রমজানে খাদ্যে ভেজাল ও বাজার মনিটরিং

পবিত্র মাহে রমজানকে বলা হয় ত্যাগ-তিতীক্ষা ও সংযমের মাস। এই মাসে মুসলমানগণ যেমন বেশি বেশি ইবাদত-বন্দিগি করেন, তেমনি সকল প্রকার অন্যায়-অপকর্ম ও গর্হিত কাজ হইতে মুক্ত থাকিবার চেষ্টা করেন। কেননা এইসব পাপ কাজ হইতে বিরত থাকিতে না পারিলে রোজা পালনই নিরর্থকই হইয়া উঠে। বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশ। এখানকার নব্বই ভাগেরও বেশি মানুষ দাবি করেন যে, তাহারা মুসলিম; কিন্তু তাহাদের আচার-আচরণে তাহাদের ধর্মবিশ্বাসের প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ করা যায় না। যদি লক্ষ করা যাইত, তাহা হইলে এই পবিত্র মাহে রমজানেও খোদ রাজধানীতে ভেজালবিরোধী অভিযান প্রেরণের দরকার পড়িত না। খবরে প্রকাশ, গত পহেলা রমজানে রাজধানীতে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালাইয়া দুই বত্সর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ পচা খেজুর জব্দ করিয়াছে। পুরাতন ঢাকার বাদামতলির একটি গুদামে মেয়াদোত্তীর্ণ স্টিকার ও কার্টন পরিবর্তন করিয়া এইসব পচা-গলা, পোকা ধরা ও নিম্নমানের খেজুর শত শত নূতন কার্টনে ঢোকানোর প্রস্তুতি চলিতেছিল। এইসব খেজুরের প্যাকেটে ব্যবহার করা হয় ভুয়া কিউআর কোডও। খেজুর রোজাদারদের প্রিয় ইফতারি পণ্য; কিন্তু বাংলাদেশে আমদানিকৃত এই খেজুরই যদি হয় ভেজাল ও খাওয়ার অযোগ্য, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাইবেন?

মধ্যপ্রাচ্য তো বটে, এমনকি ইউরোপের দেশগুলিতেও ধর্মীয় উত্সবের সময় নিত্যপণ্যের বাজার এমনিতেই থাকে নিয়ন্ত্রিত। সেখানে অধিক পণ্য বিক্রয় হইবার আশায় পণ্যের দাম কমানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যাহার সহিত যোগ হয় বাড়তি ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি। যেমন এই বত্সর পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে কিছু কিছু পণ্যে ৫০ শতাংশের উপর মূল্যছাড় ঘোষণা করা হইয়াছে। দেশটির বড় বড় মার্কেট, সুপারশপ, খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দোকানগুলোতে লাগানো হইয়াছে বিশেষ মূল্যছাড় সম্পর্কিত নারা রকম পোস্টার। ইহাছাড়া খালিজ টাইমসের খবরে বলা হইয়াছে নিত্য প্রয়োজনীয় ৫০০টি পণ্যের দাম কমাইয়াছে কাতারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়। পুণ্যভূমি সৌদি আরবেও রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন পণ্যের দাম কমাইবার প্রতিযোগিতা বিদ্যমান; কিন্তু বাংলাদেশে দুঃখজনকভাবে তাহার বিপরীত চিত্র লক্ষ করা যাইতেছে। গত কয়েক বত্সর ধরিয়া রমজানের আগেভাগে কয়েক দফায় দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হইতেছে অতি কৌশলে। পরে তাহা কিছুটা কমিলেও ভোক্তা সাধারণদের সন্তুষ্ট আনিতে পারিতেছে না। এখানে রমজানে একদিকে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানো হইতেছে, অন্যদিকে বাড়িতেছে ভেজাল দেওয়ার প্রবণতাও। ইহাতে মানুষ দুইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছেন যাহা কোনো ধর্মপ্রাণ ব্যবসায়ী করিতে পারেন না কিছুতেই।

বাংলাদেশে রমজান মাস জুড়িয়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক রাখিতে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হইতেছে। বাজারগুলিতে গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি র্যাব-পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় রহিয়াছেন। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলির সহিত সমন্বয় করিয়া কাজ করিতেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। যেহেতু রমজান মাস সংযমের মাস, তাই খাদ্যের অপচয় করা মোটেও সংগত নহে যেখানে কোরআন শরীফে অপচয়কারীদের ‘শয়তানের ভাই’ হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে। এই নীতিও যদি আমরা মুসলমানগণ মানিয়া চলি, তাহা হইলে বাজারে স্থিতিশীলতা আনয়ন করা কঠিন কিছু নহে।