সাভারের ভবন ধস :ধ্বংসস্তূপে চাপা শ্রমিক অধিকার

গেলো বুধবার (২৪ এপ্রিল) সাভার বাসস্ট্যান্ডে রানা প্লাজা নামের ভবনটি ধসে পড়ে। আটতলার এই ভবনে পাঁচটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি ছিল। এখানে কর্মরত ছিল প্রায় সাড়ে তিন হাজারের মতো শ্রমিক। এই ঘটনার পর থেকেই দেশের মিডিয়ায় অনেক অনেক খবর আসতে থাকে। ‘কিছু একটা দ্যান, হাতটা কাটি’, কিংবা ‘ভাই, আমাকে বাঁচান! আমার হাত-পা কাটেন! তবু আমাকে বাঁচান’ —মানুষের বেঁচে থাকার শেষ আকুতি কতটা প্রবল হতে পারে এই বাক্যগুলো তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। প্রতিটা খবর পড়তে গেলেই যেন চোখে জল এসে যায়! হঠাত্ নজরে আসে বাংলা নিউজ টুয়েন্টি ফোর ডটকম প্রকাশিত ‘ধ্বংসস্তূপেই নবজাতকের পদধ্বনি’ শিরোনামের একটি খবর। খবরটি পড়ে জানলাম, ভবনটির চার তলার একটি রুমের এক কোণায় বড় দুটো কনক্রিট পিলারের মাঝখানে দু’জন মা দুটি বাচ্চা প্রসব করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী একজন উদ্ধারকর্মী জানান, তিনি যে সুড়ঙ্গ দিয়ে সেখানে গেছেন সেটা দিয়ে মা ও নবজাতক শিশুকে বের করা সম্ভব না। সপ্তাহখানেক পর আজ আমরা জানিও না সেই দুই শিশু এবং তাদের মা-র ভাগ্যে কী ঘটেছে! কিন্তু এই সংবাদটিই সমাজকে, রাষ্ট্রকে চোখে আঙুল দিয়ে আরেকবার বুঝিয়ে দেয়, আমাদের দেশের নারীশ্রমিকদের প্রকৃত অবস্থা। নারীদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য ১৮১৮ সালে রাজা রামমোহন সহমরণ প্রথা বিলোপ করার আইন প্রস্তাব করেন। ১৮৫৫ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এগিয়ে আসেন বিধবা বিবাহ প্রচলনের প্রস্তাব নিয়ে। এরপর থেকেই শুরু। জীবনযাপন আর বাঁচিয়ে রাখার এই অধিকার আদায়ের পর থেকেই নারীশিক্ষা, নারী স্বাধীনতা, অর্থনীতিতে, সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীর পদযাত্রার অধিকারগুলো একে একে সামনে আসতে থাকে। অথচ আজকের এই আধুনিক সমাজ প্রতিটা ক্ষেত্রেই যেন নারীকে শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে। আজ ঐতিহাসিক মে দিবস। শ্রমিক শ্রেণির ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদা আদায়ের মহান লড়াইয়ের দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, ৮ ঘণ্টা বিনোদনের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু আমাদের এই গার্মেন্টশ্রমিকরা সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে ১২-১৬ ঘণ্টা শ্রম বিক্রি করছেন। আজ এই মে দিবসে আমরা আসলে কী নিয়ে কাজ করতে পারি? মজুরি বৃদ্ধি? ৮ ঘণ্টার শ্রম? নাকি কর্মস্থলে জীবনের নিরাপত্তা? কোনটা? যে সমাজ একজন শ্রমিকের নিরাপদে শিশু জন্ম দেবার অধিকারটুকুও দিতে অক্ষম, সেই সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে আর কী দাবি থাকতে পারে? বিজিএমইএ-এর নিরীক্ষায় মাতৃত্বকালীন ছুটির অর্থ জন্মহার বৃদ্ধি! শ্রম আইন ২০০৬-এর সংশোধনীতে সরকার কর্মজীবী নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করার প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই প্রজ্ঞাপন জারির পরিপ্রেক্ষিতে শ্রম মন্ত্রণালয়ে মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়ে বিজিএমইএ-এর পাঠানো সেই প্রস্তাবে বলা হয়, মাতৃত্বকালীন ছুটি ১৬ সপ্তাহ থেকে ২৪ সপ্তাহ করা হলে তা জন্মনিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে জন্মহার বাড়াতে উত্সাহিত করবে। আমাদের এই ‘বিজ্ঞ’ সংগঠনটি সম্ভবত আইনের সংশোধনী যথার্থভাবে বোঝেনি। কারণ সেখানে ডলার প্রাপ্তির কোনো হিসাব নেই! শ্রম আইন ২০০৬-এর সংশোধনীতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নারী কর্মজীবী তার পুরো জীবনে এ সুযোগ সর্বোচ্চ দুবার পাবেন। প্রস্তাবে আরো বলা হয়, পোশাকশিল্প আশির দশক থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়ে মূল্যবান অবদান রেখে আসছে। বিজিএমইএ তাদের প্রস্তাবে মাতৃত্বকালীন ছুটি ১৬ সপ্তাহকেও অযৌক্তিক বলে অভিহিত করে। বিজিএমইএ আরো উল্লেখ করে, দীর্ঘদিন কাজে অনুপস্থিত থাকলে নারীশ্রমিকের কাজের দক্ষতা কমে যাবে এবং কাজে পুনরায় যোগদানের প্রবণতাও কমবে। পোশাকশিল্পে ৮০ শতাংশ নারীশ্রমিক কর্মরত। সেখানে কোনো শ্রমিক এককভাবে কোনো পোশাক তৈরি করেন না। শার্ট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে একটি লাইনের মধ্যে একজন বডি সেলাই, একজন কলার, একজন কাফ, একজন পকেট তৈরিসহ প্রত্যেকের কাজের প্রকৃতি ভিন্ন। একটি লাইনের মধ্যে থেকে একজন শ্রমিক অনুপস্থিত থাকলে উত্পাদনের মাত্রা অনেক কমে যাবে। এতে উত্পাদন কঠোরভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। শূন্যস্থানে শ্রমিক নিয়োগে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়বে বলেও সংগঠনটির প্রস্তাবে উল্লেখ রয়েছে। এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, নারীর প্রতি সনাতন পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে নারী শুধুই উত্পাদনের যন্ত্রবিশেষ! প্রকৃতপক্ষে, সমাজ-সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতেই একজন নারী সন্তান ধারণ করেন। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই সন্তানটির দায়িত্বও নারীর একার নয়। এ দায়িত্ব পুরুষের, সমাজের, রাষ্ট্রের। দ্বিতীয়ত, বিজিএমইএ একটি ব্যবসায়িক সংগঠন। তাদের বক্তব্যেও সেটি প্রতীয়মান হয়েছে। কম ছুটি দিয়ে অধিক শ্রমই তাদের একমাত্র চাওয়া। তাই বোতাম লাগানো, পকেট সেলাই, কলার সেলাই-ই তাদের কাছে মুখ্য, সন্তান জন্মদানের মতো মহত্ একটি বিষয়কে তারা কোনোভাবেই আমলে নিতে চায় না। এজন্যই হয়তো একজন মা সন্তান প্রসবের ঠিক দিনকয়েক আগে ঝুঁকি নিয়ে তার কর্মস্থলে যান। এখানে আরো একটি প্রশ্ন যৌক্তিকভাবেই এসে যায়, ৮০ শতাংশ নারীশ্রমিকের প্রত্যেকেই কি একসঙ্গে মাতৃত্বকালীন ছুটি নেন? আর এতে কতটা শার্টের বোতাম কিংবা পকেট সেলাই আটকে থাকে? এর বিপরীতে শুধুই মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার দায়ে কতজন সন্তানসম্ভবা মা-কে যে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে তা একমাত্র বিজিএমইএ-ই বলতে পারবে। সস্তা শ্রমে নিপুণ কারিগর : রপ্তানির বাজারে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের ঐতিহাসিক তত্ত্ব! বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ২০১০-২০১১ সালে বাংলাদেশকে পোশাকশিল্পে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী হিসেবে ঘোষণা করে। সেই সময় ২০০৭-২০০৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাতেও বাংলাদেশ ১৫.৬৬ বিলিয়ন পোশাক রপ্তানি করেছে। বিজিএমইএ-এর এক হিসাব থেকে দেখা যায়, ২০১১-২০১২ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল মোট রপ্তানি আয়ের ৭৬ শতাংশেরও বেশি। ২০১২-১৩ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশ প্রায় ৯৪৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সাত দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। ২০১২ সালের আগস্ট মাসের শেষ দিকে বিজিএমইএ জানিয়েছে, ২০১৩ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে আড়াই হাজার কোটি মার্কিন ডলার। একটি আন্তর্জাতিক ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং ফার্ম ‘ম্যাকিনসে অ্যান্ড কোম্পানি’র মতে, বাংলাদেশের এই পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ২০২০ সালে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে পরিণত হবে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের এই ব্যাপক সাফল্যের একমাত্র কারণ হলো শ্রমের সস্তা বাজার। ২০১২ সালের ২৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমস ‘ওয়েজেস ইন বাংলাদেশ ফার বিলো ইন্ডিয়া’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, তৈরি পোশাকের বাজারে বর্তমানে চীনের পর বাংলাদেশের অবস্থান। মাত্র কয়েক বছর আগে তৈরি পোশাক রপ্তানির বাজারে ভারতের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। কিন্তু বাংলাদেশের গার্মেন্টশ্রমিকের বেতন একেবারেই কম হওয়ায় রপ্তানির বাজারে ভারতের স্থান দখল করেছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশের নারীশ্রমিকদের পারদর্শিতা। স্বল্প বেতন সত্ত্বেও তাঁরা জীবিকার প্রয়োজনে যতটা সম্ভব সেলাইকাজ চমত্কারভাবে করে যাচ্ছেন। টমি হিলফিগার, গ্যাপ, ক্যালভিন ক্লাইনের মতো বিশ্বসেরা ব্র্যান্ডের কাপড় মাত্র ৩৭ ডলার মাসিক মজুরিতে তাঁরা তৈরি করছেন নিপুণ কারিগরের মতো। গণনাও হার মানে লাশের সংখ্যায়! হাহাকার আর আর্তনাদেই শুধু আইনের দেখা মেলে বিজিএমইএ-এর তথ্য মতে, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ব্যবসা শুরু হওয়ার পর গত দুই দশকে ৭০০ গার্মেন্টশ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু হয়েছে এমন ঘটনার সংখ্যা ২৫টির মতো। ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২১৪টির মতো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর ভবনধসে ও অন্যান্য কারণে প্রায় ২ হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এই নির্মম মৃত্যুর শিকার শ্রমিকদের মধ্যে বেশিরভাগই নারীশ্রমিক। সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ার ঘটনায় কয়েক শ শ্রমিকের মৃত্যু এই তালিকায় নতুন সংযোজন। মৃত্যুর এই সংখ্যার পরিসংখ্যানের পরিপ্রেক্ষিতে মালিকের কাছে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাওয়াকে হাস্যকর বলে মনে হয় যেন! আর তাদের হিসেবে কতজন গার্মেন্ট মালিকের শাস্তি হয়েছে, এমন তথ্যের উল্লেখ না থাকাও একটি বিদ্রূপই বটে। অথচ সরকার সাংবিধানিকভাবেই প্রতিটা মানুষের জীবন রক্ষায় বাধ্য। সেক্ষেত্রে ফ্যাক্টরির মালিকদের এটা আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব যে তারা প্রতিটা শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সংবিধানের ৩১ এবং ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। এছাড়া ২০০৬ সালের শ্রম আইনে শ্রমিকের মৌলিক অধিকার এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির কথা বলা হয়েছে। আবার নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ-১৯৭৯ বা সিডো সনদের প্রতিটা অনুচ্ছেদই নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণের বিধান রয়েছে। সিডোর অনুচ্ছেদ ৩-এ নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার, অনুচ্ছেদ ১১ (১)-এ কর্মসংস্থানে সকল মানুষের মৌলিক অধিকার, ১১ (২)-এ বিবাহ অথবা মাতৃত্বের জন্য বৈষম্য করা যাবে না এবং অনুচ্ছেদ ১৫-তে নারীর আইনগত এবং নাগরিক অধিকারের বিষয়গুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। শ্রমিক কোনো পণ্য নয়, তারাও মানুষ। শিল্পায়নের জন্য মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। কিন্তু প্রতিটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে অগণিত শ্রমিকের মৃত্যু এই সত্য ও কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা বারবার মিথ্যা প্রমাণ করে চলেছে। পিছে আইন শুধু কাগজে লেখা বাক্য হয়েই থাকছে। বিদেশি মিডিয়ার কিছু প্রশ্ন এবং মে দিবসের পরিহাসমূলক বার্তা এরপর আপনি যখন ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা ব্রিটেনের প্রিমার্ক ব্র্যান্ডের একটি টি-শার্ট আড়াই ডলার দিয়ে কিনবেন, তখন কি আপনার জানতে ইচ্ছে হবে যে দাম এত কম হয় কীভাবে? ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়লে যুক্তরাজ্যের দ্য টেলিগ্রাফ তাদের একটি প্রতিবেদনে এমনই প্রশ্ন রেখেছেন সে দেশের ভোক্তাদের কাছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএন তাদের প্রতিবেদনের শিরোনামটাই করেছেন এভাবে, ‘বাংলাদেশের কারখানায় ধস: আমাদের এত সস্তা পোশাকের মূল্য আসলে কারা দিচ্ছে?’ কানাডার দৈনিক দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকাতেও এমনই কিছু প্রশ্ন রাখা হয়: আপনি যদি জো ফ্রেশের তৈরি পোশাক পরেন, তবে কি আপনি আপনার নিজ হাতে শত শত মানুষকে হত্যার বিষয়টি মেনে নিতে পারবেন? ২৪ এপ্রিল এমনই এক বাংলাদেশ দেখা গেলো। ধ্বংসস্তূপের নিচে শ্রমিকের নিথর দেহ, শোনা গেলো শ্রমিকের বেঁচে থাকার আকুতি! শোনা গেলো নবজাতকের অন্তিম ক্রন্দন। শ্রমিক দিবসে এ যেন বাংলাদেশের জন্য এক মহান পরিহাস! ঢাকা