পাকিস্তানে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র আসবে কি
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২২
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর প্রথম কোনো বেসামরিক সরকার তার ক্ষমতার মেয়াদ পূর্ণ করেছে। দেশটিতে সেনাবাহিনী এবং বেসামরিক পক্ষের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বন্দ্বের কারণে দেশটিতে কোনো প্রতিষ্ঠানই শক্তিশালী হয়নি। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে প্রথমবারের মতো দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হবে। কিন্তু আশঙ্কা দেখা দিয়েছে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে কিনা। তেহরিক-ই-তালেবানসহ দেশটির বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী নির্বাচনে ভোট না দেয়ার আহবান জানিয়ে হত্যার হুমকি দিয়েছে। নারীরা সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারবেন কিনা তা নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা। নাগরিকদের একটা অংশ চায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট। ধর্মীয় দলগুলো বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমানের গণতন্ত্রের প্রতি অনেকেই বীতশ্রদ্ধ। সবাই চায় প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বহু সমস্যায় জর্জরিত পাকিস্তানে আদৌ প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র আসবে কিনা তা নিয়ে মতভেদ আছে।
আগামী ১১ মে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মীয় দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ঐক্যবদ্ধ থাকায় ইসলামী দলগুলো ২০০২ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ৫৯টি আসন লাভ করে। ৩১ লাখ ৮১ হাজার ৪৮৩ ভোট পায় তারা। ওই সময় দলগুলো মুত্তাহিদা মজলিস-ই-আজমল নামে একটি প্লাটফরমে ঐক্যবদ্ধ হয়। দলগুলোর মধ্যে ছিল জামায়াত-ই-ইসলামী, মাওলানা ফজলুর রহমান এবং মাওলানা সামিউল হকের জামিয়াত উলেমা-ই-ইসলাম, জামিয়াত উলেমা-ই-পাকিস্তান নুরানি, সাজিদ মিরের জামায়াত আহলে হাদিস এবং আল্লামা সাজিদ নাকভির তেহরিক-ই-ইসলামী। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ঐক্যের অভাবে দলগুলোর ভোট কমে যায়। সমপ্রতি জামায়াত-ই-ইসলামী এবং জামিয়াত উলেমার মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা গেছে। একে অপরের দোষারোপ করছে। জামিয়াত উলেমা-ই-ইসলাম এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, জামায়াত-ই-ইসলামী পশ্চিমাদের অর্থে পরিচালিত হচ্ছে এবং ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি শুরু করেছে। অন্যদিকে জামায়াত ইসলামীর অভিযোগ, জামিয়াত উলেমা-ই-ইসলাম এখন বিত্তশালীদের দল। ঐক্যবদ্ধতার ক্ষেত্রে উলেমাকে দোষারোপ করে বলেছে, দলটি এখন আর ধর্মীয় পন্ডিত এবং আলেম-ওলামাদের দল নয়। তারা মনোনয়ন দেয় ধনীদের। তবে প্রত্যেক ইসলামী দলই বলছে তাদের পক্ষে জনসমর্থন বেশি। তাই তারা জোট গড়ে তোলেননি। খাইবার পখতুনওয়া, পেশোয়ার, সোয়াত, ফাতা এলাকায় দলগুলোর ভোট বেশি ছিল। তাদের মধ্যে বিরোধের কারণে ইমরানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ সুবিধা করতে পারে।
সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা সহিংসতা:পাকিস্তানের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান গণতন্ত্রকে ইসলাম-বিরোধী উল্লেখ করে প্রকাশ্যে লিফলেট বিলি করে নির্বাচনে ভোট না দেয়ার আহবান জানিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি), আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি (এএনপি) এবং মুত্তাহিদা কাওমী মুভমেন্টকে (এমকিউএম) হুমকি দিয়েছে। ফলে এসব দলের অনেক নেতা নির্বাচনী প্রচারণায় যেতে ভয় পাচ্ছেন। সহিংসতার জন্য এমকিউএম কয়েক মাসের জন্য নির্বাচন স্থগিতের আহবান জানিয়েছে। পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টোও নিরাপত্তার অভাবে প্রকাশ্যে জনসভায় যাননি। তেহরিক-ই-তালেবান, আনসার-উল-ইসলাম এবং লস্কর-ই-ইসলাম এবং লস্কর-ই-তৈয়বার মতো বিভিন্ন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন রয়েছে দেশটিতে। নির্বাচনী সহিংসতায় উদ্বেগ জানিয়েছে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গত ১১ এপ্রিল থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত পেশোয়ারে বোমা হামলা এবং গুলিতে ২৬ জন নিহত হয়েছে। গত শুক্রবার আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির নির্বাচনী কার্যালয়ের কাছে বোমা হামলায় নিহত হয় ১০ জন। বৃহস্পতিবার এমকিউএম-এর নির্বাচনী কার্যালয়ের কাছেও বোমা হামলা চালানো হয়। অ্যামনেস্টি জানায়, নির্বাচন কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ ও তাদের সমর্থকদের ওপর হামলায় কমপক্ষে ৩৭ জন নিহত এবং ১৮৩ জন আহত হয়েছে। দেশটিতে নির্বাচনের পথে বড় বাধা গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং তালেবানের হুমকি। বিশেষ করে পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বের খাইবার পাখতুনখাওয়া ও এর আশপাশের কিছু এলাকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের বেলুচিস্তানে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও ভয়ঙ্কর অবস্থা ছিল। তালেবানের হুমকি ও স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের ফতোয়ার কারণে কোথাও কোথাও নারীরা ভোট দিতে যাননি। সেখানে এবারও নারীরা ভোট দিতে পারবেন কিনা সংশয় আছে।
ঝুলন্ত পার্লামেন্ট চায় অনেকে:সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে মোশাররফের মামলায় ব্যস্ত রাখছে। অভিযোগ থাকলেও আদালত বড় কোনো রাজনীতিবিদদের শাস্তি দিতে পারেনি। সহিংসতার ঘটনায় নির্বাচন কমিশন অসহায়। ভুয়া ডিগ্রিধারীদেরও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারেনি কমিশন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। এছাড়া মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করছে। বিদ্যুত্ এবং পানির অভাবে অতিষ্ঠ মানুষ। তাই অনেকে চায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট। কারণ একদল ক্ষমতায় গেলে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। ক্ষমতার মোহে তারা জনগণের জন্য কল্যাণকর কিছু না করে নিজেদের আখের গোছানোর চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে।
চলতি মাসে ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি পাকিস্তানি যুবক মনে করে, গণতন্ত্র তাদের জন্য ভাল নয়। ৪০ শতাংশ শরীয়াহ আইন অনুযায়ী দেশের শাসন চায়। এক-তৃতীয়াংশ মনে করে, গণতান্ত্রিক শাসনের চেয়ে সামরিক শাসন ভাল। পিপিপি এবং এমকিউএম সরকারকে দেখেছে জনগণ। তারা পাকিস্তান মুসলিম লীগ-এন প্রধান নওয়াজ শরীফ সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এখন ইমরান খানকে নিয়ে অনেকে আশাবাদী। কিন্তু জনগণের একটা অংশের ঝুলন্ত পার্লামেন্টের আকাঙ্ক্ষা পূরণ নাও হতে পারে। কারণ পিপিপি নওয়াজের জন্য স্থান করে দিচ্ছে। তারা একরকম পরাজয় মেনে নিচ্ছে বলে ধারণা করছেন অনেকে। নওয়াজ শরিফ, শাহবাজ শরীফ, ইমরান খান এবং মাওলানা ফজলুর রহমান বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালালেও পিপিপির বড় কোনো নেতা প্রচারণায় নেই। ইউসুফ রাজা গিলানি, রাজা পারভেজ আশরাফ, দলের সেক্রেটারি এবং পাঞ্জাব শাখার প্রধান প্রচারণায় আছেন।