শোকের মাঝে প্রেরণার জয়

ম্যাচশেষে খেলোয়াড়দের উল্লাস করতে দেখা যায়নি। খুব সাদামাটা ভাবে জয়টি উদযাপন করলেন ক্রিকেটাররা। সাভারে ভয়াবহ ভবন ধসের ঘটনায় দেশবাসীর মতো বিপর্যস্ত ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সদস্যরা। এটা নিশ্চিত অন্য সময় হলে চার বছর পর টেস্ট জেতার ক্ষণে আনন্দ আর উল্লাসে মেতে ওঠতেন মুশফিক বাহিনী। কিন্তু তারপরেও গতকাল হারারে স্পোর্টস ক্লাবে স্বাগতিক জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাাংলাদেশের ১৪৩ রানের জয়টি শোকের মাঝে প্রেরণা হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের ছুঁড়ে দেয়া ৪০১ রানের লক্ষ্যে ছুটতে গিয়ে জিয়াউর রহমানের বোলিং তোপে গতকাল পঞ্চম দিনের দ্বিতীয় সেশনে ২৫৭ রানে অলআউট হয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। বাংলাদেশ পেল নিজেদের চতুর্থ টেস্ট জয়। চার বছর পর পাওয়া জয়। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে সমতা আনার জয়। এই হারারে টেস্ট থেকে ব্যক্তিগত প্রাপ্তিও অনেক। সাকিব-নাসিরের দারুণ ধারাবাহিকতা, জিয়াউর রহমানের বোলিং ছন্দ খুঁজে পাওয়া। ‘ক্লান্তিহীন পেসার’ রবিউল ইসলামকে খুঁজে পাওয়া। আছে সোহাগ গাজীর কৃতিত্ব। তবে এসবের কোনো কিছুকেই দেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনার চেয়ে বড় মনে করছেন না ক্রিকেটাররা। এই জয় তাই তারা উত্সর্গ করলেন সাভার দুর্ঘটনায় নিহতের উদ্দেশে। ম্যাচশেষে মুশফিক বলেন, ‘টেস্ট জয় সবসময়ই বিরাট সাফল্য। প্রথম টেস্ট হারার পর চাপ তৈরি হয়েছিল। সিনিয়র খেলোয়াড়রা ভালো খেলেছে। বিশেষ করে রবিউল অনেক ভালো বল করেছে। কৃতিত্ব দিব সাকিব ও নাসিরকেও। তারা সবসময় আমাকে সাহায্য করেছে। তবে ক্রিকেটীয় এসব ব্যাপারের চেয়ে আমরা অনেক বেশি শোকাহত সাভারের দুর্ঘটনায়। এই জয় আমরা সাভারে নিহতদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উত্সর্গ করছি।’ এমন পরিবেশ না থাকলে বাংলাদেশের এই জয়টা বেশ বড় একটা উদযাপনের উপলক্ষ হতে পারতো। এটা তো দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাওয়া এক জয়। সেই ২০০৯ সালের জুলাইতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেন্ট জর্জের জয়ের পর এই প্রথম আরেকবার জয় পেল বাংলাদেশ; এর মধ্যে খেলেছে ১৮টি টেস্ট! বিপরীতে মাত্র দুটি টেস্ট ড্র করতে পেরেছে তারা। সর্বশেষ হোম সিরিজে ওয়েষ্ট ইন্ডিজকে ‘বাগে’ পেয়েও হারতে হয়েছে মুশফিকদের। কালও দ্বিতীয় হারারে টেস্টের শেষ দিনে বাংলাদেশের বুকে কাঁপন ধরিয়েছিলেন মাসাকাজ্জা ভাইয়েরা; হ্যামিলটন ও শিংগিরাই। এই দুইজন যেভাবে ব্যাট করছিলেন তাতে এক সময় মনে হচ্ছিল হারারে টেস্টও রূপ নিতে যাচ্ছে মুলতান, ফতুল্লা ও চট্টগ্রামের মত এক হতাশায়। শেষ পর্যন্ত এই আতঙ্ক থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেন মোহাম্মদ আশরাফুল। লেগস্পিনার থেকে অফস্পিনারে হওয়া এই পার্টটাইম বোলার জুটি ভাঙেন সিংগিকে আউট করে। এরপর আতঙ্ক হয়ে ছিলেন হ্যামিলটন মাসাকাদজা। তিনি সেঞ্চুরি পেলেও ইনজামাম, পন্টিং বা ভেট্টোরি হতে পারেননি। সঙ্গীরা কেউ টিকতে পারেননি। পঞ্চম ও শেষ দিনের চা বিরতির আধাঘন্টা আগে শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে কাইল জারভিসকে এলবিডব্লিউ ফাঁদে ফেলে দলকে উত্সবে মাতিয়ে দেন সাকিব। জারভিস সাকিবের ইনিংসে তৃতীয় শিকার ছিলেন। তবে সাকিব নন; এই ইনিংসে বাংলাদেশের নায়ক আসলে জিয়াউর রহমান। ৬৪ রানে ৪ উইকেট নিয়ে এই পেস বোলিং অলরাউন্ডারই শেষ করে দিয়েছেন জিম্বাবুয়েকে। আগের দিন জিম্বাবুয়ের সবচেয়ে ধারাবাহিক দুই ব্যাটসম্যান টেলর ও ওয়ালারকে ফেরানোর পর কাল আরো ২ উইকেট নিয়ে লেজ ছেটে দিয়েছেন। জিম্বাবুয়ের এই পতনের মধ্যেও তাদের হয়ে প্রতিআক্রমণ চালিয়ে গেছেন সাবেক অধিনায়ক ও একসময়ের ‘কিশোর বিস্ময়’ হ্যামিলটন মাসাকাজ্জা; সেঞ্চুরিও (১১১) এসেছে তার ব্যাট থেকে। শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। জিতেছে বাংলাদেশ। ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন মুশফিক; তার দুটি ফিফটির (৬০, ৯৩) কারণে ম্যাচ রেফারি তাকে বেছে নিয়েছেন। তবে লড়াইয়ে ছিলেন সাকিব, নাসিরও। সাকিবের দুটি (৮১, ৫৯) ভালো ইনিংসের পর কাল তিন উইকেট নিয়ে উইকেট শিকারের সংখ্যা ছিল চারটি। নাসিরের দুটি ইনিংসও (৭৭, অপরাজিত ৬৭) বাংলাদেশের এই জয়ে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। অভিনন্দন খালেদা জিয়ার চার বছর পর টেস্টে আবার জয়লাভ করায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, “সারা দেশের জনগণ ক্রিকেট দলের এই অভূতপূর্ব সাফল্যে আনন্দিত ও উদ্বেলিত। বেগম জিয়া বলেন, “বাংলাদেশ জাতীয় দলের এই অবিস্মরণীয় সাফল্যে আমি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সকল খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে জেপির অভিনন্দন জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী ক্রীড়া শেখ শহীদুল ইসলাম জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে ২য় টেস্টে জয়লাভ করায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সকল খেলোয়াড়, কোচ এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, সাভারের এ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও টেস্ট ক্রিকেটের এ জয় বাংলাদেশের মানুষকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করবে। বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাফল্য কামনা করে বলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তাদের জয়ের ধারা অব্যাহত রাখবে এবং বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সক্ষম হবে।