নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে হাওরের নারীরা

নেত্রকোনা জেলার প্রত্যন্ত ও অনুন্নত হাওর উপজেলা নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন কাজ করলেও তাদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন এখনো তেমন হয়নি। তবে সরকারি-বেসরকারিভাবে এই এলাকার জন জীবনের উন্নয়নের জন্য কাজ চলছে। জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলায় দরিদ্র ও প্রান্তিক ৩ হাজার ১৮৮টি পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষে এবং তোদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘদিন যাবত্ কাজ করে যাচ্ছে বেসরকারি সংস্থা ‘বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের রি-কল প্রকল্প’। নারী প্রগতি সংঘ মোহনগঞ্জ প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী মুক্তি মহানায়ক জানান, দাতা সংস্থা অক্সফাম জিবি’র সহযোগিতায় ২০১০ সালের আগস্ট মাস থেকে উপজেলার ৪ নাম্বার মাঘান-সিয়াধার ও ৭ নাম্বার গাগলাজুর ইউনিয়নের ১৭টি গ্রামের ৩ হাজার ১৮৮টি হতদরিদ্র পরিবারের মানুষের জীবন মানোন্নয়নে কাজ চলছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ২টি ইউনিয়নের ১৭টি গ্রামের ৩ হাজার ১৮৮টি পরিবার নিয়ে অক্সফাম জিবি’র সহযোগিতায় কাজ করছে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ রি-কল প্রকল্প। হাওরবেষ্টিত এলাকা হওয়ায় এখানকার মানুষ জন্ম থেকেই প্রতিনিয়ত জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বসবাস করতে হয়। হেমন্তে পাও বর্ষায় নাও এই হলো তাদের জীবন। আর এসব গ্রামের মানুষের জীবনের মানোন্নয়নে অক্সফামের অর্থায়নে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ রি-কল প্রকল্প এলাকায় ২৩টি সমাজভিত্তিক সংগঠন (সিবিও) রয়েছে। সিবিও’র সদস্যরা আনন্দচিত্তে সাংবাদিকদের জানান, ‘আমাদের কোনো কাজকর্ম ছিল না। যাতায়াত করার মতো গ্রামে তেমন রাস্তাও ছিল না। একবেলা খাইলে আরেকবেলা খাইতে পারতাম না। এনজিও স্যারেরা আমাদের নতুন কইর্যা বাঁচার স্বপ্ন দেখাইছে’। গাগলাজুর গ্রামের উদয়ন সমাজভিত্তিক সংগঠন (সিবিও) সদস্য হতদরিদ্র লিপি আক্তার (৩০) দিনমজুর স্বামী প্লাবন মিয়া ও তার সন্তানদের নিয়ে আগে অতিকষ্টে জীবন-যাপন করতো। অনেক সময় অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাতো। সমপ্রতি বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ রি-কল প্রকল্পের মাধ্যমে সিবিও’র সিদ্ধান্ত মোতাবেক লিপি আক্তারকে একটি সেলাই মেশিন দেয়ায় তিনি এখন সুখী। কাপড় সেলাই করে দৈনিক ১৫০ থেকে ২০০ টাকা আয় করছেন। তার এখন আর অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হয় না। স্বামী সন্তান নিয়ে সুখেই আছেন। রি-কল প্রকল্পের ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর মোঃ আব্দুল হক মাসুম জানান, প্রকল্পের কাজে হতদরিদ্র লোকজন অত্যন্ত আনন্দের সাথে সহযোগিতা করছেন। এ প্রকল্পের অধীন ওই দুই ইউনিয়নে হতদরিদ্র মানুষদের স্বাবলম্বী করতে স্বাস্থ্যসেবা, নারী অধিকার, বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ, দুর্যোগ মোকাবেলাসহ মানুষের জীবন মানোন্নয়নে কাজ করছে। এই প্রকল্পের অধীনে দুটি ইউনিয়নে এ পর্যন্ত বিনামূল্যে ১০টি গরু, ২টি গভীর নলকূপ, ২টি শ্যালোমেশিন, ৫টি সেলাই মেশিন, ২৮টি বসতভিটা উঁচুকরণ, ২টি সংযোগ রাস্তা নির্মাণ, ১৫টি পরিবারের মাঝে ২৭টি ছাগল, ৪০ জন উদ্যোক্তা নারীর মাঝে পুঁজির সাপোর্ট, ৩০টি ফলের ও কাঠের চারা বিতরণ, ৫টি সিবিও’র ফুড ব্যাংকে ২৪ হাজার টাকার চেক, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও ৮ জন কৃষককে প্রদর্শনী প্লট তৈরিতে সাপোর্ট বিতরণ করা হয়। সিবিও কমিটির সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুর্যোগ মোকাবেলায় জরুরী মালামালও বিতরণ করা হয়। আর এ আর্থিক সহায়তা পেয়ে গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারগুলো রি-কল প্রকল্পের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা, কেউ বাড়ির খালি জায়গায় সবজি চাষ, কেউ আবার গাভী, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। হাওর পাড়ের এ অবহেলিত মানুষ বিশেষ করে নারীদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ রি-কল প্রকল্প।