ব্যাংকার ও কাস্টমার পারস্পরিক দায়িত্ববোধ

বর্তমান যুগ তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানের চরম উন্নতির যুগ। এ যুগে সারাবিশ্বে ব্যাংক ব্যবস্থা শুধু আমানত গ্রহণ কিংবা বিনিয়োগ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং তা অনন্য সেবা শিল্প হিসেবেও একটি যুগান্তকারী বিপ্লব সৃষ্টি করেছে, যা সেবার ক্ষেত্রকে অফিসের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। চালু করেছে ইলেকট্রনিক্স ব্যাংকিংসেবা। মূলত গ্রাহকরা ব্যাংকের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। গ্রাহকবিহীন ব্যাংক কল্পনাতীত। ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের মধ্য দিয়েই ব্যাংকিং কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। সামপ্রতিককালের ব্যাংক গবেষকরা মনে করেন, গ্রাহকরাই ব্যাংকের প্রাণ, ব্যাংকের সম্পদ এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। অফিসিয়াল এবং নৈতিক দায়িত্বের আওতায় একজন ব্যাংকার সম্মানিত গ্রাহককে সেবা দিয়ে থাকেন। গ্রাহক সেবা/গ্রাহক প্লেজার/গ্রাহক চয়েস বলতে সাধারণত ব্যাংকের আমানতকারীদের, বিনিয়োগ গ্রহীতাদের এবং বিভিন্ন প্রকার সেবা গ্রাহককে স্বল্প সময়ে নিখুঁত ও ত্বরিত কাজ করে দেয়াকে বুঝায়। যেসব উপাদান প্রাহকসেবাকে উন্নত করে সেগুলো হলো, যেমন-সৌজন্য আচরণ, সমস্যা সমাধানে সহায়ক মানসিকতা প্রদর্শন, দ্রুত ও নির্ভুল হিসাব খোলা নিশ্চিতকরণ, হিসাবধারীদের টাকা দ্রুত জমা দেয়া নিশ্চিতকরণ, দ্রুত চেক প্রদান এবং ঋণদান কার্যক্রম দ্রুত ও সহজীকরণ প্রক্রিয়া প্রভৃতি। এক্ষেত্রে গ্রাহকের কতগুলো প্রত্যাশা থাকে, যেমন- চাহিবা মাত্র জমাকৃত অর্থ ফেরত প্রদান, আদালতের নির্দেশ বা গ্রাহকের আদেশ ব্যতীত হিসাব সম্পর্কিত কোন তথ্য প্রকাশ না করা, গ্রাহকের আদেশের ধরন অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য থাকা, যুক্তিসংগত কারণ সাপেক্ষে যথোপযু্ক্ত সময় প্রদান করে ও গ্রাহককে নোটিস দিয়ে হিসাব বন্ধ করা, বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়ে যথাযথভাবে গ্রাহকের হিসাব সংরক্ষণ করা, আমানতের উপর মেয়াদান্তে চুক্তি মোতাবেক মুনাফা প্রদান করা, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উপযু্ক্ত সময় ও সুযোগ প্রদান করা, মুদ্রার বিকল্প বিনিময় মাধ্যম সৃষ্টি করা, সরকারি বিভিন্ন বিল, যেমন-পানি, বিদ্যুত্, গ্যাস প্রভৃতি গ্রহণ করা, হজ্বের টাকা জমা রাখা, বিভিন্ন কোম্পানির আইপিও-এর টাকা গ্রহণ, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বিশ্লেষণপূর্বক সরকারকে পরামর্শ দান, তারল্য সংকট থাকলে আগাম খবরদান, আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতকরণ, গ্রাহকের মূল্যবান সম্পদ সুরক্ষায় লকার সার্ভিস চালুকরণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সহায়তাদান, বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় প্রভৃতি। গ্রাহকের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ব্যাংকার তার সাধ্যানুযায়ী সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যাংকে বিভিন্ন মানসিকতাসম্পন্ন লোকজনের সমাগম ঘটে। প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং ব্যবসায় সফলতা আনয়নকল্পে গ্রাহকের মেজাজের প্রতি যথাযথ খেয়াল রেখে সেবা প্রদান করা ব্যাংকারদের নৈতিক দায়িত্ব। ব্যাংকের প্রতিও গ্রাহকের কিছু করণীয় আছে, যেমন-জামানতী সম্পত্তির ব্যাংকের অধিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, সার্ভিস রেট-এর দর কষাকষি না করা, পূর্ব নির্ধারিত চুক্তি মোতাবেক মুনাফা গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বিধা না করা, বিনিয়োগ চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করা, চেক অঙ্কনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা, অনাকাঙ্ক্ষিত চেক প্রদান থেকে দূরে থাকা, ব্যাংকের নিকট বিশ্বস্ত এবং সততার প্রতীক হিসেবে নিজকে পরিচিত করে তোলা, সকল প্রকার জালিয়াতি, অন্যায় ও প্রতারণা রোধকল্পে ব্যাংককে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে সহায়তাদান করা ইত্যাদি। আজকাল উন্নত বিশ্বে ব্যাংকিং সেবায় যেসব সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহূত হচ্ছে আমাদের ব্যাংকিং খাতও এ ব্যাপারে পিছিয়ে নেই। ব্যাংকিং সেবাকে দ্রুত এবং নিখুঁত করার লক্ষ্যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে দিন দিন। ব্যাংকারগণ কতগুলো নৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ব্যাংকিংসেবা সম্পন্ন করে থাকে। তন্মধ্যে রয়েছে যেমন-ক) পূর্ণ কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বাঞ্ছিত হার অর্জনের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক কল্যাণ সাধন করা। খ) আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। গ) মুদ্রামানের স্থিতিশীলতা অর্জন করা, যাতে মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যমরূপে হিসাব-নিকাশের একটি নির্ভরযোগ্য একক; বকেয়া পরিশোধের একটি সঠিক মানদণ্ড এবং সঞ্চয়ের একটি স্থিতিশীল বাহন হতে পারে। ঘ) পর্যাপ্ত সঞ্চয় সৃষ্টি এবং উপরোক্ত লক্ষ্যের সাথে সংগতিশীল কাঠামোর অধীনে সঞ্চয়ের দক্ষতাপূর্ণ সমাবেশ করা এবং ঙ) সাধারণভাবে করণীয় ব্যাংকের যাবতীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দেয়া। উদ্দেশ্যের সাথে বাংলাদেশের গণমানুষের একাত্মতা আর সমর্থন নিবিড়ভাবে জড়িত। ব্যাংকগুলো মানুষের জীবনকে আশীর্বাদময় করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে গুণগত মানোন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কল্যাণ সাধন করে যাচ্ছে। ব্যাংকারকে নৈতিক দিক থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত দ্রব্যসামগ্রীর উত্পাদনের মধ্যে অর্জিত উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি লাভের মানসিকতা কমাতে হবে। মনে রাখতে হবে, বল্গাহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার এবং সম্পদের যথেচ্ছ বিনিয়োগ ও ব্যবহার সমাজের নৈতিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষিত করে। যার অনিবার্য পরিণতিতে বর্তমান ও ভবিষ্যত্ নাগরিকদের নৈতিক অবক্ষয় সাধিত হবে। রাজনৈতিক চাপের মুখে জনগণের বিরাট আমানত জালিয়াতচক্রের হাতে তুলে দেয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। সর্বস্তরে সবুজ ব্যাংকিং পলিসি বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্যাংকিং খাতকে মজবুত, কর্মকাণ্ডকে অতীব সহজীকরণ এবং আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করার জন্য সর্বোত্তম গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার প্রভাব মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোকে বুদ্ধিমত্তাসহকারে বিনিযোগদান কর্মসূচি পালন করার পাশাপাশি সর্বোত্তম গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা সময়ের অনিবার্য দাবি। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে যে যত সুন্দর সেবাদানে পারদর্শী, গ্রাহকরা তার দিকে ছুটে চলে তত বেশি। সেবার মান নিম্নমুখী হলে গ্রাহকরা ঠেকায় না পড়লে সেদিকে ধাবিত হয় না। ব্যাংক ব্যবসা হলো এক পক্ষের সম্পদ জমা রেখে অন্য পক্ষকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ করে দেয়ার মাধ্যমে ফায়দা হাসিল করা। আর এতে বিনিয়োগদাতা ও বিনিয়োগ গ্রহীতা উভয় গ্রাহকরাই ব্যাংকে সমবেত হয়। তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর যথাযথ সেবা প্রদানের মাধ্যমেই একটি ব্যাংক সফলতার শীর্ষস্থানে অবস্থান করে সাফল্যের সোনালী সূর্য তোরণ লাভ করতে পারে। ব্যাংকারের উচিত হবে গ্রাহকের ফোনের যথোত্তর প্রদান, তাদের প্রতি সর্বোত্তম মনোযোগদান, অভিযোগ সমাধানে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রত্যাশার চাইতে বাড়তি সেবা প্রদান, হাসিমুখে কথা বলা, সঠিক ও নির্ভুল তথ্যটি প্রদান, নেতিবাচক মনোভাব পরিহার, উপস্থাপনার ধরনকে আকর্ষণীয়করণ, গ্রাহককে নিজের প্রতি বিশ্বস্ত করে তোলা, স্বল্প শিক্ষিত ও অশিক্ষিত গ্রাহকগণের জমার স্লিপ, চেকের পাতা ইত্যাদি লিখে দেয়া, হিসাবের গোপনীয়তা কড়াকড়িভাবে রক্ষা করা, গ্রাহকের হিসাব বিবরণী নিয়মিত ও সময়মতো প্রদান প্রভৃতির মাধ্যমে সর্বোত্তম গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে যাওয়া। বিশ্বায়নের এ যুগে আগ্রাসী ব্যাংকিং করা থেকে সদাসতর্ক থেকে গণমানুষের আমানতকে হেফাজত করতে হবে। কখনো কখনো ব্যাংক কর্মকর্তাদের পদবি নিয়ে গ্রাহকরা বিড়ম্বনার শিকার হন। পদবি নির্ধারণের ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে একই নীতি অবলম্বন করা উচিত। কালের আবর্তে গণমানুষের প্রত্যাশা সংস্কৃতি রুচিবোধ ও মানসিকতায় এসেছে পরিবর্তন-পরিবর্ধন। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের শক্তিশালী তদারকিতে দেশের ব্যাংকগুলো জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দিগন্ত উন্মোচনকারী ভূমিকা রাখতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলোতেও এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু হচ্ছে। নতুন আরো ৯টি ব্যাংক যুক্ত হলো আমাদের অর্থনীতিতে। প্রতিযোগিতামূলক গ্রাহকসেবা প্রদানের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়ে দেশকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। ব্যাংকের প্রতি গণমানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় যেন কোন প্রকার হামলা না আসে সেজন্য ব্যাংকারকে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। দেশকে ভালোবেসে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নিজেদের শ্রম, মেধা, অভিজ্ঞতা আর গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়নে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।