বিক্ষোভে উত্তাল পোশাক শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ-ভাঙচুর

সাভারে ভবন ধসে প্রাণহানির প্রতিবাদ ও দোষীদের গ্রেফতার, নিহত এবং আহতদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী ,গাজীপুর, সাভারে বিক্ষোভ করেছে পোশাক শ্রমিকরা। তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধসহ যানবাহন, কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এসময় মহাসড়কে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। আটকাপড়ে শতশত যানবাহন। চরম দুর্ভোগে পড়ে হাজার হাজার যাত্রী। অপরদিকে রাজধানীর হাতিরঝিলে অবস্থিত বিজিএমইএ ভবনের সামনেও বিক্ষোভ করেছে পোশাক শ্রমিকরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, সকালের দিকে রাজধানীর রামপুরা, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, রেলক্রসিং, মগবাজার, মোহাম্মদপুর এলাকার বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় ভাংচুর চালায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। এ অবস্থায় এসব কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সকাল ১১টার দিকে কয়েকশ শ্রমিক হাতিরঝিলে অবস্থিত বিজিএমইএ ভবনের সামনে বিক্ষোভ করে। এসময় বিবিএমইএ ভবনের ভেতরে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বিজিএমইএ’র সঙ্গে বৈঠক চলছিল। এক পর্যায় তারা ভবনের ভেতর প্রবেশের চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ তাদের বাধা দিলে শ্রমিকরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। তারা এসময় বিজিএমইএ ভবনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও ভবনের সামনের সড়কে একটি প্রাইভেটকার ও কাওরানবাজারের একটি মার্কেটের নিচতলায় ভাংচুর করে। পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এ ব্যাপারে রমনা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার এস এম শিবলী নোমান জানান, বেশ কিছু শ্রমিক বিজিএমইএ ভবনের সামনে জড়ো হয়। তারা একটি প্রাইভেটকার ভাংচুর করলে পুলিশ তাদেরকে সরিয়ে দেয়। তিনি আরও বলেন, এসময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশ ও আশপাশের লোকজনের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিজিএমইএ ভবনের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, সকালে অন্যান্য দিনের মতো দিনে কাজে যোগ দেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। সকাল সাড়ে আটটার দিকে গাজীপুর সদর উপজেলার নাওজোর এলাকার দিগন্ত সোয়েটার, ভোগড়ার এলাকার স্টার লাইট সোয়েটার, নেকসাস সোয়েটার, গরিব অ্যান্ড গরিব সোয়েটার ও মাইশা-মনিশা পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিক শোক দিবসের দিনে তাদের কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় তারা আশপাশের কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভে যোগ দেয়ার আহ্বান জানায়। এতে সাড়া না দেয়ায় আন্দোলনরত শ্রমিকরা ভোগড়া শিল্প এলাকায় নেকসাস ও পেগাসাস জুতা কারখানাসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় ইট-পাটকেল ছোঁড়ে। পরে তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও ঢাকা-গাজীপুর সড়ক অবরোধ করে। এ সময় তারা শতাধিক যানবাহন ভাংচুর করে। শ্রমিকরা বেলা পৌনে ১২টা পর্যন্ত সড়ক দুটি অবরোধ করে রাখে। চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা এক পোশাক শ্রমিককে ধরে নিয়ে গেছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে গাজীপুর জেলা বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের অফিস ভাংচুর করে এবং অফিসের চেয়ার, টেবিল ও আসবাবপত্র তিন তলা থেকে নিচে ফেলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পাশের ফজল ম্যানশনের তৃতীয় তলার মোবাইল ডট কম ও সার্ভিস এন্ড ট্রেনিং