ডলার আয়ের হাতে এখন মাছি
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৩, ২৩:০২
ডলার আয়ের হাতে এখন ভন ভন করছে মাছি! অফুরন্ত খাবারের সন্ধানে ঘুরে ফিরছে এরা। বাতাসে গন্ধ শুকে শুকে পথ চিনে এসে জড়ো হয়েছে সাভারের ধসে পড়া ভবনের ধংসস্তূপে। যে হাতের ছোঁয়ায় তৈরি পোশাক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ এখনো শরীরে নিয়ে ঘুরছে। সে হাতে এখন মাছি খুঁজে ফিরছে তার খাদ্য। যে হাত দুইদিন আগেও দেশের জন্য ডলার আয় করত, যে ছিল বাংলাদেশের আয়ের উল্লেখযোগ্য একটি হাত, সেই হাত আজ নিশ্চল, অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
গতকাল শনিবার দুপুরের দিকে ভবনের মাঝামাঝি গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা গেল। ভবনের পাশের ভবন দিয়ে দোতলা পর্যন্ত সিঁড়ি মাড়াতেই চোখে পড়লো কালো লম্বা চুলগুলো এলানো। যেন অল্প একটু চিরুনীর আচড় দরকার। অল্প অল্প সাদা ধুলো পড়েছে। বাতাসে দুলছে চুলগুলো। নিচের দিকে মুখ করা। ব্লাউজের পিঠের কাজটা কালো আর লাল মেশানো কোন রং। হাত দুটো সামনের দিকে মেলে ধরা। এক হাতে দুটো চুড়ি। সেই হাতে ঘুরে ফিরে এসে বসছে অসংখ্য মাছি। সুগন্ধি স্প্রে করেও তাদের তাড়ানো যাচ্ছে না। যেন মাটি দিয়ে কোনো কারিগর মূর্তি বানিয়ে রেখে দিয়েছে। কোনো নড়া-চড়া নেই। এমন ভাবে রক্ত জমাট হয়ে হাত দুটো কালো হয়ে আছে যে, বোঝার উপায় নেই এটা আসল না সত্যিই মাটির তৈরি কোনো মূর্তি। পুরো শরীরটা ভবনের মধ্যে ঢুকে আছে। বের হয়ে আছে শুধু লম্বা চুলগুলো।
তার পাঁচ ছয় ফুট পশ্চিমে কোমর থেকে পা পর্যন্ত ঝুলছে একজন। কালো প্যান্ট পরা। পায়ে জুতা নেই। উপুড় হয়ে আছে। তার পাশে একজন আছেন আকাশের দিক তাকিয়ে। অর্ধেক জিভ বের করা। যেন লজ্জা পেয়ে দাঁতে কামড় দিয়েছেন! সাদা শার্টে ধুলোর ছিটে-ফোঁটা। খোলা চোখে যেন কোনো অভিযোগ নেই। শান্ত, সরল চাহনি। ছড়িয়ে থাকা রডের মধ্য দিয়ে পা থেকে হাঁটু পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। ফোঁটা ফোঁটা রক্তও পড়ছে মনে হলো। যে পোশাক সে নিজে বানিয়ে রেখেছিল অন্যের পরার জন্য, সে পোশাকেই পড়ছে তার রক্ত। বাকি শরীর ভবনের সাথে মিশে আছে।
খালি চোখে এমন দৃশ্যই দেখা গেল ভবনটির ধংসস্তূপে। আর যারা বুকে অদম্য সাহস নিয়ে একটু ইট সিমেন্ট সরিয়ে ভবনের দু-পাঁচ ফুট ভেতরে যাচ্ছেন তারা ফিরে এসে বলছেন, থরে থরে সাজানো আছে লাশ। খাঁজে খাঁজে পচা গন্ধ। পচে গলে রং বদল হয়ে গেছে সব। মাছি দেখে সহজে অনুমান করা যাচ্ছে লাশের উপস্থিতি। এসব জায়গার আশপাশে উদ্ধারকর্মীরা শনিবার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন নি।
সাভারের রানা প্লাজার পাশের ভবনটির চার তলা থেকেই মূল উদ্ধার কাজ চলছে। যে যেখানে পারছেন খোঁজার চেষ্টা করছেন। ছোট হাতমাইক নিয়ে বা একটু ভেতরে ঢুকে শোনার চেষ্টা হচ্ছে— ভেতরে কেউ আছে কিনা। বলা হচ্ছে, ভেতরে কেউ কি আছেন...? কেউ কি শুনতে পাচ্ছেন...? ভেতরে কেউ থাকলে আওয়াজ করুন...। কিম্বা কিছু দিয়ে শব্দ করুন...; কিন্তু না কোন শব্দ আর শোন গেল না। তার ঠিক পাশেই কোনো শব্দ শুনছেন কেউ। তাহলে প্রাণের স্পন্দন আছে। এই আশায় স্বেচ্ছাসেবীরা সাথে সাথে ইট সরানো শুরু করে দিলেন। পুরো ভবনের চারপাশের বিভিন্ন স্থানে এভাবেই উদ্ধার কাজ চলছে।
ভবনের ভেতরে যারা যাচ্ছেন তাদের প্রায় সকলেই সাধারণ স্বেচ্ছাসেবী। বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। পচা লাশের গন্ধ আর অক্সিজেনের স্বল্পতা মেনে নিয়েই তারা ভেতরে ঢুকছেন। শনিবার পর্যন্ত বিভিন্ন স্থান থেকে ‘আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান’ আওয়াজ পাওয়া গেছে বলে কয়েকজন উদ্ধারকর্মী জানালেন। ওরা অদম্য। তাই কোনো বাধা না মেনে কাজ করছেন। ধসে যাওয়া ভবনটির সামনে স্বেচ্ছাসেবীরা নানা কাজে ব্যস্ত। কেউ পানি দিচ্ছেন। কেউ ওষুধ। কেউ সরবরাহ করছেন ইট কাটা যন্ত্র। কেউ ব্যস্ত আছেন কাফনের কাপড় তৈরিতে।
উদ্ধার কার্যক্রম দেখে মনে হলো শোকের মধ্যেও যেন আনন্দ খুঁজছেন অদম্য উদ্ধার কর্মীরা। যখনই হূদস্পন্দন, তখনই খুশির ঝিলিক। জীবিত, জীবিত, জীবিত। উদ্ধারকর্মীরা এমন আনন্দে চিত্কার করছেন যেন জীবনের সবচেয়ে বড় হারানো ধন খুঁজে পেয়েছেন। দেখা গেল, সামনে একজন বাঁশি দিয়ে আগে পথ পরিষ্কার করছেন। স্ট্রেচারে কাউকে আনা হচ্ছে। হ্যাঁ জীবিতই তো। ২০ বা ২২ বছর বয়স হবে। স্ট্রেচার থেকে মাথাটা উঁচু করে দেখার চেষ্টা করছেন। প্রায় তিন দিনের জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন তিনি। পাশের ভবনের চার তলা থেকে তাকে নামিয়ে আনা হয়েছে। নতুন আলো দেখে যেন নতুন জীবনের সন্ধান করছেন তিনি। চোখগুলো বড় বড় করে তাকানোর ভঙ্গি দেখে মনে হলো কোনো নবজাতক যেন নতুন করে দুনিয়াকে দেখছে!