রাজধানী ও গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ ভাংচুর

সাভারে ভবন ধসে শ্রমিক হতাহতের ঘটনায় গতকাল শুক্রবারও রাজধানী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। এ সময় দুই শতাধিক যানবাহন, অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানা ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর চালানো হয়। তবে অধিকাংশ এলাকায় মিছিলের আশপাশে পুলিশ থাকলেও তারা কোন ধরনের বাধা দেয়নি। এ পরিস্থিতিতে রাজধানীসহ গাজীপুর ও আশুলিয়ার সব পোশাক কারখানা আজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিক্ষোভকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, নগরীর মৌচাক থেকে কুড়িল বিশ্বরোড, আগারগাঁও থেকে মিরপুর, মিরপুর ১০ নম্বর থেকে ১৪ নম্বর, পল্লবী থেকে মিরপুর ১০ নম্বর, শ্যামলীসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক ঘন্টা সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর একটার পর সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এর আগে ধসে যাওয়া রানা প্লাজার মালিক ও পোশাক কারখানার মালিকদের গ্রেফতার এবং পোশাক কারখানা খোলা রাখার প্রতিবাদে হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে কালো পতাকা হাতে বিক্ষোভ করেন। শ্রমিকরা সড়কের দুই পাশের কারখানা, ভবনে ইটপাটকেল ছোঁড়েন। ভাংচুর করেন শতাধিক যানবাহন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস ভাংচুরের শিকার হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়। ভাংচুরের আশংকায় কারওয়ান বাজার এলাকায় বিজিএমইএ ভবনের চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় কারওয়ান বাজার-হাতিরঝিল রাস্তা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালের দিকে বাড্ডা এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। তারা বাড্ডা-গুলশান লিং রোড দিয়ে গুলশান ১ নম্বর সেকশনে গিয়ে ভাংচুর শুরু করেন। তারা রবি ভবনের নিচতলায় একটি জুতার শোরুম ও কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করেন। এ সময় গাড়ির ধাক্কায় সুমন (১৮), রুবেল (১৫), সাইদুল ইসলাম ( ২২) ও রুমেল (২৭) আহত হন। তাদের গুরুত্বর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময় শ্রমিকদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় আহত হন গুলশান থানার সাব-ইন্সপেক্টর আবু তাহের। এরপরই বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ভাংচুর করেন জব্বার টাওয়ার, পিজাহাটসহ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ ঘটনার পর শ্রমিকদের মাঝে গুজব ছড়িয়ে পড়ে দুইজন শ্রমিক মারা গেছেন। এতে শ্রমিকরা আরো ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। আর এ গুজবকে কেন্দ্র করে রামপুরা, বাড্ডা, মালিবাগ চৌধুরী পাড়া, মালিবাগ রেল ক্রসিং এলাকায় পোশাক শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। ভাংচুর করেন কয়েকটি পোশাক কারখানা। কয়েকটি কারখানায় লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। তারা এ সময় ওই সড়কে দু’টি টেলিভিশনের গাড়িসহ শতাধিক যানবাহন ভাংচুর করেন। শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ কোন ধরনের এ্যাকশনে যায়নি। তবে পুলিশ মালিবাগ রেলগেট থেকে রামপুরার দিকের সড়কটি বন্ধ করে দেয়। দুপুর একটার দিকে ওই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এদিকে সকাল সাড়ে আটটার দিকে মিরপুর-১ নম্বর সেকশন, শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১২ নম্বর সেকশন, মিরপুর সাড়ে ১১-এর কালসি, মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর, মিরপুর-১৩ নম্বর সেকশন, শ্যামলী, কাজীপাড়া এলাকায় পোশাক শ্রমিকরা প্রায় অর্ধশতাধিক যানবাহন ভাংচুর করেন। তারা বিভিন্ন গার্মেন্টসে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে কাজীপাড়া বাসস্ট্যান্ডের কাছে এক্সিম ব্যাংকের সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভাংচুর ও সড়ক অবরোধের ঘটনায় দুপুরে মিরপুর এলাকার সব পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। হামলার সময় পুলিশ মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। দুপুরের পর এ এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। মিরপুর বিভাগের ডিসি ইমতিয়াজ আহমেদ এ ব্যাপারে জানান, পোশাক কারখানাগুলো ছুটি ঘোষণার আশ্বাস পাওয়ার পর পোশাক শ্রমিকরা দুপুর একটার দিকে অবরোধ তুলে নেয়। এছাড়া সকাল সোয়া দশটার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন। তারা এ সময় বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় ইটপাটকেল ছুঁড়েন। ঘন্টাখানেক পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। একইভাবে মহাখালী এলাকায় পোশাক শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও যানবাহন ভাংচুর করেন। ফলে বিমান বন্দর সড়কেও প্রায় দেড় ঘন্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, সাভারের ভবন ধসের ঘটনায় দায়ীদের বিচার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে গাজীপুরের পোশাক কারখানার শ্রমিকরা গতকাল কাজে যোগ না দিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ, নির্বিচারে যানবাহন ভাংচুর ও সড়ক অবরোধ করেন। উত্তেজিত শ্রমিকরা কারখানা, মার্কেট এবং বেশ কিছু যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেন। চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় লাঠিসোঁটা হাতে নিয়ে সড়ক মহাসড়কে মহড়া দিতে থাকেন। এ সময় গোটা এলাকায় আতংকের সৃষ্টি হয়। