পরমাণু নয় ড্রোন যুদ্ধ আসন্ন

নিজের শক্তি অটুট রেখে শত্রু বাহিনীকে ঘায়েল করার রণকৌশলই এ যাবত্কালের ইতিহাসে সেরা রণকৌশল। কম সৈন্য ক্ষয় করে অল্প সময়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে পৃথিবীর ইতিহাসে শক্তিধর বাহিনীগুলো আশ্রয় নিয়ে এসেছে এ ধরনের নানা কৌশলের। পরাক্রমশালী বাহিনীর অস্ত্রাগারেই ক্রমান্বয়ে আবিষ্কৃত, পরিবর্ধিত ও সংস্করণ হয়েছে বারুদ বা গানপাউডার থেকে বিস্ফোরক ভর্তি ভারী গোলা, বন্দুক ও মেশিনগানের বক্ষভেদী গুলি থেকে গণবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং আণবিক বোমাসহ বিভিন্ন মারণাস্ত্র প্রযুক্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে আণবিক বোমার যে ভয়াবহতা বিশ্ববাসী দেখেছে, তাতে অস্ত্র প্রতিযোগিতা রূপ নিয়েছে নতুন আঙ্গিকে। আর শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সেই প্রতিযোগিতার ধরন দেখে এটা পরিষ্কার যে, পরমাণু নয়, অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ববাসীর জন্য অপেক্ষা করছে ড্রোন বা রোবটিক যুদ্ধের ভয়াবহতা। আগে বলা দরকার, পরমাণু যুদ্ধের সম্ভাব্যতা কেন কম। এর কারণ, আণবিক বোমার ভয়াবহতার মাত্রা। যেখানে নারী, শিশু, নিরীহ বেসামরিকসহ গোটা জনগোষ্ঠীই মারা যায়। আর যুগ যুগ ধরে বহন করতে হয় তেজস্ক্রিয়তার ক্ষত। যার ফলে ঐ এলাকায় কৃষি আবাদ তো দূরের কথা, মানব সভ্যতা গড়ে তোলাও চিরকালের জন্য ব্যাহত হয়। অন্য ব্যাপারটি হলো ভূ-প্রকৃতি। অর্থাত্ যেখানে সেখানে তেজস্ক্রিয় ক্ষমতা সম্পন্ন বোমা ফেলা যায় না। যেমন প্রতিবেশী দেশে আণবিক বোমা ফেললে বায়ু প্রবাহের মাধ্যমে হামলাকারী দেশেও তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কাও কম। কেননা এর ফলে নিরপরাধ বহু মানুষের প্রাণহানি তো হবেই, এছাড়া গ্রীষ্ম ও শীতকালীন বায়ু প্রবাহের বৈচিত্র্যের কারণে নিজ দেশেও তেজস্ক্রিয়তা ছড়াবে। তবে হ্যাঁ, মহাদেশের সাথে মহাদেশের যুদ্ধ বাধলে অন্য কথা; কিন্তু বাণিজ্যিক কারণে সেটার আশঙ্কাও কম। কারণ প্রায় প্রতিটি শক্তিধর দেশেরই রপ্তানি বাণিজ্য অন্য মহাদেশে। তাই কোনো দেশকে শায়েস্তা করতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট আক্রমণ, শুধু ঐ দেশের শাসক গোষ্ঠী ও এর অনুগত বাহিনীর বিরুদ্ধে। আর এ কাজে উপযুক্ত ড্রোন বা রোবটিক জঙ্গি বিমান। যাতে কোনো চালক থাকবে না। পঙ্গপালের মতো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থেকে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখন অত্যাধুনিক যে মডেলের ড্রোন আছে, তার নাম এক্স-৪৭ বি, পুরোদস্তুর যোদ্ধা বিমান। আটলান্টার জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে এই মডেলের আরো আধুনিকীকরণে ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। এ প্রকল্পের অর্থায়নে রয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি বিএই সিস্টেমস। প্রকল্পের উদ্দেশ্য চালকবিহীন গোয়েন্দা বিমানের প্রযুক্তির উন্নয়ন। এই প্রকল্পের সদস্য অধ্যাপক হেনরিক ক্রিস্টেনসেন গত সপ্তাহে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে নতুন প্রজন্মের ড্রোনকে রোবট বলে আখ্যায়িত করেছেন। যে কোনো আবহাওয়ায় নিরাপদ দূরত্বে থেকে নিখুঁত গোয়েন্দাগিরির উপযোগী করে তৈরি করা হচ্ছে সেগুলোকে। তিনি আরো জানান, নতুন প্রকল্পে বিজ্ঞানীরা ক্ষুদ্রকায় রোবট ড্রোন তৈরি করতে যাচ্ছেন, শত্রু ঘাঁটির তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি রোবটিক ড্রোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পঙ্গপালের মতো দল বেঁধে নিজেদের গতিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে হামলা চালাতে পারবে। এ জন্য প্রতিটি ড্রোনেই সংযুক্ত থাকবে বিস্ফোরক ভর্তি ওয়ারহেড। এক্ষেত্রে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্যাট্রিয়ট প্রযুক্তিকেও কাজে লাগানো হচ্ছে বলে জানান অধ্যাপক ক্রিস্টেনসেন। ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটের অনেক সদস্য। তারা ঐ প্রযুক্তির রোবটকে বলছেন ‘কিলার রোবট’। তবে জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির দাবি, বিচার বিচক্ষণসম্পন্ন মানুষের তৈরি প্রোগ্রামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলবে নয়া প্রযুক্তির ড্রোন। আর এখানেই যত সমালোচনা। মানব সভ্যতার বিচার-অবিচারের ভার রোবটের হাতে তুলে দেয়ার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে জনমত তৈরি শুরু করেছেন নোবেল জয়ী মার্কিন মানবাধিকার কর্মী জোডি উইলিয়ামস। স্থলমাইনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৭ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল অর্জন করেন। এবার জোডি চাইছেন মূল্যবোধহীন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র গবেষণা বন্ধ করতে। তার মতে, প্রাণঘাতী অস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে এখনই। তা না হলে যথাসময়ে কোনো এক জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হবে কিলার রোবটকে। উন্নয়নশীল নয়া প্রযুক্তিতে ড্রোনের তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে মানুষের সম্পৃক্ততা থাকছে না জেনে আতঙ্কিত হয়েছেন জোডি। তিনি বলেন, এর মানে হলো মানুষকে হত্যা করতে রোবটকে নিয়ন্ত্রণ-বাঁধনছাড়া করবে মানুষ। এই হত্যাকাণ্ড হবে এমনই বিভত্স্য যে, ‘ওহ! দানব রোবট, ওহ, কিলার রোবট’ বলে মরার আগে কাউকে সাবধান করারও সুযোগ পাবে না দুর্ভাগারা। রোবটিক অস্ত্র গবেষণাকে তাই এখনই বেআইনী ঘোষণা করার পক্ষপাতী জোডি উইলিয়ামস। এই গবেষণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে আন্তর্জাতিক প্রচারণা শুরু করারও পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি। ড্রোন প্রযুক্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে অন্যান্য সামর্থ্যবান দেশও। বর্তমানে অন্তত ৭৬টি দেশ ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করছে। এর ফলস্বরূপ মানব সভ্যতা যে বিপন্ন হতে চলেছে, তা নিশ্চিত। তাই অসুস্থ এই প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে সোচ্চার হতে হবে এখনই।