মে দিবস উজ্জীবিত করুক সংকট উত্তরণে

শ্রমজীবীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রতীক মহান মে দিবস। শ্রমিক শ্রেণির গণতান্ত্রিক অধিকার সুসংহত ও স্বার্থ রক্ষার সংগ্রাম প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার ঐতিহাসিক দিন আজ। শ্রমিক শ্রেণির জন্য আজকের দিনটি দৃপ্ত শপথে বলীয়ান হওয়ার দিন, শোকের ও শেকল ছেঁড়ার দিন, একইসঙ্গে উত্সবের দিনও আজ। আজকের এ দিনে মে-র ইতিহাসে আত্মত্যাগকারীদের সঙ্গে মনে পড়ছে ২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল সাভারের বাইপাইলে শাহরিয়ার ফেব্রিক্স ও স্পেকট্রাম সোয়েটারের ৮ তলা ভবন ধসে নিহত ৬১ জন শ্রমিককে। ২০০৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁওয়ের ফিনিক্স ভবন ধসে নিহত ২১ এবং গত বছরের ২৪ নভেম্বর দিবাগত রাতে আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনসে পুড়ে অঙ্গার হওয়া ১১২ শ্রমিককে। সেইসঙ্গে গত ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসে শত শত শ্রমিকের করুণ মৃত্যুও শোকার্ত করছে জাতিকে। বিশ্বের সকল দেশে উত্পাদনের চাকাকে সচল রেখেছে মেহনতি মানুষ। কাজের নিশ্চয়তা বিধান, উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রাপ্তি এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও আনুষঙ্গিক সুবিধা পাওয়া তাদের ন্যায্য অধিকার। যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রযুক্তি প্রসার সত্ত্বেও শ্রমজীবীরা এখনো প্রতিকূলতা, বৈষম্য ও নৃশংসতার শিকার হয়ে মানবেতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে শ্রমের বিনিময়ে প্রাপ্য মজুরি থেকে। পাখি ডাকা সকাল থেকে রাতের এক প্রহর পর্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে শ্রম দিয়েও মালিকপক্ষের মন পায় না। জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারে না, কিন্তু তাদের শ্রমের বিনিময়ে যাদের টাকার পাহাড় গড়ে ওঠে তাদের বছরের পর বছর নতুন নতুন মডেলের গাড়ি, রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি আর বিঘার পর বিঘা জমি হতে কোথাও বাধা নেই। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষুধা ও নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে এখনো শ্রমজীবীদের মুক্তি মেলেনি। অনাহারে অর্ধাহারে রয়েছে হাজার হাজার শ্রমিক। বাংলাদেশের মতো বহুদেশ আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা ও আইএলও-র সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এ নীতিমালা অনায়াসে লংঘন করে বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে শ্রমজীবীদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করে এবং মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য সৃষ্টি করে নারীদের অপেক্ষাকৃত কম মজুরি দিয়ে থাকে। ফলে বেতন বৈষম্য, অধিকার বঞ্চনা, কষ্টের দিনলিপি আর মানবেতর জীবন-যাপনের কাহিনির দীর্ঘশ্বাস কেবল বেড়েই চলেছে। কিন্তু শিল্প বিকাশ মন্থর হওয়ার কারণে আমাদের দেশে শ্রমিক সংখ্যা বাড়ছে না বরং নানা কারণে প্রতিষ্ঠিত শিল্পগুলো বন্ধ, রুগ্ণ হয়ে পড়ায় ক্রমান্বয়ে শ্রমিক সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এ স্বল্প সংখ্যক শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য দেশে আছে জাতীয় ভিত্তিক প্রায় দু ডজনের মতো শ্রমিক সংগঠন। কিন্তু এ দেশের ইতিহাসে সৃজনশীল শ্রম আন্দোলনের নজির বড় একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কর্মে, শ্রমে, দক্ষতায় ও দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করার মহান দায়িত্ব যে শ্রমিক সংগঠনের ওপর ন্যস্ত থাকে এ কথাটি আমাদের শ্রমিক নেতাদের অধিকাংশই জানেন না, জানলেও মানেন না। যার ফলে আমাদের শ্রমিকদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে কর্মহীনতা ও অলসতার সংস্কৃতি। এসব দায়িত্বহীন নেতৃত্বের জন্য শ্রম সমাজে দেখা দেয় বৈষম্য। বর্তমানে কলকারখানায় শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস অপেক্ষায় হানাহানিও কম নয়। মে দিবস আমাদের উজ্জীবিত করুক জাতির অগ্রগতির পথে বিভিন্ন সংকট উত্তরণের অসীম প্রেরণায়। আজকের এ দিবসে আলোচনা হোক অন্যান্য দেশের তুলনায় কেন আমরা এত বেশি পিছিয়ে পড়লাম এমনকি শিল্পায়নে কেন মন্থর গতি? এতদিনেও কেন শিল্পায়নে ভৌত অবকাঠামো গড়ে উঠলো না? শ্রমিক স্বার্থ কেন বার বার উপেক্ষিত হয়? শ্রমিকেরা কেন সুসংগঠিত হয়ে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং শিল্প-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে? চট্টগ্রাম