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ২০-২৫ রাউন্ড টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে কমপক্ষে ২০ শ্রমিক আহত হয়েছেন। প্রথমে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তার আশপাশের ৩০-৪০ কারখানার শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসলেও পরে আশপাশের কারখানার শ্রমিকরাও বের হয়ে এসে আন্দোলনে যোগ দেয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বিক্ষোভ তিনসড়ক, তেলীপাড়া, শালনা, নগপাড়া, নাওজোড়, ভোগড়া, কোনাবাড়ি, কাশিমপুর, হোতাপাড়া, বোর্ডবাজার ও শ্রীপুরে শত শত কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে আটকে থাকা বিভিন্ন যানবাহনের কাঁচ ও মহাসড়কের পাশের দোকানপাট ভাংচুর শুরু করে। তারা ঢিল ছুঁড়ে পোশাক কারখানার কাঁচ ভাংচুর করতে থাকে। মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, কোনাবাড়ি, তেলিপাড়া, ভোগড়া, ও বোর্ডবাজারে টায়ারে আগুন ধরিয়ে উল্লাস করে। ফলে সকাল ৯টা থেকে মহাসড়কে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ছুটি ঘোষণা করা হয় জেলার প্রায় সব পোশাক কারখানায়। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা চান্দনা চৌরাস্তার ভোগড়ায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে হোসেন সরকারের মালিকানাধীন এম এইচ টাওয়ারে এবং পাশে থাকা একটি মোটর সাইকেল ও পিকআপ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে চারতলা টাওয়ার ভবনের নিচ তলায় থাকা এবি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথ ও সাতটি আসবাবপত্রের দোকান পুড়ে যায়। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে দোতলা ও তৃতীয় তলায় থাকা এভেলিন এপারেলস কারখানায়। খবর পেয়ে পুলিশ প্রহরায় ফায়ার সার্ভিস আসলে শ্রমিকদের বাধার কারণে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। দুই ঘন্টা পর অতিরিক্ত পুলিশের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ততক্ষণে সবকিছু পুড়ে শেষ হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ইসলামপুর এলাকায় জিকে স্পিনিং কারখানায় ও চান্দনা চৌরাস্তায় শাপলা ম্যানশনের সামনে একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ পরিস্থিতিতে জয়দেবপুর-চৌরাস্তা এলাকার বিভিন্ন মার্কেট ও বিপণী বিতান বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা চান্দনা চৌরাস্তার গাজীপুর সড়কের মাথায় বৈদ্যুতিক খুঁটি ও সিমেন্টের পিলার ফেলে সড়ক অবরোধ করে। পুলিশ শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে চাইলে উভয়ের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে ২০ জন আহত হয়েছে বলে শ্রমিকরা দাবি করেছেন। অন্যদিকে ব্যাপক হারে যানবাহন ও বিভিন্ন শিল্প কারখানা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে পোশাক শ্রমিকদের ধাওয়া করে বলে জানা গেছে। পুলিশ ও পরিবহন শ্রমিকদের তীব্র বাধার মুখে পোশাক শ্রমিকরা মহাসড়ক থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। পরে বেলা সাড়ে বারটার দিকে ওই সড়ক তিনটিতে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার শ্রমিকদের তাণ্ডবের ঘটনায় রূপগঞ্জ, সদর উপজেলার ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে পৃথক দুটি মামলা এবং একটি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে রূপগঞ্জে শরীফ মেলামাইন কারখানায় আগুন ও ভাংচুর করে লুটপাটের ঘটনায় অজ্ঞাত ১০ হাজার শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আর ফতুল্লায় অর্ধশত গার্মেন্টসে ভাংচুরের ঘটনায় অজ্ঞাত ৪০০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। এছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী ইপিজেডে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনায় থানায় জিডি হয়েছে। তবে পুলিশ গতকাল পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করেনি। কালিয়াকৈর সংবাদদাতা জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ না করায় শুক্রবার সকালে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। এসময় আশপাশের ১০/১২টি কারখানার প্রায় ৫ শতাধিক শ্রমিক লাঠিসোটা নিয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ২০/২৫টি যানবাহন ভাংচুর করে। শ্রমিকদের এই তাণ্ডবে সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে ও যান চলাচল স্বাভাবিক করে।