জেল হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে দেয়া দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল

জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় বহিষ্কৃত দুই সেনাসদস্য দফাদার আবুল হাসেম মৃধা ও দফাদার মারফত আলী শাহকে নিম্ন আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে তাদের খালাস দেয়া সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। আবুল হাশেম ও মারফত আলী এরা দু’জন সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। আপিল বিভাগ গতকাল রায়ের আদেশের অংশ আদালতে পাঠ করে শোনান। একইসঙ্গে প্রধান বিচারপতি জানান, জেল হত্যায় ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। বিষয়টি রায়ের পর্যবেক্ষণে থাকবে। আপিল বিভাগের এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী আনিসুল হক সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, এটি একটি ঐতিহাসিক রায়। এই রায়ের মধ্য দিয়ে জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার সমাপ্ত হলো। অন্যদিকে পলাতক দুই আসামির পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, এটি একটি বিতর্কিত রায়। এই দুই আসামিকে নিম্ন আদালত যাবজ্জীবন এবং মৃত্যুদণ্ড উভয় সাজা দিয়েছিলো। আমাদের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে এক অপরাধের জন্য দুইবার দণ্ড দেয়া যায় না। রায়ে এটি একটি ভুল। এক দণ্ড বহাল থাকতে অপর দণ্ড হতে পারে না। অন্যদিকে জাতীয় নেতা মনসুর আলীর ছেলে সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এ রায়ে আমরা কিছুটা হলেও ন্যায় বিচার পেয়েছি। জেল হত্যার ক্ষেত্রে আমরা ষড়যন্ত্রের কথা বলেছিলাম। আজকের রায়ে সেকথা প্রমাণ হয়েছে। অনেক চড়াই উত্রাইয়ের পর গতকাল সকালে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির বেঞ্চ জেল হত্যা মামলার এই রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য বিচারকরা হলেন, বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি মো. ইমান আলী। রায়ের পর এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এ রায় দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আরেকটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, কিছু সেনা সদস্য ও রাজনৈতিক নেতার ষড়যন্ত্রে কেন্দ্রীয় কারাগারে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অথচ বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট বিষয়টি আমলে নেয়নি। তিনি বলেন, জেলহত্যাকাণ্ডের চেয়ে জঘন্যতম ও ষড়যন্ত্র আর কিছু হতে পারে না। প্রসঙ্গত ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জাতীয় চারনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয় পুলিশ। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. মতিউর রহমান এ মামলায় রায় দেন। রায়ে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন (পলাতক), দফাদার মারফত আলী শাহ (পলাতক) ও এল ডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধাকে (পলাতক) মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন আহমেদসহ ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাবেক মন্ত্রী কেএম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে খালাস দেওয়া হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে হাইকোর্ট ২০০৮ সালে দেওয়া রায়ে মোসলেমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি মারফত আলী ও হাশেম মৃধাকে খালাস দেয়। এছাড়াও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ফারুক, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন আহমেদকেও খালাস দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করে সরকার।