সেন্টারে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট করে। তারা এখান থেকে ৪টি কম্পিউটার, ৪টি এলসিডি মনিটর, বিভিন্ন প্রকারের দুইশ মোবাইল সেট লুটপাট করে নিয়ে যায়। দোকানের মালিক এম এ মান্নান দাবি করেন, মালামাল ও ভাংচুরের কারণে তার ৫-৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তারা একই মার্কেটের দু’তলায় স্যামস্যাং কোম্পানির জি-টেল মোবাইল সেন্টার থেকে ল্যাপটপ ও মোবাইল সেটসহ কয়েক লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে বলে দাবি করেন মালিক এমএ মালেক। বিভিন্ন বাস কাউন্টারের অফিস কক্ষে হামলা ও ভাংচুর করে লুটপাট চালায়। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঢাকা-গাজীপুর সড়কের পাশে অবস্থিত আড়ং দুধ কারখানার নিরাপত্তা কর্মীদের রুমে আগুন ধরিয়ে দেয়। শ্রমিকরা কারখানার ভিতরে থাকা একটি মাইক্রোবাস, একটি দুধবাহী লরি ও ৫টি কাভার্ড ভ্যান ভাংচুর এবং একটি পিকআপ ভ্যান এবং একটি মোটর সাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ছাড়া একই সময়ে গাজীপুরের বোর্ডবাজার, কোনাবাড়ি, কাশিমপুরের জিরানী, দক্ষিণ পানিশাইল, রাজেন্দ্রপুর, ছয়দানা মালেকের বাড়ি এলাকায় শ্রমিকরা বিক্ষিপ্ত ভাবে অর্ধশতাধিক যানবাহন এবং বিভিন্ন কারখানার দরজা জানালা ভাংচুর করে। এদিকে জেলা বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতি গাজীপুর জেলা শাখার অফিসে হামলা, ওই ভবনে অবস্থিত বিভিন্ন দোকান ও পরিবহন কোম্পানির বাস কাউন্টারে হামলা ও লুটপাটের প্রতিবাদে এবং জড়িতদের বিচারের দাবিতে গাজীপুরসহ উত্তরাঞ্চলে চলাচলকারী ১৩টি জেলার ৪০টি রুটে বাস চালানো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহন সমিতি গাজীপুর জেলা শাখার অফিসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান সরকার রাসেল বাস না চালানোর এ ঘোষণা দেন। পরিবহন নেতারা জানান, বৃহস্পতিবার বেলা ২টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বাস বন্ধ থাকবে। দাবি পূরণ না হলে আজ শুক্রবার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। টঙ্গী সংবাদদাতা জানান, টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষুব্ধ গার্মেন্টস শ্রমিকরা গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধ করে রাখে। এসময় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ১ ঘন্টা যানচলাচল বন্ধ থাকে। এসময় ১০ জন গার্মেন্টস শ্রমিক আহত হয়। এতে মারাত্মক দুর্ভোগের স্বীকার হয় যাত্রী ও পথচারীরা। রূপগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, বিক্ষুব্ধ পোশাক শ্রমিকরা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার বরাবস্থ শরীফ মেলামাইন ইন্ডাষ্ট্রিজে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। এ সময় তারা মিলের ভেতরে থাকা ২টি প্রাইভেটকার, একটি ট্রাকসহ অফিস কক্ষে অগ্নিসংযোগ করে। লুটপাট করা হয়েছে কয়েক কোটি টাকার মালামাল। উত্তেজিত শ্রমিকরা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে ১০-১২টি যানবাহন ভাংচুর করে। নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলের বিসিক শিল্প নগরীতে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার ঘটনায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা তাণ্ডব চালায়। বিকালে তারা লাঠিসোটা নিয়ে মিছিল বের করে ১০-১২টি গাড়ি ভাংচুর ও অন্তত অর্ধশত গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে। সিদ্ধিরগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, আদমজী ইপিজেডের কয়েক হাজার শ্রমিক বিক্ষোভ মিছিল ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ দুটি সড়ক অবরোধ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২ পর্যন্ত নিরাপদ কাজের পরিবেশ ও হতাহতের ঘটনার সাথে জড়িতদের শাস্তির দাবিতে শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে।