সৈয়দ জাহাঙ্গীরের রেখায় রঙে মানুষ ও প্রকৃতি

তাঁর ছবি কবিতার মতই এক সম্মোহিত করে রাখে দর্শকদের। গ্রামবাংলার মানুষ, পথ-ঘাট, ধান খেত, আদিগন্ত ফসলের মাঠ, বানভাসি মানুষ, ঘরবাড়ি। সব সবকিছুই খুব চেনা। সেই চির চেনা বিষয়কেই ক্যানভাসে রহস্যময়তার ঘেরাটোপে মুড়ে হাজির করেন শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর। বয়স আশি পেরিয়েছে গত বছর। কিন্তু আজো তার শিল্পযাত্রা নতুনত্বের পিয়াসী। এবারও ক্যানভাসে তার তুলির আঁচড়ে ব্যতিক্রমের ছোঁয়া। ফিগারেটিভ সেমিরিয়্যালিস্টিক সেসব ছবি দর্শক মনকে নাড়া দেবে নিঃসন্দেহে। গ্যালারি শিল্পাঙ্গনে পহেলা মে থেকে শুরু হচ্ছে সৈয়দ জাহাঙ্গীরের ‘ইংক ড্রইং, ড্রইং এবং কালার’ শীর্ষক একক প্রদর্শনী। প্রদর্শনী শুরুর আগে গতকাল সোমবার শিল্পাঙ্গন গ্যালারি আয়োজিত প্রেস প্রিভিউতে গ্যালারির পরিচালক রুমী নোমান বললেন, এটি বন্ধুর স্মরণে প্রদর্শনী। প্রয়াত সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ আর শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর বন্ধু ছিলেন। ২ মে ফয়েজ আহমদের জন্মদিন— বন্ধুর জন্মদিনে নিবেদিত এই প্রদর্শনী। শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর বললেন, রেখাই ছবির মূল উপাদান। আর ড্রইং-এ স্পেস একটা বড় উপাদান। তবে এবারের প্রদর্শনীর ছবিগুলো ফিগারেটিভ ড্রইং। এই ধারায় কাজ কম হয়েছে। তাই এ পথে হাঁটা। সৈয়দ জাহাঙ্গীর রং ও আকার, জমিন ও আলোর নানারকম ঘাত-প্রতিঘাত, অবস্থান নিয়ে শিল্পী নির্মাণ করেছেন তার ছবির ভুবন। তার নির্মাণশৈলীতে রয়েছে আশ্চর্য এক মোহময়তা, সহজ ছন্দ — যা তার সৃষ্টিকে করে তুলেছে তাত্পর্যময়। তার কাজ জুড়ে রয়েছে প্রকৃতি, চাঁদ, নদী ও মানুষের প্রাণপণ সংগ্রামের আলেখ্য। অবয়ব গঠনের শৃংখলা এই শিল্পীকে করে তুলেছে বিশিষ্ট। তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে দলবদ্ধ মানুষের হেঁটে আসা, নৌকা, নদী, চাঁদ, অস্তমিত সূর্য — উঠে এসেছে তুলির আঁচড়ে। পঞ্চাশের দশকে যে কয়েকজন শিল্পী বাংলাদেশের চিত্রকলাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, সৈয়দ জাহাঙ্গীর তাদের অন্যতম। বাংলাদেশের চিত্রকলায় যে নতুন পথের যাত্রা শুরু হয়েছিল চারুকলা ইন্সটিটিউটকে ঘিরে- শিল্পী জাহাঙ্গীর সেই যাত্রার প্রথম সারির শিল্পী। শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর বলেন, মানুষ, জন্মভূমি আমার ছবি আঁকার প্রেরণা। চারুকলা থেকে পাস করে আমি চাকরি করিনি। তখন অনেকেই চাকরি করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু আমি ছবি এঁকেই প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছি এবং টিকে গেছি। পাকিস্তান আমলে ছবির মূল ক্রেতা ছিলেন বিদেশিরা। এখন সে অবস্থা পাল্টেছে। দেশেই শিল্পরসিক সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর দীর্ঘকাল বিমূর্ত ধারার ছবি এঁকেছেন। এখন আবার সেখান থেকে ফিরে সেমিরিয়্যালিস্টিক (আধা বিমূর্ত) ছবির জগতে বিচরণ করছেন। তার এই বিচরণ এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় দর্শককে। তাঁর ক্যানভাসে মানুষের আশা-আকাংখা ও বেঁচে থাকার আর্তি নানা ভঙ্গিতে চিত্রিত হয়েছে। তাঁর কাজে সমকালীন পাশ্চাত্য চিত্রকলার প্রভাব আমাদের চিত্রকলায় হয়ে উঠেছে তৃপ্তিদায়ক অভিজ্ঞতা। চারুকলায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৫ সালে ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। প্রদর্শনীতে মোট চিত্রকর্মের সংখ্যা ৪৫ টি। প্রদর্শনী চলবে ৭ মে পর্যন্ত। এটি তাঁর ৩৭তম একক প্রদর্শনী।