? মাডির খেলনা, হাঁড়ি-পাতিল বেইচ্চে কয়ডা পয়সা পায়? এমুনও দিন যায় আষ্ট আনাও কামাই অয় না। চলে না চাচা, চলে না। অন্যজন বলে—চলোতো ঠিহই, পাকিস্তানিরা চুইষ্যে খাইয়া দ্যাশটারে শ্মশান বানাইছে। হ, আমরা কাগজ কিনি বারো আনা দিস্তা। পশ্চিম পাকিস্তানে নাহি ছয় আনা। তে অইলে একজনের পরিচয় পাইলাম। তুমি ছাত্র। অন্যরাও? না চাচা, আফনের মতোই আলচাষ করি। মাছ মারি। খাইলে খাই, না খাইলে না খাই। শেষ কথাটি কিতাব আলীর মনে ধরে এবং ধারণা করে, হয়তো এরা না খেয়েই আছে। তে অইলে মিয়ারা ঘর আইয়া বও, চাইড্ডে খাইয়া যাও। চাচা হাসাইলাইন। আফনের বাড়িত থে খাওন আনতে আনতে রাইত কাবার অইয়া যাইব গা। না, ইহানোই ব্যবস্থা করবাম। কইন কী চাচা? হ, তেলতেলা মাছের সালুন জইম্যা রইছে ঠান্ডায়। খালি ভাত রান্দুম। গরম ভাতের উপরে ছাইড়্যা দিবা ঠান্ডা সালুন, দেখবা কেমুন গইল্যা গেছে। চাচা, খাওনডা বড় না। পাকিস্তানি বাহিনীর কতা কইন। এই সিঅ্যান্ডবি রোড দে রাইতে তারার গাড়ি কয়বার যাওয়া-আসা করে? তা অইব রাইতে পাঁচ-সাতবার। কিন্তু আইজ অহনও যাওয়া-আসা শুরু অয় নাই। ক্যারে, কুনু খবর আছে? অপারেশন অইব। এইবার কিতাব আলী সত্যিই ভয় পায়। হ, চাচা, নাম দিচি ‘অপারেশন কাদামাটি’—বলেই সে হো হো করে হেসে ওঠে। এই আস্তে হাসো—অন্যজন গামছায় তার মুখ চেপে ধরে। কিতাব আলী ভয় পায়নি—এটা প্রমাণের জন্য এদের ঘরের চৌকিতে নিয়ে বসায়। একটি সরু চার পায়া খাট, এক কোনায় একটি তেলচিটচিটে বালিশ যার মধ্যে মাথা রেখে ফুলমিয়া ইতিমধ্যেই গা এলিয়ে দিয়েছে। তার গায়ে একটা চাদর। দুই হাত দুই ঊরুর মধ্যে গুঁজে দিয়ে কাত হয়ে আছে। কিতাব আলীর ডাকে তার ওম ভাঙে। সে লাফ দিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করে—কী অইছে কাহা? ভাত রান্দো। ক্যাডা খাইব? তর জানবার দরহার কী? কুপির আলোয় ফুলমিয়া দেখে, ছোট্ট ঘরটা লোকে গিজগিজ করছে। অস্ত্রগুলো দেখে তার ঔত্সুক্য বাড়ে। সে কাঁথাটি কোলের মধ্যে নিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে ফেলে। দলের কমান্ডার কিতাব আলীকে বলে—চাচা সারা দ্যাশ যুদ্ধে কাঁপতাছে। চাইর দিকে পাকিস্তানী বাহিনী নিদুুষ মানুষ মারতাছে, ঘরবাড়ি জ্বালাইতাছে। পথে-ঘাডে পচা লাশের গন্ধ। ডরে দিনেই নিশি লাইগ্যা যায়। আর আফনে এই নিশি রাইতে এলহা ইহানো পইড়্যা