মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জীবনের সন্ধান
আবুল খায়ের, সাভার থেকে ফিরে
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৫০
বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই, ভেতরে মানুষকে বাঁচাবার জন্য কী অমানুষিক পরিশ্রম করে চলেছেন সবাই। ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, সেনাবাহিনীর সদস্য- সবাই তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে চালাচ্ছেন উদ্ধার কাজ। তারা ধসে পড়া ভবনের এমন সব স্থানে পৌঁছে গেছেন, যেখানে বাতাস ঢুকছে না। মেশিনের সাহায্যে অক্সিজেন পাঠাতে হচ্ছে উদ্ধার কর্মীদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য। ধসে পড়া ভবনটির কোন একটি অংশ যদি সরে যায়, এসব উদ্ধারকর্মীও আর ফিরে আসতে পারবেন না। জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন তারা। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে চলছে জীবনের সন্ধান।
জীবিত মানুষের সন্ধান পেতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন সবাই। আরো তিনজনের সন্ধান পাওয়া গেছে। উদ্ধারকারী দলের অফিসারকে এসে জানালেন একজন ইন্সট্রাক্টর। তারা প্ল্যান করছেন কীভাবে তাদের বের করে আনা যায়। ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর কর্মীরা প্রতিটি ফ্লোরের ছাদ কেটে পৌঁছে গেছেন দোতলায়। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীদের প্ল্যান হল- ওপর থেকে যে ১২টি পয়েন্ট নিচে পৌঁছেছে তা ধীরে ধীরে এক জায়গায় নিয়ে আসা।
সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটা লাশ তুলে এনেই তীব্র গন্ধে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন ফায়ার সার্ভিসের একজন উদ্ধার কর্মী। তিনদিনে লাশ ফুলে উঠেছে, দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। কয়েকজন উদ্ধার কর্মী লাশটিকে এম্বুলেন্সে তুলে দিয়েই অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কর্মীর মাথায় পানি ঢালতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একটু পরেই জ্ঞান ফিরে আসলো সেই তরুণ উদ্ধার কর্মীর। তাকে হাসপাতালে পাঠাতে চাইলে তিনি বলে উঠলেন, একজন মানুষ জীবিত থাকা পর্যন্ত এখান থেকে যাবো না।
গতকাল সন্ধ্যায় কথা হয় এই উদ্ধার তত্পরতার নেতৃত্ব প্রদানকারী ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক মেজর মাহবুবুর রহমান ও মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজের সঙ্গে।
মেজর মাহবুবুর রহমান বলেন, রানা প্লাজার বিভিন্ন দিক দিয়ে ২২ পয়েন্টে উদ্ধার কাজ চলছে। স্থানীয় মানুষের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিস আর সেনাবাহিনীর সদস্যরা এক অসাধ্য সাধন করছেন। ভবনটি এখনো যে রকম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে তাতে আবার একটি দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু সবাই জীবন বাজি রেখে উদ্ধার কাজ চালাচ্ছেন।
মেজর শাকিল জানান, উদ্ধার তত্পরতায় আমাদের হালকা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হচ্ছে। ইচ্ছে করলেই ভারি যন্ত্র ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কারণ, ভবনটি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও আমাদের যন্ত্রপাতির সরবরাহ খুব কম। কিন্তু উদ্ধারকর্মীদের আন্তরিকতা সব বাধা দূর করে দিচ্ছে। তিনি হাইতিতে সাতদিন পর্যন্ত উদ্ধার অভিযানের উদাহরণ টেনে বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে ততক্ষণ উদ্ধার তত্পরতা চলবে।
সেনাবাহিনীর অপর এক সদস্য জানালেন, তিন দিন আগে রানা প্লাজার ছাদের যে ফাটল তিন ইঞ্চি চওড়া ছিল এখন সেই ফাটল পাঁচ ইঞ্চিতে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে যে কোন সময় আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু অন্যের জীবন বাচাঁনোর শপথ নিয়েছি আমরা। পিছু হটার প্রশ্ন নেই।