নিখোঁজের তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০১৩, ২৩:০৬
সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর নিখোঁজদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। ধসে পড়া ভবনের নিচে নিখোঁজ অবস্থায় কতজন রয়েছে সে ব্যাপারে কোন সঠিক সংখ্যা জানাতে পারছে না উদ্ধারকর্মী, পুলিশ, জেলা প্রশাসন কিংবা বিজিএমইএ। পুলিশ বলছে, নিখোঁজের তালিকায় নাম লেখা হয়েছে অন্তত ১৩শ’ জনের। জেলা প্রশাসন নিখোঁজের তালিকা করেছে ১৪৯ জনের। বেসরকারি দুটি সংস্থার তালিকায় নিখোঁজের সংখ্যা ৮শ’ জনের মতো। সরকারি উদ্ধারকর্মীদের ধারণা ধ্বংসস্তূপের ভেতর বড় জোর ২০-২৫টি মরদেহ থাকতে পারে। বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষের হিসেব অনুযায়ী, ৫টি পোশাক কারখানায় মোট ৩১২২ জন শ্রমিক কাজ করতেন। যদিও বিজিএমইএ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না ওইদিন আসলেই কতো শ্রমিক ভবনটিতে ছিল। অপরদিকে উদ্ধারকর্মীরা গত সাতদিনে জীবিত-মৃত মিলিয়ে প্রায় ২৯শ জনকে উদ্ধার করেছে। বিজিএমইএর হিসেব মতে এখনও ২২৯ জন নিখোঁজ থাকার কথা। যদিও বিজিএমইএ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না ওইদিন আসলেই কতো শ্রমিক ভবনটিতে ছিল। তবে সরকারিভাবে এখনো নিখোঁজ ব্যক্তির কোনো সংখ্যা জানানো হয়নি। ট্রাজেডির সাতদিনেও নিখোঁজের প্রকৃত কোন তালিকা না হওয়ায় এনিয়ে প্রতারণা শুরু হয়েছে। অনেক প্রতারক সরকারি সহায়তা পাওয়ার আসায় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে গিয়ে নিখোঁজের তালিকায় ভুয়া নাম-ঠিকানা লেখাচ্ছেন।
ধসে পড়া ভবনে কতজন রয়েছেন এমন প্রশ্নে সাধারণ উদ্ধারকর্মীরা কোন সংখ্যা বলতে পারছেন না। তারা বলছেন, ভেতরে অনেক লাশ দেখেছেন। অন্তত কয়েকশ লাশ এখনো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রয়েছে। অপরদিকে ঘটনার পর থেকেই সাভার থানা পুলিশ নিখোঁজদের তালিকা তৈরি করতে অধরচন্দ্র হাইস্কুল মাঠে একটি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র খোলে। শুরুতে ক্রমিক নম্বর দিয়ে পুলিশ নিখোঁজের তালিকা করলেও এখন শুধু নিখোঁজের নাম-ঠিকানা লেখা হচ্ছে। গতকাল বিকালে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা সাভার মডেল থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আমিনুর রহমান বলেন, প্রথম দিকে ক্রমিক নম্বরের ধারাবাহিকতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেটা সম্ভব থাকেনি। তিনি বলেন, এতোদিন হাতে লেখা তালিকা করায় অনেকের নাম একাধিকবার এসেছে। যা যাচাই-বাছাই করা হয়নি। তালিকা যাচাই-বাছাই করতে মঙ্গলবার রাতে আমরা কম্পিউটারে তালিকাগুলো করবো। এরপর আমরা একটি সংখ্যা আপনাদের জানাতে পারবো। তবে সেটা সঠিক হবে কিনা তা বলা যাচ্ছে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রথম দিন অনেকের নাম নিখোঁজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরের দিনগুলোতে তারা উদ্ধার হলেও আমরা সেটার কোন পরিসংখ্যান রাখতে পারিনি।
এদিকে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জিলু্লর রহমান চৌধুরী বলেন, জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে গতকাল দুপুর পর্যন্ত নিখোঁজের তালিকায় ১৪৯ জন রয়েছে। তিনি দাবি করে বলেন, তাদের তালিকা যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করে তৈরি করা হয়েছে। তবে নিখোঁজ প্রতিটি ব্যক্তির ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে অভিযোগ এসেছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দেয়া সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে নিখোঁজের কোন পরিসংখ্যান নেই। গতকাল দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে উদ্ধার কাজের প্রধান সমন্বয়ক ও নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল হাসান সারওয়ার্দী বলেন, নিখোঁজের সংখ্যা তাদের জানা নেই। তবে বিজিএমইএ থেকে তারা ভবনটিতে কাজ করতেন এমন শ্রমিকের তালিকা চেয়েছেন। তালিকাটি পাওয়া গেলে মোট উদ্ধারের সংখ্যার সঙ্গে তা মেলালে হয়তো নিখোঁজের ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে সেটাও সঠিক হবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। তিনি বলেন, ভবনের অবস্থিত গার্মেন্টস অফিসগুলোর কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে ওই দিনের শ্রমিকের তালিকা থাকতে পারে। এজন্য ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে হার্ডডিস্ক খোঁজার চেষ্টা চলছে। সঠিক সংখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত নিখোঁজের সংখ্যা প্রচার না করার জন্য সংবাদকর্মীদের অনুরোধ জানান তিনি।
সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত হতভাগ্য ৩৯২ জনের লাশ, ২৫১৭ জন জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে জনগণের চলাচল ও পরিবহন চলাচলের জন্য রানা প্লাজার সামনে সড়কের একটি পাশ খুলে দেয়া হয়েছে। গতকাল রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ সড়াতে ভারি যন্ত্রপাতি ব্যবহার দেখা গেছে। গত সোমবার রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত ৫টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অপরদিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত ব্যক্তি বা লাশ উদ্ধারে সেনাবাহিনী ডগ স্কোয়াডের প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করা হয়েছে।
এবার স্বজনদের ভীর বাড়ছে বংশী নদীর পাড়ে
হাসপাতাল-ক্লিনিক ঘুরে যখন প্রিয়জনকে খুঁজে পাননি, তখন স্বজনরা আবার ছুটেছেন ধ্বংসস্তূপের পাশে, অধর চন্দ্র স্কুল মাঠে। আবার ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে লাশের কোন কিছু নদীতে ফেলা এমন ধারণা করে অনেকেই প্রিয়জনের শেষ চিহ্ন খুঁজতে ছুটছেন বংশী নদীর পাড়ে। সেখানেও শতশত স্বজনরা ভিড় করছেন। হাতরে খোঁজার চেষ্টা করছেন প্রিয় মুখটি।
বুধবার রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর রবিবার থেকে সেখানে চালানো হয় ভারি যন্ত্রের ব্যবহার। এরপর সেখানকার উচ্ছিষ্ট কনক্রিটের টুকরো এসে জড়ো করা হয় বংশীর তীরে। সেখানে এখন নিখোঁজদের স্বজনদের ভিড়। তাদের গগণবিদারী কান্নার রোলে পুরো এলাকা হয়ে উঠেছে ভারি। স্বজনরা টাকা চায় না, পয়সা চায় না। শুধু সান্ত্বনা হিসেবে প্রিয়জনের এক টুকরো স্মৃতিচিহ্ন। কারণ, স্বজনকে জীবিত অবস্থাতে নয়, মৃত অবস্থাতেও পাননি। জীবিত পাওয়ার আশা ছেড়ে বুকে পাথর বেঁধে এখন চান শুধু লাশ।
রহিমা বেগমের বয়স ৬৫ বছর। গাইবান্ধা জেলায় বাড়ি। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে হারিয়েছেন মেয়ে ও নাতনিকে। তার এখনো জানা নেই, ওরা আদৌ বেঁচে আছেন কি না? গতকাল বংশী নদীর তীরে কথা হয় তার সাথে। গত ৭ দিন ধরে মেয়ে ও নাতনি খুঁজতে খুঁজতে তিনি নুয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে রমিজা ও নাতনি হোসনে আরা রানা প্লাজার চার তলায় কাজ করতো। ঘটনার পর থেকে ওদের আর কোন খোঁজ পাইনি। সব জায়গায় খুঁজেছি, কোথাও ওদের পাইনি। আমি জানি ওরা আর বেঁচে নাই, কিন্তু ওদের শেষ চিহ্ন নিতে আমি এখানে এসেছি।’
কিশোরগঞ্জ থেকে বোন মর্জিনাকে ঘটনার দিনই খুঁজতে রানা প্লাজায় আসেন মিজান। তিনি নিজেও ধ্বংসস্তূপে ঢুকে কদিনে বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করেছেন। কিন্তু পাননি বোনকে। তিনি বলেন, ‘এই হাত দিয়ে বোনরে মুখে তুলে খাওয়ায় দিছি। রানা প্লাজার ভিতরে ঢুকে আমি অনেকরে জীবিত ও মৃত উদ্ধার করেছি। কিন্তু আমার বোনটারে উদ্ধার করতে পারিনি। এখন বংশী নদীর তীরে বোনের শেষ চিহ্ন খুঁজতে এসেছি।’
এদিকে, বংশী নদীর তীরে ফেলা ধ্বংসস্তূপের মাঝে প্রচুর পরিমাণে জরুরী জিনিসপত্র উদ্ধার হয়েছে। এর অধিকাংশই রানা প্লাজার দুই তলায় অবস্থিত ব্রাক ব্যাংকের। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিভিন্ন গ্রাহকের হিসাব বই, ব্যাংকের এটিএম কার্ড, ইস্যু না করা চেক বই, বিপণীবিতানের বিভিন্ন দোকানের সরঞ্জাম ইত্যাদি। ধ্বংসস্তূপের মাঝ থেকে ফ্যান্টম লিমিটেডের গার্মেন্টসের চারজন শ্রমিকের পরিচয়পত্র পাওয়া যায়। এদের মধ্যে রয়েছেন—তসলিমা মেশিন অপারেটর আইডি নং- ৮০২; রমা মেশিন অপারেটর আইডি নং ৪৭; রনি হেলপার আইডি নং ৫৪১ এবং কাজলি মেশিন হেলপার আইডি নং ১০৪। এদিকে, বংশী নদীর পাড়ে দায়িত্বে থাকা র্যাব-এর এক সদস্য বলেন, ‘রানা প্লাজার ধ্বংসাবশেষ এখানে এনে জড়ো করা হচ্ছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত যা এসেছে, তার অধিকাংশই বিপণীবিতান ও ব্রাক ব্যাংকের। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিভিন্ন দোকানীর পোশাক, সেলাই মেশিন, কাপড়ের ব্যাগ, ব্রাক ব্যাংকের দুইটি ট্যাঙ্ক। মূলত, যেসব জিনিস পরবর্তীতে কাজে লাগানো যেতে পারে এবং অতি জরুরি সেসব জিনিসপত্র আলাদা করে রাখা হচ্ছে।’ অন্যদিকে, বংশী নদীর পাড়ে এখন সাধারণ মানুষ ভিড় জমিয়েছেন। তারা ফেলে দেয়া কনক্রিটের মাঝ থেকে রড-লোহাসহ বিভিন্ন জিনিস সেখান থেকে নিয়ে যাচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যবৃন্দ ও সাধারণ উদ্ধারকর্মীরা তাদের ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে।