অতঃপর লাশের মিছিল
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০১৩, ২০:৪৮
ভবন বা নির্মাণাধীন স্থাপনা ধসের ঘটনা এ দেশে নতুন নয়। ইতোপূর্বে একাধিকবার ভবন ও নির্মাণাধীন স্থাপনা ধসের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর নভেম্বর মাসেও চট্টগ্রামে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসে ১৩ জন নিহত হন। তবে ২০০৫ সালে সাভারে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ধসে ৬৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনাটিই ছিল এ পর্যন্ত ভবন ধসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। কিন্তু গত বুধবার সাভারের রানা প্লাজা ধসে ইতিহাসের ভয়াবহতম দুর্ঘটনার সাক্ষী হলো দেশ। লাশের মিছিল দেখে স্তম্ভিত দেশবাসী।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার ফাটল দেখা দিলে স্থানীয় স্থাপনা বিশেষজ্ঞরা পর্যবেক্ষণের পর ভবনটিতে চলা সকল কার্যক্রম বন্ধ করতে কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেন। এরপর বিল্ডিং-এ থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের কার্যক্রম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বন্ধ ঘোষণা করে অতি প্রয়োজনীয় মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নেন। যার ফলে দুর্ঘটনায় ঐ ব্যাংকের কেউ হতাহত হননি। এমনটি ঘটতে পারতো দুর্ঘটনায় নিহত স্বল্প আয়ের গার্মেন্টস শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও। তারাও হয়তো প্রাণে বেঁচে যেতো। কিন্তু হায় তারা তো গার্মেন্টস-কর্মী তাদের জীবনের কী আর মূল্য ! দুর্ঘটনায় তাদের মরতে হবে এটাই তো স্বাভাবিক !
দেশে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টসশিল্পের মূল চালিকাশক্তি এর শ্রমিক। অথচ তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি বরাবরই থেকেছে উপেক্ষিত। তাই প্রতি বছর এত এত দুর্ঘটনা ঘটলেও কোনোটিরও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হয় না। প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দেওয়া হয় না। পরবর্তী সময়ে যাতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আর না ঘটে সে ব্যাপারেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে দিন দিন গার্মেন্টস দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের তালিকা দীর্ঘ হয়। লাশের মিছিলে যুক্ত হয় নতুন নতুন নাম। এতে বিপুল বিত্তবৈভব সম্পন্ন গার্মেন্টস মালিক বা তার পরিবারের খুব একটা ক্ষতি না হলেও নিহত শ্রমিকের পরিবারকে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিকে হারিয়ে পথে বসতে হয়। প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে মায়ের বুকফাটা আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ফি বছর অনাড়ম্বর কর্মসূচিতে মে দিবস (শ্রমিক দিবস) উদযাপন করা হয় কিন্তু শ্রমিক ও তার পরিবারের সেই আর্তনাদে কেউ কর্ণপাত করে না। সভাসমাবেশ করে শ্রমিক জড়ো করা হয় কিন্তু তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা আর নিশ্চিত করা হয় না।
দুর্ঘটনা ঘটলে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন ,কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য রাখবেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাত্ক্ষণিকভাবে ঘটনা তদন্তে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। আশ্বাস দেওয়া হবে দোষীদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করার। যদি দয়া হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিহতের দাফন-কাফন বাবদ কিছু টাকা ধরিয়ে দেওয়া হবে আত্মীয়স্বজনের হাতে। হতাহতের সংখ্যা বেশি হলে ঘটনার পরের দিন রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষিত হবে। পরে ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার কল্যাণে সপ্তাহ-দশদিনব্যাপী ঘটনাটি আলোচনায় থাকবে। টক শোতে ঘটনার নানা দিক নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণও কিছুকাল চলবে। তারপর? তারপর আবার আরেকটি দুর্ঘটনা অতঃপর শত শ্রমিকের লাশের মিছিল। এভাবেই চলছে, কতকাল চলবে কে জানে? হয়তো শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু কিংবা তার পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদ আর অসহায়ত্ব সরকার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে না তাই সরকারও এতে উদাসীন।
ঢাকা