আমরা মানুষের জন্য রাজনীতি করি :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা গত ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ভবন ধসে যারা নিহত হয়েছেন তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি বলেন, আমরা রাজনীতি করি মানুষের জন্য। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথে সেনা প্রধানকে উদ্ধার কাজ শুরু করার জন্য নির্দেশ দেই। এছাড়া পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে নির্দেশ দেই। সেদিন ছিলো ১৮ দলীয় জোটের হরতাল। আমার একটাই নির্দেশ ছিলো একজন জীবিত থাকা অবস্থায় উদ্ধার কাজ যেন বন্ধ না হয়। স্থানীয় জনগণ, ভলান্টিয়ারসহ সবাই ঘটনাস্থলে ছুটে এসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে চলতি অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যখনই জানতে পারলাম মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে তখন জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করলাম। শাহীনা মেয়েটিকে বাঁচানোর জন্য উদ্ধার কর্মীরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। গ্রীল কাটার সময় স্পার্ক করে আগুন লেগে গেলে উদ্ধারকর্মীরা সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। উদ্ধারকর্মী এজাজ উদ্দিন চৌধুরী কায়কোবাদের শরীর পুড়ে যায়। তাকে চিকিত্সার জন্য এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছে। সরকার তার চিকিত্সার সমস্ত ব্যয় বহন করবে। প্রথম দিন থেকে সে উদ্ধার কাজে নিয়োজিত ছিলো। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যে বাঙ্গালি তার প্রমাণ সাভারের ঘটনায় আবার পাওয়া গেছে। সবাই ছুটে এসে উদ্ধার কাজ করেছে। ঘটনার দিন বিদ্যুত্ ছিলো না। জেনারেটর চালু করার পর যে ভাইব্রেশন হয় তাতে ভবনটি ধসে পড়ে। আগের দিন শিল্প পুলিশ সবাইকে ভবন থেকে বের করে দেয়। পরদিন গার্মেন্টস মালিক পক্ষের লোকজন শ্রমিকদের ভবনে নিয়ে যায়। তারা বলে যেহেতু রাতে ভবনটির কিছু হয়নি তাই কিছু হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় র্যাংগস ভবনে লাশ দিনের পর দিন ঝুলে ছিলো। চারদলীয় জোট সরকারের সময় সাভারে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ধসে পড়লে উদ্ধার কাজের এক পর্যায়ে উদ্ধার কাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তিনি বলেন, যারা আহত হয়েছে যতদিন লাগে তাদের চিকিত্সার দায়িত্ব আমরা নিয়েছি। এক হাজার শ্রমিকের কাজের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যারা মারা গেছে তাদের ফিরে পাওয়া যাবে না। তবে যারা বেঁচে আছেন তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। বিরোধী দলকে ধন্যবাদ জানাই গত ২৪ এপ্রিল শেষ মুুহূর্তে হরতাল প্রত্যাহারের জন্য। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাভারে উদ্ধার কাজ চলার সময় গুলশান ও রামপুরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শত শত যানবাহন ভাংচুর করে। আমি মনে করি শ্রমিকরা তাদের প্রতিষ্ঠান ভাংচুর করতে পারে না। ক্ষোভ প্রকাশের নামে কারা এসব করেছে তা তলিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলবো, ভাংচুরের সাথে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দেখতে হবে এরা কারা? তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে মহিলা স্পিকার আছেন। শুধু আমরা পিছিয়ে ছিলাম। মহিলা স্পিকার নির্বাচন করার মধ্যদিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর অধিবেশন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী অধিবেশন সমাপ্তি সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির ঘোষণা পাঠ করেন। ‘সংবাদমাধ্যমকে জাতীয় সংকটে বিচক্ষণ হতে হবে’ বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংকট ও দেশের বিদ্যমান সমস্যা তুলে ধরতে সংবাদ মাধ্যমগুলোকে আরও গঠনমূলক ও বিচক্ষণতার সঙ্গে ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বর্তমান সরকার সম্পূর্ণভাবে সংবাদ মাধ্যম ও বাক-স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। এই প্রত্যয় থেকে ডজন ডজন স্যাটেলাইট টেলিভিশন সমপ্রচারের পথ উন্মুক্ত এবং তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সাভারের মর্মান্তিক ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ঘটনায় সংবাদ মাধ্যমের কিছু সদস্যের ভূমিকায় বিচক্ষণতা ও দায়িত্বশীলতা পরিলক্ষিত হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এক বৈঠকে এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোন দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশের মতো কোন দেশেই ওই নির্ধারিত এলাকায় সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের প্রবেশের অনুমতি দেয় না। আমরা স্বচ্ছতার স্বার্থে এই অনুমতি দেই। কিন্তু কিছু মিডিয়া এই সুযোগ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে ব্যর্থতার স্বাক্ষর রাখে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর পর উদ্ধার অভিযানে উদ্ধারকারী দলগুলো এবং সাধারণ মানুষ সামগ্রিকভাবে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে এবং সরকার একজন মানুষকেও জীবিত উদ্ধারে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। সমন্বয় পরিষদের সভাপতি বিচারপতি মেসবাহউদ্দিন, মহাসচিব ড. কামরুল হাসান খান এবং বিভিন্ন জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ অন্যান্যের মধ্যে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বুয়েটের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট (বিএফইউজে)-এর সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন (বিএমএ) সভাপতি প্রফেসর মাহমুদ হাসান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম ও ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান ও প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দুর্ঘটনার ২০ মিনিটের মধ্যে সাভারে উদ্ধারকারী দল প্রেরণ করেছে। জীবিতদের উদ্ধারে যথাযথ পদ্ধতি প্রয়োগ ও আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিত্সার ব্যবস্থা করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সম্ভবত এটাই বাংলাদেশের রেকর্ড। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয় করার ফলে এটি সম্ভব হয়েছে। তিনি সমন্বয় পরিষদের নেতাদের প্রতি বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা আমাদের উন্নয়নমূলক পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরলে এটিই হবে এক বিরাট কাজ। প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোন ষড়যন্ত্র এই বিচার প্রক্রিয়া নস্যাত্ করতে পারবে না। কারণ এটি জনগণের দাবি। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সমন্বয় পরিষদের নেতাদের প্রতিও আহ্বান জানান।