রানা গ্রেফতার
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০১৩, ২৩:০১
সাভারে ধসে পড়া ‘রানা প্লাজার’ মালিক সোহেল রানাকে অবশেষে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল রবিবার দুপুর দেড়টার দিকে যশোরের বেনাপোল থেকে র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল তাকে গ্রেফতার করে। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য বেনাপোলে অবস্থান করছিলেন বলে তিনি স্বীকার করেছেন। বিপুল অংকের টাকার বিনিময়ে একটি গ্রুপ তাকে ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করছিল। এই গ্রুপের দুই সদস্য শাহ আলম মিঠু ও অনিলকেও র্যাব গ্রেফতার করেছে। ভবনটি ধসে পড়ার পর গত চারদিন চার জায়গায় অবস্থান করেছেন তিনি। তবে গ্রেফতারের পর যথারীতি অন্য অপরাধীদের মত নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন সোহেল রানা। তার দাবি, গার্মেন্টস মালিকদের চাপেই ভবনটি ওই দিন চালু রাখা হয়। গতকাল সন্ধ্যায় র্যাব সদস্যরা সোহেল রানাকে ঢাকা জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছেন। গ্রেফতারের সময় সোহেল রানার কাছ থেকে দুই বোতল ফেন্সিডিল, কিছু ওষুধ, মোবাইল সেট ও অল্প কিছু টাকাসহ ব্যবহার্য কিছু জিনিসপত্র জব্দ করা হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হয়ে হাসপাতালে
ভবনটি ধসে পড়ার কয়েক মিনিট আগে ৫ জন সহযোগীসহ বেজমেন্টে নিজের অফিসে প্রবেশ করেন সোহেল রানা। হরতাল বিরোধী মিছিল করার জন্যই তিনি সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে রানা প্লাজায় আসেন। রানার ভাষ্য অনুযায়ী ভবনটি ধসে পড়ার সময় তিনি ভেতরেই ছিলেন। কিন্তু তার অফিসটা এক কোণায় হওয়ায় একটু ফাঁকা ছিল। ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে আশুলিয়ার কলমার ইনসাফ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঘন্টা দুয়েক পরই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সেখান থেকে প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়ে মোহাম্মদপুরে বন্ধু শামীমের বাসায় চলে যান। সেখানে বসেই টেলিভিশনে সবকিছু দেখেন। ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে একের পর এক লাশ বের হওয়ায় পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
চার রাত চার জায়গায় ছিলেন
র্যাব জানায়, গত চার দিন চার জায়গায় রাত কাটিয়েছেন রানা। আর এভাবে রাত কাটানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতে পালিয়ে যাওয়া। মোহাম্মদপুরে বন্ধু শামীরের বাসায় বসেই তিনি ভারতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি গ্রুপের সঙ্গে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে চুক্তি করেন। ওই গ্রুপের সদস্যরাই তাকে ঢাকা থেকে বেনাপোল পর্যন্ত নিয়ে যায়। প্রথম রাতে মোহাম্মদপুরে কাটিয়ে পরদিন মানিকগঞ্জে চলে যান। সেখানে আফজাল শরীফ নামে একজনের বাসায় রাত্রিযাপন করেন। পরদিন রাতে আরিচা-দৌলতদিয়া ঘাট পার হয়ে ফরিদপুরে অনিলের বাসায় হাজির হন। অনিলের বাসায় একদিন থাকার পর গত শনিবার রাত ১১টার দিকে মাইক্রোবাসে করে যশোরের ঝিকরগাছায় শাহ আলম মিঠুর কাছে তাকে পৌঁছে দেন অনিল। ওই রাতেই মিঠু তাকে বেনাপোলের বলফিল্ডে নিজের ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। সেখান থেকেই তার ভারতে চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই গতকাল দুপুরে র্যাবের জালে রানা ধরা পড়েন।
হেলিকপ্টারে যশোর থেকে ঢাকায়
গতকাল সকালেই রানার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্ণেল জিয়াউল আহসান ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার নিয়ে যশোরে চলে যান। তার আগেই যশোরে যোগাযোগ করে পুরো ফোর্স প্রস্তুত রাখেন। জিয়াউল আহসান পৌঁছানোর পরই র্যাব সদস্যরা অভিযান শুরু করে। বেনাপোলের বলফিল্ডে মনিরুজ্জামান নামে এক ব্যক্তির বাড়ি দুপুর একটার দিকে ঘিরে ফেলে র্যাব সদস্যরা। এই বাড়ির নিচ তলার ভাড়াটিয়া শাহ আলম মিঠু। র্যাব সদস্যরা নিচ তলার ফ্ল্যাটে ঢুকে তিনটি রুম দেখতে পান। পেছন দিকের শেষ রুমে বসে টেলিভিশন দেখছিলেন রানা। তখন তিনি ট্রাউজার ও টিশার্ট পরা ছিলেন। এরপর সেগুলো বদলে প্যান্ট ও শার্ট পরিয়ে তাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন র্যাব সদস্যরা। সড়ক পথে যশোরে আসার পর বেলা ৪টা ২০ মিনিটে হেলিকপ্টারে করে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন জিয়াউল আহসান। বিকাল ঠিক ৫টার দুই-তিন মিনিট আগে তেজগাঁওয়ের পুরনো বিমানবন্দরে হেলিকপ্টারটি অবতরণ করে। এ সময় একজন র্যাব সদস্য ও জিয়াউল আহসান দুই দিক দিয়ে ধরে রানাকে হেলিকপ্টার থেকে নামিয়ে আনেন। সেখান থেকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে র্যাব সদর দফতরে নিয়ে যাওয়া হয়।
র্যাব মহাপরিচালকের ব্রিফিং
বিকাল ৬টার কিছু আগে র্যাব সদর দফতরে গ্রেফতার অভিযান নিয়ে ব্রিফিং করেন র্যাবের মহাপরিচালক মোকলেছুর রহমান। তিনি বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় মূলত রানাই দায়ী। সীমান্ত অতিক্রম করার আগে সোহেল রানাকে ফেনসিডিলসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকালে তার কাছে একটি ব্রিফকেস ছিল। সোহেল রানার ব্রিফকেসে রাখা জামা কাপড়ের ভেতর থেকে দুই বোতল ফেনসিডিল, খাবার স্যালাইন উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, আমরা গোপন সূত্রে জানতে পারি, ভারতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সে সীমান্তে চলে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে সীমান্ত অতিক্রম করবে। সীমান্ত অতিক্রম করার আগেই তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হই।
র্যাবের মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘নির্দেশ আসার পরপরই সব ব্যাটালিয়নকে নির্দেশ দেয়া হয়। এই চারদিনে সে বিভিন্ন স্থানে ছিল। সে স্থান পরিবর্তন করে। ঢাকার বাইরে তিন জায়গায় ছিল। শাহ আলম মিঠুর বাসায় আশ্রয় নিয়েছিল সে। তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, রানাকে কেউ প্রশ্রয় দেয়নি। প্রশ্রয় দেয়া হলে সে এক জায়গায় থাকতো। প্রশ্রয় পায়নি বলেই এই সময়ের মধ্যে সে তিন চারটি জেলা পরিবর্তন করেছে। রানাকে ঢাকা জেলা পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হবে এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা হবে বলেও জানান র্যাব প্রধান।
যেভাবে র্যাবের জালে সোহেল রানা
আমাদের যশোর অফিস থেকে সাইদ আহমেদ সাঈদ বুলবুল জানান, র্যাব-৬ এর উপ-পরিচালক মেজর এবিএম জাহিদুল করিম ইত্তেফাককে বলেন, সাভার ট্র্যাজেডির পর থেকেই সোহেল রানা পলাতক ছিল। ফরিদপুরের কানাইপুরে অনিল নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে রানা শনিবার আশ্রয় নেয়। অনিল রানাকে সাথে নিয়ে রবিবার ভোররাতে যশোরের চৌগাছায় পৌঁছায়। সেখান অবস্থানরত মিঠুর সাথে তারা তিন জন ভোরেই বেনাপোলে মিঠুর বাড়িতে চলে আসে। ভোর থেকেই র্যাবের গোয়েন্দা উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে র্যাবের ২৫ সদস্যের একটি দল সাদা পোশাকে মিঠুর বাড়ি ঘিরে ফেলে। রানাকে মিঠু ভারতে পাঠানোরও উদ্যোগ নেয়। বেলা দেড়টার দিকে মিঠুর বাড়িতে রানার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়ে র্যাব অভিযান চালায়। কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই রানাকে পাকড়াও করেন র্যাব সদস্যরা।
রানার কাছে পাওয়া যায় ৪ বোতল ফেনসিডিল। ১০ বোতল ফেনসিডিল ফরিদপুর থেকে কিনে ৬ বোতল তিনি সেবন করেন বলে জানান মেজর জাহিদ। গ্রেফতারের সাথে সাথে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে র্যাব সদস্যরা তাদের সরাসরি যশোর বিমানবন্দরে নিয়ে আসেন। এই গ্রেফতার অভিযান এত ‘শর্টপ্রসেস’ ছিল যে, আশপাশের লোকজনও কিছু বুঝে উঠতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন মেজর জাহিদ। তিনি জানান, তাকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে যশোরে আনা হয়। সেখান থেকে বেলা ৪টা ২২ মিনিটে রানাসহ গ্রেফতারকৃত ৩ জনকে নিয়ে যশোর বিমানবন্দর থেকে ঢাকার পথে রওনা হয় র্যাবের নিজস্ব হেলিকপ্টার।
যশোর বিমানবন্দরে লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, বেনাপোলের বড় আচড়া গ্রামের ফার্নিচার ব্যবসায়ী শাহ আলম মিঠু রানাকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পার করে দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল। এজন্য রানা অনিলের মাধ্যমে মিঠুকে প্রচুর টাকা দিয়েছিলেন বলেও র্যাব জানতে পারে। লে. কর্নেল জিয়া বলেন, আটক করার সময় রানার ব্যাগ থেকে কিছু টাকা ও কয়েক বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে র্যাবের এই অভিযান পরিচালিত হয়।
খুলনায় নিষ্ফল অভিযান
রানাকে ধরতে খুলনার সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় শনিবার রাত ও রবিবার দুপুরে ব্যর্থ অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এক পর্যায়ে রবিবার সকাল থেকেই খুলনার সোনাডাঙ্গা থানার ৮ নম্বর রোডের ১৩৯ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। রানাকে গ্রেফতারে আশপাশের আরও কিছু ভবনে অভিযান চালানো হয় বলে তখন জানিয়েছিলেন সোনাডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, আবাসিক এলাকায় কোনো একটি ভবনে রানা আত্মগোপন করে আছেন বলে সংবাদ পেয়ে এ অভিযান চালানো হয়। পরে র্যাবের হাতেই ধরা পড়েন রানা।
র্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের অধিনায়ক মেজর জাহিদ বলেন, রানা খুলনায় আছে এমন একটি তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব গতকাল সকালে খুলনায় অভিযান চালায়। তবে এই তথ্য ছিল ভুল। একটি মহল র্যাবকে খুলনার দিকে ব্যস্ত রেখে বেনাপোল সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছিল বলেই মনে করছেন তারা।
সতর্ক ছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী
এদিকে সোহেল রানা বেনাপোল সীমান্তের চোরাইপথে ভারতে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন—এমন একটা খবর রবিবার সকালে যশোরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থার কাছে আসে। এতে নড়েচড়ে বসেন সকল কর্তৃপক্ষের কর্তা ব্যক্তিরা। র্যাবের পাশাপাশি পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষাবাহিনী বিজিবি’র অনেকগুলো দল সকাল ১০টা থেকেই বেনাপোলের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয়। এর মধ্যে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে পুলিশের ৭-৮টি দল রানাকে গ্রেফতারের বিশেষ ফাঁদ তৈরি করে। বেনাপোল ইমিগ্রেশনে নজরদারির পাশাপাশি পাশের সাদীপুর, পুটখালি, দৌলতপুর সীমান্তে তারা অবস্থান নেন। এসব রুট দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার করে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহা ইত্তেফাককে জানান, তারা র্যাব ও বিজিবি’র সাথে সমন্বয় করেই গ্রেফতার মিশনে ছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে পুলিশের কাছে খবর আসে র্যাবের হাতে রানা আটক হয়েছে। যশোরের পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র জানান, রানা মিঠুর দূর সম্পর্কের আত্মীয় বলে মিঠুর স্ত্রী তাকে জানিয়েছেন। মিঠু বেনাপোলে অটবি শোরুমের ডিলার। তিনি বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে রানাকে ভারতে পার করে দিতে চেয়েছিলেন।
কে এই মিঠু
বেনাপোলের শাহ আলম মিঠু সাধারণ এক ব্যবসায়ী। দূর সম্পর্কের আত্মীয়তার সূত্রে (রানার মামা শ্বশুরের শ্যালক মিঠু) রানা মিঠুর সহযোগিতা চান। রানার বিপদে স্রেফ আত্মীয়তার তাগিদেই তাকে সহায়তা করেন মিঠু। বেনাপোলের স্থানীয় বাসিন্দা মিঠুর পৈতৃক সম্পত্তি যথেষ্ট থাকলেও ব্যবসায় তার বেশ ক্ষতিও হয়। তাই কয়েক বছর আগে অটবির শোরুমের ব্যবসা শুরু তার। তার পিতা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। স্ত্রী পর্দানশীন। বিএনপি সমর্থক মিঠুর সাথে সামাজিক পরিমণ্ডলের যোগসূত্র তেমন নেই বলেই জানতে পেরেছেন র্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তারা।
প্রসঙ্গত, রানা সাভার যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদের খুবই ঘনিষ্ঠ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগে যোগ দেন রানা। ১৯৯৮ সালে সাভার পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন তিনি। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এ পদে ছিলেন।