থাহুইন। কুনু ডর-ভয় নাই? ব্যাপার কী? চাচা কি রাজাকার? না, আলবদর? তওবা আসতাগ... তে অইলে ব্যাপারডা খুইল্যা কইন। অতক্ষণ আফনে আমরারে জিগাইছেন, এইবার আমরা আফনেরে জিগাই, আফনে আসলে ক্যাডা? নাম কী? কিতাব আলী। বাড়ি? এই গেরামেই, উত্তর নোয়াগাঁও। রাইতে কী করুইন? নিশিবক ধরি। নিশিবক? ভালা একটা পাসওয়ার্ড পাইলাম। মনে রাহিস। তে অইলে কইন, পক্ষীডা দেখতে ক্যামুন? সুরমা রং চিনো, এই রহম। ইড্যা চাড়াও আর একটা জাত আছে, বাদামী। চাচা, চিনলাম না। আরে ইড্যারে কয় কালামাথা, রাইতচোরা। ও বুঝছি, ওয়াক পক্ষী। মিয়ারা পইখ চিনলা, মানুষ চিনলা না। আমারে কও রাজাকার। চাচা, মনে কিছু কইরেন না। আফনের সাহস দেইখ্যা আমরাও ডর লাগে। রাজাকারের কি ডর-ভয় নাই? তারারও ভয় আছে—কুন সময় খাইব বিচ্ছুর কামুড়। বিচ্ছু? হ, চরমপত্র উনছি না মনে হর? ঠিহই কইছুন, সাবেরই ডর-ভয় আছে, খালি নাই নিশিবগার। তে চাচা, এই পক্ষী রাইতে শিহার ধরে ক্যারে? ইহা অনেক কতা। যেমন— বাপদাদার মুহে উনছি, কানি বগার লগে এই বগার আদার ধরা লইয়া তুমুল মারামারি অইছিল। অক্করে রক্তারক্তি। শেষম্যাশ পক্ষীর সরদার মীমাংসা কইর্যা দেয়, একদল রাইতে ধরব, আর একদল ধরব দিনে। এরপর থে রাইত-দিন ভাগাভাগি অইয়া গেছে। চাচা, আমরাও নিশিবক। রাইত-দিন ভাগাভাগি কইর্যা নিছি। দিন পাকিস্তানি বাহিনীর, রাইত আমরার। কিন্তুক কতা অইলো, বগাডা ধরুইন ক্যারে, কাহা? কারণ অইলো পক্ষীর গুস্তের মজাই আলগা। আর ফান্দের মাছও ত রক্ষা করণ লাগব। বুঝলাম না, কাহা। এই ধরো, শিং-মাগুর ধরবার লাইগ্যা পায়লার যে ফাঁদ পাতছি তার আধা-আধিই খাইয়া ফালায় রাইতের বগা। এর লাইগ্যা আর এটা ফাঁদ দে বগা ধরি। দেহিছে, মাছের ফান্দডা ক্যামুন। বলেই যোদ্ধারা ঘর থেকে বের হয়ে আসে। দেখে একটা ক্ষীণ রেখার নালা অদূরের পাতিল পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। আর শোনা যাচ্ছে মাছের চপচপ আওয়াজ। চাচা, এইডা যে দেখতাছি আমরার মতোই গেরিলা কায়দা। দলের সবচেয়ে ছোট্টজন ফুলমিয়াকে সাথে নিয়ে ঔত্সুক্য নিবারণের জন্য ক্ষীণরেখা বরাবর হাঁটে। কখনো নিজেই নালা থেকে হাত দিয়ে একটা-দুটা মাছ ধরার চেষ্টা করে। তার পা অনেকটা কাদার মধ্যে সেঁধিয়ে যাওয়ায় কাঁধের রাইফেলের বাঁটটিও কিছুটা কাদায় ঢুকে যায় এবং তা অন্য একটি ক্ষীণ নালারেখা তৈরি করে সামনে অগ্রসর