ইরান-মার্কিন ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা

ইরান-মার্কিন উত্তেজনা গত সপ্তাহে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বা তার সহযোগীদের ওপর যে কোনো হামলায় ইরানকে মার্কিন সম্মিলিত শক্তি মোকাবিলা করতে হবে। ইরানকে এই পরিষ্কার বার্তা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরিত হয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘আব্রাহাম লিংকন’। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ চায় না। তবে আমরা যে কোনো হামলার জন্য প্রস্তুত। এই লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড অঞ্চল—‘সেন্টকমে’ বোমারু বিমানবাহী রণতরী এবং হামলা সক্ষম সেনাগোষ্ঠী মোতায়েন করা হয়েছে। বোল্টন আরো বলছেন, উসকানিমূলক আচরণ ও হুমকির পাল্টা জবাব হিসেবে এব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ইরান এখন আক্রমণের প্রস্তুতিতে রয়েছে। যে কোনো সময়ে এই আক্রমণ হতে পারে। যদি তারা তৃতীয় পক্ষ যেমন মিলিশিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মাধ্যমে হামলা চালায় তাহলে আমরা তার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করব। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের হামলার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তথ্য পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, এটা একরকম গায়ে পড়ে ঝগড়া বাজানোর সামিল। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ করে ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হবার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান আক্রমণের জন্য অজুহাত খুঁজছে। মার্কিনিরা কোনো রকম তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই বলছে, ইরান আরোপিত মার্কিন কঠোর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর অপচেষ্টা করছে। সাম্প্রতিককালে গাজায় প্রতিরোধ ও হিজবুল্লাহর তত্পরতাকে তারা ইরান উত্সারিত মনে করছে। এ যেন উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা। গত বছর ইরানের পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নিয়মিত বাহিনীর অংশ কথিত ‘এলিট ফোর্স’ রেভ্যুলিশনারি গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকাভুক্ত করেছে। আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আরো জোরদার করার জন্য গত মাসের শেষের দিকে হোয়াইট হাউস থেকে এক বিবৃতি দেওয়া হয়। এতে বলা হয় ইরান থেকে যারা এখনও তেল কিনছে, নিষেধাজ্ঞা থেকে তাদের অব্যাহতির বিষয়টি তুলে নিবে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এপ্রিল মাসের পর চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্ককে নিষেধাজ্ঞার গ্যাড়াকল থেকে অব্যাহতির সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি আর বাড়াবে না যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের তেল রপ্তানিকে শূন্যের কোটায় নিয়ে যেতে এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্ শক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া ও জার্মানি পারমাণবিক নিরোধ চুক্তি করেছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বারাক ওবামা। সেই চুক্তির মূল বিষয় ছিল ইরান পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধ রাখবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু কমিশন ইরানের যে কোনো পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন করতে পারবেন। ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে সেজন্য দেশটির উপর আন্তর্জাতিক নজরদারি নিশ্চিত করার জন্য এ ব্যবস্থা করা হয়। ইরানের আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ খামিনী বলেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম, কিন্তু সে তা তৈরি করবে না এজন্য যে, এটি অন্যায়। মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতা কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না। উল্লেখ্য যে, ঐ আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তির বিনিময় বিশ্বশক্তিগুলো ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার মুসলিম-বিদ্বেষী ভূমিকার অংশ হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকে বলে আসছেন যে, তিনি ক্ষমতাসীন হলে ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করবেন। ২০১৮ সালে তিনি কোনোরকম আন্তর্জাতিক সংলাপ বা সমঝোতা ব্যতিরেকে এককভাবে ঐ চুক্তি বাতিল করেন। শুধু তাই নয়, তিনি আগের চেয়ে আরও কঠিনভাবে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশেষজ্ঞগণ এই নতুন মার্কিন পদক্ষেপ সম্পর্কে নানা ধরনের বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তারা মনে করেন সিরিয়ায় অব্যাহত যুদ্ধ এর একটি কারণ হতে পারে। সিরিয়ার যুদ্ধাবস্থা আমাদের ছোট গল্পের  সংজ্ঞার মতো—শেষ হয়েও হলো না শেষ। সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার চেয়ে ইরানকে বেশি দায়ী করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের ইসলামি রেভ্যুলুশনারি গার্ড সিরিয়ায় ঘাঁটি তৈরি করেছে। তারা পুতিন-সমর্থিত বাশার আল আসাদের সরকারকে অব্যাহত সামরিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন সমর্থিত সিরীয় বিদ্রোহীদের সর্বশেষ ঘাঁটি ইদলিব শহর পুনঃরুদ্ধারের চেষ্টা করছে আসাদ সরকার। সেখানে মার্কিন সমর্থিত বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইদলিব আক্রমণে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। সুতরাং, অভিযোগটি সরাসরি ইরানের দিকে যায়। পুতিনকে সমালোচনা করার ব্যাপারে ট্রাম্পের সতত অনীহা রয়েছে। সবদোষ নন্দঘোষ। ইরানের ওপর চাপিয়ে নৌবহর প্রেরণের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে সৌদিকেন্দ্রীক সমীকরণ রীতিমতো ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক দারিয়ুস শাহতামাসেবি তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, ‘সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত আরব জোটের সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে কাতার-তুরস্ক-ইরান জোট; যদিও এরই মধ্যে পাকিস্তানকে টানতে পেরেছে সৌদি আরব। জটিলতা এখানেও রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে ইরানের। তেহরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ।’ সুতরাং, ইরানকে কাবু করতে গিয়ে প্রকারান্তরে ইরান বিরোধী জোটকে শক্তিশালী করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে গত সপ্তাহে রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই  রিয়াবকভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও হুমকি সত্ত্বেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে তার দেশের সম্পর্ক ও সহযোগিতা বন্ধ হবে না। তিনি আরো বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পরমাণু কর্মসূচিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে পূর্বের  মতোই অব্যাহত থাকবে। মার্কিন ইরান বিরোধের আরেকটি কারণ ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ। সৌদি মিত্রবাহিনী সেখানে তেমন কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। সেখানে সৌদি পক্ষের নির্বিচার বোমাবর্ষণ এবং বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি আন্তর্জাতিক নিন্দা কুড়িয়েছে। খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘সৌদিকে হারাতে চান না’ একথা বলে পার পাচ্ছেন না। মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্রেটরা সৌদি যুদ্ধ অপরাধীদের সহায়তা ও  সহযোগিতা করার জন্য ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করেছেন। তারা এখন সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চায়। ক্রমশ ট্রাম্পের ইরান মোকাবিলার ভিত্তি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে তাদের দখলকৃত ইরাককে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে।

