বাংলাদেশ গেমসের গর্ব ওরা
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:৩৯
শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশ গেমস। এই গেমসে অংশ নিয়েছিলেন অনেক নারী অ্যাথলেট। নিজেদের প্রতিভাগুণে তাদের মধ্যে অনেকেই উঠে এসেছেন আলোচনা এবং সফলতার শীর্ষে। আমাদের দেশের নারী অ্যাথলেটদেরকে অনেক বেশি পরিশ্রম আর প্রতিকুলতা অতিক্রম করে নিজের খেলাটা ধরে রাখতে হয়। তাই অ্যাথলেটিক্সে নারীদের অংশগ্রহণ একটি আশাপ্রদ ঘটনা। বাংলাদেশ গেমসের চারজন তারকা অ্যাথলেটকে নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদনটি লিখেছেন— সোহেল সারোয়ার চঞ্চল
ফিরোজাকে ছোঁয়ার লক্ষ্য বিউটির
বাংলাদেশ গেমস অ্যাথলেটিকসে নীরবেই ঘটে গেল এমন একটি রেকর্ড। এক সময়ের তারকা অ্যাথলেট সুলতানা পারভীন লাভলী বেগমের রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছেন নাজমুন নাহার বিউটি। এবার বাংলাদেশ গেমসে সেই খেতাবটা ভেঙ্গে দিয়েছেন বিউটি। ২০০ মিটার স্প্রিন্টের খেতাব হারানো বিউটি একদিন পরই ১০০ মিটার স্প্রিন্টে খেতাব তুলে নিয়েছেন। সামনে দাঁড়িয়েই এই দৃশ্য দেখেছেন লাভলী বেগম। তিনি তো বিউটির ইভেন্টেরই বিচারক ছিলেন। নিজের চোখে দেখলেন কিভাবে ইলেক্ট্রনিক টাইমিংয়ের উপর ভর করে সেরা আসনে বসে গেলেন। আটবার দেশের দ্রুততম মানবী হলেন বিউটি। পৃথিবীর ক্রীড়াঙ্গনের এটাই নিয়ম। একজন যাবেন আরেকজন আসবেন। বিউটির অবশ্য গোপন ইচ্ছটা আরো বড়। নয়বার এদেশের দ্রুততম মানবী হওয়ার খেতারবটা ফিরোজা বেগমের। সেই আসনটা নিজের নামে লেখাতে চান বিউটি।
বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ১০০ মিটার স্প্রিন্ট শেষ করে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন বিউটি। জানালেন, পায়ে ব্যথা নিয়েই তিনি সিপ্রন্ট শেষ করেছেন। লেখাপড়ার চাপ। তার মধ্যেও মাঠে অনুশীলন করা অতঃপর স্বর্ণ জয়। অ্যাথলেটিক ট্র্যাকে স্বর্ণ পদক যেন বিউটির নামেই লেখা। আগের দিন ২০০ মিটারে পারলেন না। পরদিন আরো কঠিন ইভেন্ট ১০০ মিটার ইভেন্টা কিভাবে করলেন বিউটি? জবাব তার সোজা, জেদ, জেদ। আগেই বলেছি না এটা আমি নিব। ২০০ মিটার পারিনি। কারণ চোখটা ছিল ১০০’র দিকে।
অ্যাথলেটিক্সে বিউটি এখন রাজত্ব করছেন মেয়েদের মধ্যে। তার স্বর্ণ জয় যেন বলে কয়ে করা। ল্যান্ডমার্ক স্পর্শ করার সাথে সাথে টেলিভিশন সাংবাদিকরা ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিউটির কথা জানতে। সবই বলা হয়, লেখা হয়। কিন্তু এতো কিছুর পরও বিউটির মনে অনেক আক্ষেপ। এতো প্রচার বাস্তবে তার কোনো কাজে আসে না। একেবারেই দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা। তার কোচ রফিকউল্ল্যা মিলনের বাসায় থেকে আজকের অ্যাথলেট বিউটির জন্ম। প্রতিভাবান এই অ্যাথলেট একটা ভালো
প্রশিক্ষণ। বিদেশে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার মতো উদ্যোগ নেয়নি ফেডারেশন। উন্নত প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করলে বিউটি হয়তো এসএ গেমসে ভালো কিছু করতে পারতেন। তারপরও নোয়াখালীর এই সোনার মেয়ে বিউটির কোনো অভিমান নেই। রাগ ক্ষোভ নেই। আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, হেতাগো লগে রাগ করি কি অইব। আঁর খেলা আঁরই খেলোন লাইগব।’
---
টিটির সোনার মেয়ে সোমা
টেবিল টেনিসের এই মেয়েটিকে অনেকেই অলরাউন্ডার মনে করেন। কারণ টেবিলের খেলায় তার যেমন হাত তেমনি তার সৌন্দর্য। নজরকাড়া পারফরম্যান্স করে যাচ্ছেন টিটির তারকা সোনম সুলতানা সোমা। বাংলাদেশ গেমস টিটিতে আনসারের হয়ে সোমা একটি ম্যাচও হারেনি। একক ইভেন্টে সব ম্যাচ জিতে সোনার পদক ঘরে নিয়েছেন। জাতীয় টিটিতে গত দুই বারের চ্যাম্পিয়ন সোমা অনেকের কাছে আইডল। উডেন ফ্লোর জিমনেসিয়ামে যারা টিটির অনুরাগী। তাদের কাছে প্রিয় মুখ সোমা। অনেকের প্রিয় এই খেলোয়াড়টি উডেন ফ্লোরে এসে সবার সাথে খুব বেশি কথা বলেন না। নিজের খেলাটা নিয়েই ধ্যানমগ্ন থাকতে দেখা যায় তাকে। টেবিল টেনিস তারকা জোবেরা রহমান লীনুদের পথ ধরে এগিয়ে আসা তারকা সোমার পারফরম্যান্সের পাশে এখন কেউ নেই। ’৯৭ সালে প্রথমবার টিটিতে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এই ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে চারটি সোনার পদক আছে তার ঝুলিতে। তার অনুরোধ সরকারের কাছে, পুনরায় এই পুরস্কার প্রবর্তন করা হলে প্রতিভাবান কিছু টিটি খেলোয়াড় উঠে আসার সুযোগ পেতো।’ এই ২০০৩ সালে যশোর ক্রীড়ালেখক সমিতির পুরস্কার প্রাপ্ত ক্রীড়াবিদ সোমা ১৮ বছরের বেশি সময় কেটে গেছে টিটির ফ্লোরে। খেলছেন জাতীয় টিটি জাতীয় দলেও। ২০১০ সালে এসএ গেমস টিটিতে দলগত ব্রোঞ্জ, অনূর্ধ্ব-১৮ সাফ টিটিতে সেমিফাইনাল খেলেছে ডাবলসে। তিনবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন, আর অনেকবার লীগ চ্যাম্পিয়ন আবাহনী ও বিমানের হয়ে খেলেছেন সোমা।
অনেক আগেই সংসারী হয়েছেন ক্রীড়াঙ্গনেরই এক পাত্রের সাথে। কিন্তু খেলাটা বাদ দেননি। সন্তানের মা হয়েছেন। অনেকেই মনে করেছিলেন সোমার ক্যারিয়ার শেষ। কিন্তু তাদের মুখে ছাই দিয়ে সোমা যেন আগের অগ্নিমূর্তি নিয়েই ফিরে এসেছেন টেবিল টেনিস বোর্ডে। সাফল্যের পর সাফল্য তুলে নিয়ে নিন্দুকের মুখে ছাই ঢেলে দিয়েছেন। সাত বছরের পুত্র সন্তান ইভান, স্বামী, সংসার, শাশুড়ীর সেবা করে এসে মাঠের লড়াইয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছেন। কিন্তু সবার পক্ষে এটি সম্ভব না। অনেক কঠিন কাজ। সাধনা করেন বলেই টিটিতে সোমার এই সাফল্য।
আগামী মাসে বিশ্বকাপ টেবিল টেনিসে খেলতে ফ্রান্স যাবেন। তার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাংলাদেশের কোনো আশা নেই। তাই বলে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকতে রাজি না সোমা। দেশের কথা মাথায় রেখে যতটা সম্ভব ভালো খেলা যায় তার প্রতিশ্রুতি সোমার কণ্ঠে।
----
বিকেএসপির উজ্জ্বল মুখ ঈষিতা আফরোজ
টেনিসের এককে স্বর্ণ জয় করে ঈষিতা আফরোজ এখন সবার নজরে এসে গেছেন। এসএসসি পরীক্ষা দেয়া এই মেয়েটি বিকেএসপির উজ্জ্বল মুখ। টেনিসের আরেক কন্যা যিনি এককে রাজত্ব করছিলেন, সেই শারমিন আলম সারদাকে হটিয়ে দিয়েছেন। অথচ গেমস শুরু আগে এই ভাবনা ছিল না। স্বর্ণপদক জয় করে বিকেএসপির টেনিসের রানী হয়েছেন ঈষিতা আফরোজ। এই মেয়েটি দেশের শেষ প্রান্ত থেকে এসেছেন। হাতীবান্ধা থানা। যেখানে খেলাধুলাটা খুব বেশি জাঁকজমক নয়। তারপরও নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের নজরে পড়েছেন। বাবা রমজান আলী স্কুল শিক্ষক, মা লাভলী বেগম গৃহিণী। বাবার স্বপ্ন নিয়ে ২০০৬ সালে ঢাকায় এসে বিকেএসপিতে ভর্তি হয়েছেন। কোচরা জানালেন ঈষিতার ফোরহ্যান্ড দারুণ। ব্যাকহ্যান্ডও দেখার মতো। সময় সুযোগ পেলে সারাপোভা, সেরেনা, নাদাল, জেকোভিচ, রজার ফেদেরার খেলা দেখে শেখার চেষ্টা করেন। সারাপোভাকে অনুসরণ করেন। কারণ তার খেলাটা বেশি ভালো লাগে ঈষিতার। বললেন, আমি সারাপোভাকে অনুসরণ করি। তা স্টাইলটা ভালো লাগে।’ ঈষিতা সঠিক পরিচর্যা পেলে টেনিসে জায়গা করে নিতে পারবে। বাংলাদেশ তো জুনিয়র ডেভিস কাপ বাছাইয়ে খেলছে সব সময়। কিন্তু বেশি দূর আর যেতে পারল কোথায়। ঈষিতার মতো মেয়েরা যদি সঠিক যত্ন পায় তাহলে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে জায়গা পাওয়া বাংলাদেশের জন্য অসম্ভব কিছু না। এইটুকু বলা যায় কোনো বাধা আটকাতে পারবে না ঈষিতার মতো প্রতিভাদের।
অজপাড়া গাঁ থেকে আসা মেয়েটির ভেতরে প্রতিভার স্ফুরণ দেখেছেন বিকেএসপির কোচরা। পরম যত্নে লালন করে নিজেকে আগামীদিনের টেনিস তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। কিন্তু ভয় হয়। কারণ ইনজুরি না আবার পেয়ে বসে এই খেলোয়াড়কে। কারণ জাতীয় টেনিসের গত আসরে খেলতে পারেননি তিনি।
----
দশম শ্রেণির নাজমা সেরা সাঁতারু
দশম শ্রেণির ছাত্রী নাজমা খাতুন। বাংলাদেশ গেমস সাঁতারে সেরা সাঁতারুর খেতাব মাথায় নিয়েছেন। নাজমা চাকরি করেন নৌবাহিনীকে। সাঁতারু নাজমার দিকে অনেকেরই নজর ছিল না। বাংলাদেশ গেমসটা যখন শুরু হয় তখন সবার দৃষ্টি ছিল অন্যদের দিকে। নাজমা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে সেরা তালিকায় নিজের নামটা লিখেছেন। ব্যক্তিগত চারটা স্বর্ণ, রীলেতে তিনটা স্বর্ণ এবং রৌপ্য তিনটাসহ ১০টি পদক গলায় ঝুলছে তার। কুষ্টিয়ার আমলা গ্রামে তার জন্ম। এইটুকু জীবনের পথচলায় নানা ঘাত-প্রতিঘাত তাকে সইতে হয়েছে। কিন্তু সেটা এখন আর বাইরের আলোয় আনতে চান না নাজমা খাতুন। কথায় বেশ চটপটে মেয়েটি। বললেন, ‘অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছি। এখন আর কোনো কষ্ট, কষ্ট মনে হয় না। এখন অনেক সুখে আছি, ভালো আছি।’ বললেন, ‘বাংলাদেশ গেমসে এসেই সেরা সাঁতারু হয়েছি। এটা আমার জন্য অনেক আনন্দের।’
বাবা জামালউদ্দিন একজন কৃষক, মা নাসিমা বেগম গৃহিণী। এক ভাই, এক বোনের পরিবারে নাজমার বেড়ে উঠা। কোনো সুইমিংপুলে সাঁতার শেখেনি সাফল্য পাওয়া নাজমা। তিনি তার গ্রামের আমলা ডিগ্রি কলেজের পুকুরে সাঁতার শিখেছেন। যেখানে মাছ চাষ হয়। মাছের সাথে খেলা করার অনেক স্মৃতি আছে মেয়েটির। সাঁতার শিখতে গিয়ে বকা শুনতে হয়েছে কোচের। তারপরও মনোবল হারাননি কখনো। কারণ নাজমা জানতেন ঢাকায় খেলার সুযোগ পেলে সেখানে ভালো করলে উপরে উঠা যাবে। নৌবাহিনীতে নাজমা খাতুন এখন ১৫ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন। তার জন্য এটা আনন্দের। টাকা পাঠান বাবা-মাকে। নিজের জন্য রাখেন। একটা সময় ছিল যখন হাতে এক সাথে এতো টাকা আসেনি। আর এখন নাজমার মূল্য দিনে দিনে বাড়ছে। ইচ্ছে আছে অনেক বড় সাঁতারু হবেন তিনি। নাজমা বলছিলেন ‘ভাই নৌবাহিনীর কথাটা ভালো করে লিখবেন। কারণ আমি এখানে ভালো আছি। আগে পুকুরে সাঁতার কাটতাম। এখন পুলে শিখছি।’