পোশাক শিল্পে অশনি সংকেত
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩৮
সাভারের রানা প্লাজা ধসে ওই ভবনে অবস্থিত গার্মেন্টসগুলোতে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার খবরটি ফলাও করে প্রচার হওয়ায় বিদেশি ভোক্তারা বাংলাদেশি পোশাক ক্রেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। বিভিন্ন বিদেশি শ্রমিক সংগঠনও বাংলাদেশ থেকে পোশাক না কিনতে নিজ নিজ দেশের ক্রেতাদের চাপ দিচ্ছে বলে জানা গেছে। যা দেশের তৈরী পোশাক শিল্পের জন্য ‘অশনি সংকেত’ বলেই মনে করছেন অনেকে।
জানা গেছে, সাভারে যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে বিদেশি ক্রেতারা কাজ করাতেন তাদের স্টোরের সামনে অনেক ভোক্তা বিক্ষোভ করেছেন। কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং নিউইয়র্কে এই বিক্ষোভ হয়েছে। তাদের সাথে স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনগুলোও যোগ দিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিএমইএ’র একজন কর্মকর্তা বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, বড় বড় ক্রেতারা একবারে সারা বছরের পোশাকের অর্ডার দিয়ে থাকে। চলতি বছরের অর্ডার শেষ হবার পর সামনের বছরে চুক্তির সময় দেখা যাবে হয়তো অনেক অর্ডার কমে গেছে। তাই বিষয়টি আসলেই কতটা প্রভাব ফেলেছে তা জানতে আমাদের আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিককালে চীন, ভিয়েতনাম,কম্বোডিয়া, শ্রীলংকা এবং তুরস্কের মতো দেশগুলোতে তৈরী পোশাকের উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। ওইসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের উত্পাদন খরচ কম পড়ে। এছাড়া গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা তাদের পণ্যের বহুমুখীকরণও করেছেন। একসময়ে বাংলাদেশ থেকে মাত্র কয়েক ধরনের পোশাক রপ্তানি হলেও এখন এর সংখ্যা হাজারেরও ওপরে। বড় বড় বিদেশি ক্রেতারা তাই দ্রুততার সাথে পোশাক তাদের স্টোরে পাঠিয়ে দিতে ঢাকায় অফিস খুলেছেন। অর্ডারও আসছিলো প্রচুর। কিন্তু গেল নভেম্বরে ঢাকার অদূরে তাজরিন ফ্যাশন্স কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক প্রাণহানির ঘটনা দেশের তৈরী পোশাক শিল্পের ভিত নাড়িয়ে দেয়। এরপর চলে টানা রাজনৈতিক অস্থিরতা। সর্বশেষ রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে এই শিল্প যে আরো বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়বে-তা বলাই বাহুল্য।
ইতিমধ্যে নিউইয়র্কভিত্তিক বহুমাত্রিক গণমাধ্যম ‘ব্লুমবার্গ’ তাদের রিপোর্টে বলেছে, বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি গার্মেন্টস কারখানার কর্মপরিবেশ নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের বেসরকারি সংস্থা ‘সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি’র নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার ব্লুমবার্গকে বলেন, রানা প্লাজা ধসে পড়েছে, আরো অনেক ভবন ধসের অপেক্ষায় আছে। গণমাধ্যমটির মতে, ভবন ধসের ঘটনা বাংলাদেশের শিল্প নিরাপত্তা রেকর্ডে আরো একটি কালো দাগ টেনে দিয়েছে। গত নভেম্বরে বিশ্বখ্যাত খুচরা বিক্রির প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট বাংলাদেশের যে কারখানায় কাজ করাতো সেখানে অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত (রানা প্লাজা ধসের আগে) বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ৭শ’-এরও বেশি গার্মেন্টস শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন।
ওয়াশিংটন ভিত্তিক সংগঠন ‘ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম’ এর নির্বাহী পরিচালক স্কট নোভা ব্লুমবার্গকে বলেন, বিশ্বব্যাপী যে শ্রমিক সংগঠনগুলো আছে তারা সবাই গত কয়েকবছর ধরে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝাতে চেয়েছে যে, বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানার কর্মপরিবেশ অত্যন্ত নিম্নমানের। কিন্তু ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে কোনসময় ইতিবাচক বক্তব্য দেয়নি।
তৈরী পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, চীন, তুরষ্ক, শ্রীলংকা, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামে পোশাকের উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় গত একবছরে বিশ্বখ্যাত ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তাদের অফিস খুলেছে। ওয়ালমার্ট, জেসি পেনি, জারা, টেসকো, আইকেইএ, মার্কস এন্ড স্পেন্সার, এইচ এন্ড এম, জি-স্টার, ইউনিকলো প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের অর্ডার বাড়িয়েছে। স্প্যানিশ সাপ্লাই চেইন ইন্ডিটেক্স গ্রুপ তাদের আটটি বিখ্যাত ব্রান্ডের জন্য বাংলাদেশে পোশাকের অর্ডার বাড়িয়েছে। কিন্তু ভবন ধসে ব্যাপক প্রাণহানির পর ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ থেকে পোশাক কিনবে কিনা তা দ্বিতীয়বার চিন্তা করছেন।
বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদি এ বিষয়ে বলেন, তাজরীন ফ্যাশন্স এর অগ্নিকাণ্ডের পর বহির্বিশ্বে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিলো। আমরা নানাভাবে তা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করেছি। কিন্তু মাঝখানে হরতালসহ নানা রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। আর রানা প্লাজা ধসের পর নেতিবাচক প্রভাব আরো বেড়েছে। তবে তিনি বলেন, এটা কাটিয়ে উঠতে আমাদের কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুন কারখানাকে সদস্যপদ দেয়ার ক্ষেত্রে কারখানা ভবনের প্লান পাস করা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার চিন্তাভাবনা চলছে বলে তিনি জানান।
জানা গেছে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান প্রিমার্ক-এর জন্য রানা প্লাজার তৃতীয় তলার একটি গার্মেন্টস কারখানা পোশাক সরবরাহ করতো। সম্প্রতি বহুল প্রচারিত দি গার্ডিয়ান পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রম অধিকার সংগঠনগুলো গার্মেন্টস ভবন ইন্সপেকশনের জন্য যে পরিকল্পনা তৈরী করেছে তাতে প্রিমার্ককে যুক্ত হবার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রিমার্ক বিষয়টি নিয়ে গড়িমসি করছে। প্রিমার্কের পরিচালক পিটার এমসি এ্যালিষ্টার এ ব্যাপারে গার্ডিয়ানকে বলেন, কারখানাগুলোর নিরাপত্তা কিভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে গত নভেম্বর মাস থেকে কোম্পানি কাজ করে যাচ্ছে। তবে সরকারের হস্তক্ষেপ না থাকায় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো গার্মেন্টস ভবনের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করতে পারছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন। এদিকে গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্ক টাইমস তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, কাজের পরিবেশ উন্নত করার ক্ষেত্রে ইউনিয়ন কি ভূমিকা রাখতে পারে- তা আবারো প্রমাণ হলো। বাংলাদেশে রানা প্লাজা ধসে পড়ার ঘটনাই প্রমাণ করে যে, শক্ত ইউনিয়ন থাকলে এতগুলো জীবন হয়তো রক্ষা করা যেতো। কারণ যেসব শ্রমিক ভবনটিতে ফাটল ধরার ঘটনা নজরে এনেছিলো তাদের বহিষ্কার এবং বেতন না দেয়ার ভয় দেখিয়ে কাজে ফেরত পাঠানো হয়েছিলো।
‘এনাদার প্রিভেন্টেবল ট্রাজেডি ইন বাংলাদেশ’-শীর্ষক ওই সম্পাদকীয়তে আরো বলা হয়েছে, ‘বিল্ডিং সেফটি কোড’ মেনে চলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। যে খাত থেকে বছরে ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়, সে খাতের স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য নিরাপত্তায় দেশটি যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করতে পারে বলে সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করা হয়েছে।