ইরাকের ক্ষমতাশীন শিয়া রাজনীতিকরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন তারা তাদের দেশকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দিতে চায় না। উল্লেখ্য যে, ইরাকে এখনো মার্কিন সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারে অভ্যন্তরীণ চাপ রয়েছে। ট্রাম্প সরকার ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পেতেও ব্যর্থ  হচ্ছে। ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় দেশগুলো তেহরানের সঙ্গে সম্পাদিত ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি অনুসরণ করে চলছে। তাদের বক্তব্য ইরান যখন জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থার দেওয়া সব শর্ত মেনে চলছে এবং তাদের যে কোনো সময় পরিদর্শনের সুযোগ করে দিচ্ছে তখন ঐ অবরোধ অনৈতিক। অবরোধের ফলে ইরান মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে ইরান এই সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য যেমন বিকল্প জোট করছে তেমনি তেল রপ্তানির ক্ষেত্র ও অনুসন্ধান করছে। ইতোমধ্যে ভারত, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও চীন নমনীয়তা দেখাচ্ছে। এদেশগুলোকে ছয়মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। ইরানের সহজাত মিত্র তুরস্ক ও কাতার সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প অবশ্য ঘোষণা দিয়েছেন পয়লা মে থেকে আর কোনো দেশ ইরান থেকে তেল কিনতে পারবে না। তবে বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, চীন, তুরস্ক, ভারত, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করবে। চীন গত মাসে ইরানের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ না করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরান-মার্কিন সম্পর্ক কোন পর্যায়ে পৌঁছে—সেটা সকলের জন্য উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে এই রণ-প্রস্তুতি অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই কি ইরানে আঘাত হানবে? যুদ্ধ বিশারদরা ব্যাপক যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন না। পৃথিবীর কোনো মানুষই যুদ্ধ চায় না। অবারিত শান্তি ও স্বস্তিই সকলের কাম্য। ইরানের বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরাক বা আফগানিস্তান আক্রমণের মতো অত সহজ হবে না।

n লেখক: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়