হয়। পাশাপাশি দুটো রেখা, মাছের ও রাইফেলের। অস্ফুট আলোয় ওরা বুঝতে পারে। দেখলাইন চাচা, আমরার বতামিয়া কেলাস ফাইভে পড়ে। রাইফেলডা কান্ধে নিলে মাডিত লাইগ্যা যায়। অহন তো প্যাঁক-কাদায় ভরা। কী কও, অত ছোড ছেরা মুক্তিবাহিনী? চাচা, দরহার ক বয়স মানে? দ্যাশ স্বাধীন করতে অইব না? কিতাব আলী সায় দেয়, ওই দিকে ফুলমিয়াকে গালিও দেয়—এই শালার পুত, তুই ইহানো থাকলে চলত না। জলদি ভাত বয়া, দিরং করিস না। যাই চাচা—ফুলমিয়া এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে বালতির পানিতে চাল ধোয়। মাটির চুলোয় হাঁড়ি চাপালে পাটখড়ির বেড়ার ফাঁক দিয়ে আগুনের আভা টের পাওয়া যায়। বলদের বাচ্চা করে কী। সিঅ্যান্ডবি রোড থে পাকিস্তানি বাহিনী একটু দেখলেই গুলি ছাড়ব। জলদি আগুন নিবা। তারফরে দক্ষিণের বেড়াতে খ্যাতা দুইড্যা টেঙ্গাইয়া ফিরেবার আগুন দে—বলে নিজেই এক দৌড়ে ঘরে প্রবেশ করে বেড়ার সকল ফাঁক-ফোঁকর বন্ধ করে দেয়। ফিরে এসেই কিতাব আলী প্রশ্ন করে—বাবারা, দ্যাশ কুন দিন স্বাধীন অইব? মনে অয় বেশি দেরি নাই। উনলাম ইন্ডিয়া শিগগিরই বাংলাদেশের স্বীকৃতি দিব। তারপরে দেখবাইন কত ধরনের সৈন্যে দ্যাশ ভইর্যা গেছে। শিখ, গুখরা, রাজপুত। তোমরা কই দেখচ? আগরতলায়, ট্রেনিং ক্যাম্পে। কিতাব আলী এসবের কিছুই বোঝে না। সে কেবল জানতে চায় সেই সময়টি কখন—তারা কী কইছে, কুন মাসের কত তারিক আইত ফারে? না চাচা, এইডা সরকারের ব্যাপার। তারা না আইলেও এই দ্যাশ স্বাধীন অইবোই। আমরা নিজেরাই তো যুদ্ধ কইর্যা দ্যাশের কত অঞ্চল মুক্ত করচি। বাজিতপুরের বেশিরভাগই মুক্ত করলাম কয়দিন অইল। দালাল মাইর্যা সাফ। তার বাদেও দ্যাহুইন চাচা, শ্রীধরগঞ্জ ইস্কুলের বোডিঙে রইয়া গেচে একদল খানসেনা। তারা কি নিজের জুরে থাহে? এই দ্যাশের দালালরা আমরারই ভাই-ভাতিজা, যারা পাঞ্জাবিরারে জামাই আদর করতাচে। অতকগুলো বাঙালির মইধ্যে তারা বিদেশি অইয়াও বহাল তবিয়তে। তারা গরিব গেরামবাসীর মুরগির ঠ্যাং ধইর্যা খায়। এই দ্যাশের বাঙালি রাজাকার আর্মি ক্যাম্পে দ্যাশের ছেরি ধরাইয়া দেয়। কিন্তু আইজই বাদশাহি জিন্দেগির শেষ। তুই লাহোর, পেশোয়ার, কাশ্মীর গে আঙ্গুর, বেদানা, নাশপাতি খা। এই দ্যাশের মুরগির ঠ্যাং আর না। খালি কি মুরগির ঠ্যাং, বাঙালিরে ভাও কইর্যা তারার লগে কাবাডি খেলে, কিন্তু রাইতের আন্ধাইরে কেউ একজন