আমরা তাঁকে স্মরণ করি
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:১৪
আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অমর নাম অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ। একজন সফল শিক্ষক, সার্থক বক্তা, সচেতন নাগরিক ও বাঙালি সংস্কৃতির একনিষ্ঠ ধারক হিসেবে তার খ্যাতি আজো বিদ্যমান। তিনি শিখিয়েছিলেন নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও দেশকে ভালোবাসতে। তিনি শিখিয়েছিলেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। আর এজন্য তাকে কলেজ থেকে চাকরি হারাতে হয়েছিলো। জেল খাটতে হয়েছিলো। মহান ভাষা আন্দোলনের সময়। রবীন্দ্রসাহিত্য ও সংগীত বর্জনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা। অসাম্প্রদায়িক ও পরিচ্ছন্ন রুচির একজন খাঁটি বাঙালি হিসেবে দেশের মানুষ আজো তাকে গভীর শ্রদ্ধার সংগে স্মরণ করেন।
অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ ছিলেন কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা এবং মাসিক কচি ও কাঁচার অন্যতম উপদেষ্টা। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সংগে ছিলো তাঁর গভীর সম্পর্ক। তার অধিকাংশ রচনা দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার ওয়ারী এলাকা অবাঙালিদের দ্বারা আক্রান্ত হলে মানিক মিয়াই টয় হাউজ থেকে নিজের গাড়িতে অজিত গুহকে ইত্তেফাকে নিয়ে আসেন।
অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ ছোটদের ভীষণ ভালোবাসতেন। কচি-কাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠা দিবসের প্রথম সভাটিতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। ছোটদের তিনি অনেকগুলো মূলবান রচনা উপহার দিয়েছেন। এগুলো মাসিক কচি ও কাঁচা, টাপুর-টুপুর, কচি-কাঁচার আসর এবং রক্তসূর্য, লাল পলাশ বিক্ষুব্ধ বাংলা ও অরনি সংকলনের প্রকাশিত হয়। উল্লেখযোগ্য তার শিশুতোষ রচনাগুলো হলো: উত্সবের আলো, একটি ঘোড়ার অপমৃত্যু, একুশে ফেব্রুয়ারি হবে, একুশের চিন্তা, কালো ব্যাজ, ডাক, পদ্মার কবি রবীন্দ্রনাথ, বুলু, বাঘিনী, কবিয়াল রমেশ শীল, বোকার হাতী, ওরাও কাঁদে, যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই, যে ফুল শুকাবে না, রবীন্দ্রকথা, সাতাশে এপ্রিল, সেদিন আর এদিন ও হোসেনের মা।
অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ এপ্রিল কুমিল্লা শহরের সুপারিবাগানের সম্ভ্রান্ত গুহ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম নৃপেন্দ্রমোহন গুহ, মায়ের নাম বিধুমুখী গুহ। তারা ছিলেন তিন ভাই ও তিন বোন। গুহ পরিবারের আদিনিবাস ছিলো বিক্রমপুরের টংগীবাড়ি উপজেলাধীন পাইকপাড়া গ্রামে। সেখানে গুহ পরিবারের জমিদারি ছিলো। পরে তারা কুমিল্লায় চলে আসেন। চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সেই অজিত কুমার মাকে হারান। কাকিমা শৈবালিনী গুহ তাদের প্রতিপালন করেন। শৈশবে তিনি কুমিল্লার শরত্ পন্ডিতের পাঠশালা, জেলা ইশকুল, ঈশ্বর পাঠশালা, ভিক্টোরিয়া কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৪০-৪২ সাল পর্যন্ত দু’বছর শান্তি নিকেতনে ছিলেন। তিনি ঢাকার প্রিয়নাথ হাইস্কুল, জগন্নাথ কলেজ, টিএন্ডটি কলেজ, কেএল জুবলী ইশকুলের নৈশ কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (খণ্ডকালীন) শিক্ষকতা ও অধ্যাপনা ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন চিরকুমার। সত্ ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে তার সুনাম এখনো মানুষের মুখে মুখে।
তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ছোটদের রচনাগুলোও বই আকারে প্রকাশিত হয়নি। অসংখ্য লেখা ছড়িয়ে আছে পুরনো পত্র-পত্রিকায়। উদ্যোগের অভাবে তাও আজ হারিয়ে যাবার পথে। তার উল্লেখযোগ্য সম্পাদিত গ্রন্থগুলো হলো: কালিদাসের মেঘদূত (যৌথভাবে), কৃষ্ণকান্তের উইল: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, গীতবিতান: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতাঞ্জলি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঞ্চয়িতা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (যৌথভাবে), নতুন বাংলা রচনা (যৌথভাবে, ছাত্রপাঠ) ও সেই পথ লক্ষ্য করে। শেষোক্ত বইটি কাজী মোতাহার হোসেনের নামে প্রকাশিত হয়।
জীবদ্দশায় অধ্যাপক অজিত কুমার গুহকে বারবার সরকারি রোষানলে পড়তে হয়। কষ্ট ভোগ করতে হয় কখনো কখনো। তবুও তিনি নীতিতে ছিলেন অটল। এদেশকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। এ সম্পর্কে একটি রচনায় প্রখ্যাত কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন:
দেশ ও ভাষার জন্যে তিনি জেলেও গিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে তোমরা অনেক কিছু শুনেছো। অজিত গুহ সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন একান্তভাবে। তিনি ইচ্ছে করলে এদেশ ছেড়ে চলে যেতে পারতেন, কিন্তু তিনি যাননি। দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধলে তার কোনো কোনো বন্ধু পরামর্শ দিতেন তাকে কলকাতায় চলে যাওয়ার জন্যে। তিনি হাসিমুখে বলতেন, কোথায় যাবো আমার নিজের দেশ ছেড়ে? তিনি গভীরভাবে ভালোবেসে ছিলেন এ দেশের মাটি, পাখ-পাখালি আর গাছ-গাছালিকে। তাই মৃত্যুর আগে তাকে যেতে হলো তার জন্মস্থান কুমিল্লায়—যেখানে রোদ্দুরে ঝলমলিয়ে ওঠে গাছপালা, নানা রঙের পাখির গানে চমকে ওঠে সকাল। এদেশের গাছ-গাছালি আর পাখ-পাখালি কি মনে রাখবে, অজিত গুহকে?
তাই আমরা ড. আনিসুজ্জামানের ভাষায় বলতে পারি—
মানুষের জীবন গ্লানিমুক্ত হোক, ভাষা তার স্বাভাবিক স্থান অধিকার করুক, গড়ে উঠুক সুস্থ সাহিত্য, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে দেশ অব্যাহতি লাভ করুক—এই ছিল তার কামনা। জনপ্রিয় শিক্ষকরূপে, সচেতন নাগরিকরূপে, উত্সাহী সংস্কৃতিসেবীরূপে এই প্রেরণা তিনি দিয়ে গেছেন আমাদের। এই সত্যনিষ্ঠ আদর্শপ্রিয় মানুষের সেই দান আমাদের চিত্তে স্থায়ী হয়ে রইল।
১২ নভেম্বর ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি চট্টগ্রাম যাবার পথে কুমিল্লার সুপারিবাগানে কাকীমা শৈবালিনীর গৃহে প্রাণ ত্যাগ করেন। আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সংগে স্মরণ করছি।
তথ্যসূত্র: ড. আনিসুজ্জামান সম্পাদিত অজিত গুহ স্মারক গ্রন্থ,
ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ রচিত অজিত গুহ।