ছোলা মুড়ি শরবতে তৃপ্তির ইফতার

মুন্না রায়হান

ইফতারির মেন্যুতে খুব বেশি কিছু নয়। মুড়ি, ছোলা, পিঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপী আর লেবুর শরবত। শরবতের ভেতর বরফ কুচি দেওয়া। সারাদিন রোজা থাকার পর এই তীব্র গরমে ঠান্ডা শরবতের চেয়ে কাঙ্ক্ষিত খাবার আর কি হতে পারে।

ইফতারের তখনো প্রায় ১০ মিনিট বাকি। কাওরানবাজারে বস্ত্র ভবনের সামনে ফুটপাতে কাঠের চৌকির উপর একটি জামাকাপড়ের দোকানের একপাশে পেপার বিছিয়ে মাখানো হচ্ছে ইফতার। কেউ পিঁয়াজু, বেগুনি ভাঙছে, কেউ কাটছে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ। আবার কেউ বানাচ্ছে লেবুর শরবত। সবমিলিয়ে ৭/৮ জনের ইফতার। সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে ইফতার বানাচ্ছেন। জিজ্ঞেস করতেই একজন বললেন, তার নাম জয়নাল। ফুটপাতে কাপড়ের ব্যবসা করেন। তারা যে কয়জন এখানে ইফতার করছেন তারা সবাই কাপড়ের ব্যবসা করেন।

জয়নাল বলেন, গরীব মানুষের আবার ইফতার। তবে সারাদিন রোজা থাকার পর যাই দিয়ে ইফতার করি, খুব ভালো লাগে। এখানেই ইফতার বানাচ্ছেন আনিছার। তিনি ছোটদের জামাকাপড় বিক্রি করেন। আনিছার তাদের সাথে ইফতার করার দাওয়াত দিয়ে বলেন, আমরা ৮ জনের ইফতার বানাচ্ছি। কিন্তু ১০/১২জনও ইফতার করতে পারবে। ইফতারির খাবারে বরকতই আলাদা। তিনি বলেন, রোজা রেখে পথ চলতে গিয়ে অনেকেই যানজটসহ নানা কারণে ইফতার করতে পারেন না। এ রকম মানুষও তাদের সাথে ইফতার করেন।

কাওরানবাজার মসজিদের সামনে ভ্যানগাড়ির উপর গোল হয়ে বসে ইফতার করছেন কয়েকজন। কাছে যেতেই আমন্ত্রণ জানালেন, তাদের সাথে ইফতার করতে। তাদের মেন্যুতে রয়েছে মুড়ি, পেঁয়াজু, ছোলা আর বেগুনি। এখানে ইফতার করা ভ্যানচালক রফিক বললেন, তার বাড়ি নীলফামারী। প্রায় ১০ বছর ধরে কাওরানবাজারে তিনি ভ্যান চালান। তার মূল কাজ রাতে। সারারাত সবজি পরিবহনের কাজ করেন। রফিক বলেন, ইচ্ছা হয় ভালোমন্দ দিয়ে ইফতার করি। কিন্তু সব টাকা ইফতার করে শেষ করলে কি হবে? ঘর-সংসার আছে না। এখানেই ইফতার করছেন রিকশাচালক মোজাম্মেল। তার বয়স পঁচিশের কাছাকাছি। মোজাম্মেল বলেন, রিকশা চালিয়ে আয়-রোজগার ভালোই। কিন্তু দেশে বাপ-মায়ের জন্য টাকা পাঠাতে হয়। আবার নিজেরও থাকা-খাওয়ার খরচ আছে। সবমিলিয়ে কুলিয়ে উঠা যায় না। আরেক ভ্যানচালক রমজান বলেন, রোজা রেখে কষ্ট করে ভ্যান চালাই। যা আয় করি তা দিয়ে ভালো ইফতারি করলে বাড়িতে কি পাঠাবো। এজন্য ফুটপাত থেকে ছোলা-মুড়ি কিনে ইফতারি করি। টাকা জমিয়ে ঈদে বাড়িতে গিয়ে খরচ করবো।

কাওরানবাজারের আড়তগুলোর ভেতরেও ইফতার হচ্ছে। ৭/৮জনের দলে ভাগ হয়ে হয়ে আড়তের মেঝেতে বসে গামলায় ইফতার মাখিয়ে তারা ইফতার করেন। এদিকে কাওরানবাজারের পাশেই একটি পাঁচ তারকা হোটেল। এই হোটেলের অনেক ইফতারি পদের নামও হয়তো এইসব স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষ জানে না। তাদের কাছে ফুটপাতের ইফতারিই সেরা।