খুব সম্ভব আহাদ মিয়া, স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়াইয়া দিলে বাদের দিন থে খেলাডা বন্ধ অয়। শেষে পায়ের নিচ থে মাডি সইর্যা গেলেও পাকিস্তানিরা মনে করে, হেই খেলা অহনও চলতাছে। দালালের আশ্রয়ে অহনও যারা ক্যাম্পে আছে, তারা নাহি কইত এইহানে কুনু মুক্তিযোদ্ধা নাই—মুক্তিবাহিনী কিধারসে, আও শালা! তাই আইজ রাইতে একটু দেহাইবার চাই। এই পাঁচজনে ক্যামনে দেহাইবা? আমরা পাঁচজন না চাচা, পাঁচ কুড়ি। গোলাগুলি শুরু অইলে বুঝবাইন আফনের চাইর পাশে আরও আছে কত শত। কিতাব আলী ভড়কে গিয়ে বলে—আগে খাওয়া-দাওয়া করো, তারফরে দেহা যাইব। কিতাব আলীর ইচ্ছে গোলাগুলিটা অন্তত তার জমি থেকে শুরু না হোক। ফুলমিয়া ঘরের ভেতর থেকে বলে—কাহা, তারারে লইয়াইন। ওরা ঘরে ঢুকতেই কিতাব আলী অনুনয় করে—বাবারা, আমারে মাফ করো। দুইবারে খাইতে অইব। বর্তন আছে মাত্র তিনডে, মানুষ অইল পাঁচজন। কুনু অসুবিধা নাই। দেইন যা যা আছে, আমরা নিজেরা বাইড়্যা লই। ফুলমিয়া প্রত্যেকের পাতে গরম ভাত দেয় কাঠের চামচা দিয়ে। একই চামচায় সে জমাটবাঁধা ঝোলসহ একটা করে মাছের ভাঙা টুকরো দেয় ভাতের ওপর। ঝোল গলে পানি হয়ে যায়। ওরা এসব গোগ্রাসে গিলছে আর আলাপ করছে। মিয়া, বাড়ি কই, কইলা না? বাড়ির কতা বাদ দেইন চাচা, মনে করুইন আপনের আশপাশেই। আসল কথা কইন। অহন পর্যন্ত একবারও পাকিস্তানি বাহিনীর লাইট চোক্ষে পড়ল না। ব্যাপার কী, কইনচেন দেহি? ব্যাপার কিচু না। অনেক দিন দেরিতে বাইর অয়। তারার টাইমের কুনু ঠিক নাই। আমরা আইলাম অপারেশন করতে, আর আজগাই তারার দেহা নাই। পাইলেই গুলি করতে করতে দৌড়াইয়া লইয়া যাইয়াম বোর্ডিঙের ভিতরে। তার বাদে চাইর দিক থে সাঁড়াশি আক্রমণ কইর্যা সব কয়ডারে জীবনের লাইগ্যে শ্যাষ করবাম। ব্যাডা অইলে যুদ্ধ করব, না অয় স্যারেন্ডার। কাইল ব্যায়ানেই আমরার পুরা বাইজপুর স্বাধীন ঘোষণা করতে অইব। খালি শ্রীধরগঞ্জডা শত্রুমুক্ত কইর্যা লই। এই, ভাতটা ঢাইক্যা রাখো। ভাত জুরায়া গেলে বাহি দুইজন সান্নের মজা পাইত না। ফুলমিয়া মাটির ঢাকনা দিয়ে ভাত ঢাকে। কিতাব আলী এটা-সেটা বলে ওদের তুষ্ট করার চেষ্টায় রত। তে মিয়ারা, আমার ক্ষেততে গুলি করবা? ইহানো একটা ঘর আছে যে। কিছু অইব না, চাচা। আমরা অনেক আগাইয়া গে গুলি করুম। তা ছাড়া সিঅ্যান্ডবি রোডেত থে আফনের জমি অনেক দূরে। চাচা