চয়ন

বাংলাদেশ :প্রসঙ্গ উত্তরাধিকার

 

আমরা জানি বিচিত্র উপকরণে গঠিত মানুষের সংস্কৃতি। এই সকল উপকরণের মধ্যে প্রধানত উল্লেখ্য:

ক. বিশেষ জনপদের ভূগোল-প্রকৃতি, খ. সেই বিশেষ জনগোষ্ঠীর উত্পাদন-পদ্ধতি ও উত্পাদনের বণ্টনব্যবস্থা এবং গ. তার মানস ভাবনা—বিশ্বাস, সংস্কার, ধর্মচেতনা। এই সকল উপকরণের অবদানেই  তো গড়ে ওঠে মানুষের জীবন। অতএব সব মিলিয়েই তার সংস্কৃতি। বাংলাদেশের সংস্কৃতির স্বরূপ— অনুসন্ধান কর্মে এ বিষয়ে সচেতন থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়।

এইখানে একটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে চাইছি। প্রাচীন কালাবধি বাংলাদেশের মাটিতে কদাপি কোনো বিশেষ ধর্মবিশ্বাস দীর্ঘদিন যাবত্ মূল এবং বিশুদ্ধ আকারে স্থায়ী হয়নি। (কোনো দেশেই তা সম্ভব নয়। মহাকালের প্রভাবে তার চেহারা পালটায়)। এ কারণে জিজ্ঞাস্য—বিচ্ছিন্ন হিন্দু সংস্কৃতি, কিংবা বিচ্ছিন্ন মুসলিম সংস্কৃতি, অথবা তদর্থে বিচ্ছিন্ন কোনো বিশেষ ধর্মীয় সংস্কৃতি এদেশের জনমানুষের জীবনে কতটা বিরাজমান? কত স্পষ্ট রেখায় তা চিহ্নিতকরণ সম্ভব? বরং তিন হাজার বত্সরের বাংলাদেশের ইতিহাসে তো দেশীয় মানস, লোকজ সংস্কারকেই শেষ অবধি জয়ী হতে দেখি। এজন্যে এদেশে বিশুদ্ধ বৌদ্ধ মতবাদ স্থায়ী হয়নি। নির্ভেজাল ব্রাহ্মণ্যবাদ জয়ী হয়নি। অবিকৃত মূল ইসলাম ব্যাপকতা লাভ করেনি। এর প্রমাণ রয়েছে হাজার বত্সরের বাংলা সাহিত্যে, বাংলা গানে। গীতিকা-গাথা সাহিত্যে যে জীবনের পরিচয় পাই মূলত তা লোকজীবন। লোকায়ত প্রেমের কাহিনি এ সাহিত্যে বিধৃত। কীর্তন-বাউল-মারফতি গানেরও অন্তর্নিহিত তত্ত্বটুকু হচ্ছে শুদ্ধ মানব সত্যের কথা। আসলে বাংলা সাহিত্যে, গানে যা পাই তা হচ্ছে সমন্বয়ের বলিষ্ঠ জীবনবোধ, লোক জীবনের মূল প্রাণকেন্দ্র থেকে তা উত্সারিত।

বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক আত্মীয়তা এই সংস্কৃতির সাথে। কেননা আমরা তো কালবিচ্ছিন্ন নই, প্রবাহবিচ্ছিন্ন নই। অতএব আবহমানকাল ধরে প্রবহমান যে সংস্কৃতিধারা, বহু বিচিত্র প্রভাব এবং প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দেশের মাটির আপন পরিবেশে লালিত ও পরিপুষ্ট যে বিশেষ সংস্কৃতি—সমস্ত কিছুকেই মিলিয়ে নিয়ে সেই যে ঐশ্বর্যসমৃদ্ধ জঙ্গম সংস্কৃতি, আজকের বাংলাদেশের মানুষের তাতে সহজ উত্তরাধিকার।    (শেষাংশ)

সূত্র: বাংলাদেশ : বাঙালি আত্মপরিচয়ের সন্ধানে/সম্পাদনা: মুস্তাফা নূরউল ইসলাম (সাগর পাবলিশার্স ঢাকা, ১৯৯০)