যে কী কইন। আফনে আমরারে আদর-যত্ন কইর্যা খাওয়াইলাম, আর আফনেরে আমরা সম্মান দিতাম না? দ্যাশ স্বাধীন অইলে গর্ব কইর্যা কইতে পারবাইন, আমার এই ক্ষেতে যুদ্ধ অইছিল। এই সম্মান কয়জনের ভাইগ্যে জুডে? কিন্তু চাচা ব্যাপার কী, আইজ পাকিস্তানি বাহিনী কই? ‘কী জানি, মনে অয় মদ খাইয়া ঘুমায়া রইছে। সবুর করো, টাইমমতো ঠিহই আইব। তবে একটু আস্তে গুলি কইরো বাবারা, বুঝলা না—আওয়াজ কমাইয়া গুলি ছাইড়ো। এ কথায় ওরা হো হো করে হেসে উঠলেও নিজেদের গলার ভলিউম টিকই কমিয়ে দেয়, যদিও রাইফেলের ভলিউম কমানো সম্ভব নয়। পরক্ষণেই সবাই একযোগে প্রতীক্ষার প্রহর গোনে। কারও চোখ ঢুলুঢুলু। চরাচর নিস্তব্ধ। কাছে ঝিঁঝিঁর ডাক ও দূরে কোরাল পক্ষীর আহ্বান। হঠাত্ই অদূরে কুয়াশা ভেদ করে হেড লাইটের একটা আলো কারও কারও চোখের আলোকে ক্রস করে। ওরা রাইফেলে হাত দিতেই কিতাব আলী বলে—ধৈর্য ধরো, মিয়ারা। আগে বুইজ্যা-শুইন্যা লও। টহল যখন শুরু করছে, আরও দিব। ঠিক মতন কায়দায় ফালাইয়া গুলি করো। মুক্তিযোদ্ধারা বুঝে নেয়, কিতাব আলী সত্যি সত্যিই স্বাধীনতার পক্ষে। দু-একবার টহল দেওয়ার অবসরে দলটি সামনে অনেক দূর অগ্রসর হয়। প্রায় পাকা সড়কের কাছাকাছি। একবার অ্যাম্বুশে পেয়েই গুলি ছোড়ে। বেশ কয়েকটি থ্রি নট থ্রি একসাথে গর্জে ওঠে। ঘটনার আকস্মিকতায় হানাদার বাহিনী গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পিছু হটে যায়। ওদের একজন আকাশ-বাতাস প্রকম্বিত করে বলে—মুক্তি ফৌজ কিধারসে, দ্যাখ শালা শুয়ারকা বাচ্চা! দলটি আবার কিতাব আলীর জমিতে ফিরে আসে। একজন বলে—চাচা, আফনে ডরাইলে রাইতে আর ক্ষেতে আইয়েন না যে। বাবা, নিশিবগার নিশির টান। দ্যাশ স্বাধীন অইলে হেই টানে ফিরেবার আইবাইন। মনে রাহুইন যে, আফনে নিশিবগার লাইগ্যা যেই ফান্দ পাতছুইন, আমরাও তারারে নিয়া হেই ফান্দের খেলা শুরু করচি। অহন থাইক্যা রোজ রাইতেই আমরা এইভাবে আইয়াম। হয়তো আর একজনের ক্ষেতে। আমরা আইতেই থাকবাম দ্যাশ স্বাধীন না অওয়া পর্যন্ত। ওরা কিতাব আলীকে বিদায় জানিয়ে একের পর এক অন্তর্হিত হতে থাকে তার ক্ষেতের আইল ধরে। এইবার কিতাব আলী এদের কিছুটা স্পষ্ট দেখে। এক কাতারে কয়েকজন। দূরের জনকে অস্পষ্ট দেখায়। এই সময় প্রকৃতি জানান দেয়, একটু পরই পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠবে রক্তলাল।