কিংবদন্তির বিদায়! সুবীর নন্দী গানে, আচরণে, সাধনায় একজন নিবেদিত প্রাণ শিল্পীর প্রতিচ্ছবি যিনি তরুণ শিল্পীদের কাছে ছিলেন অনুকরণীয়। আর বাংলার মানুষের কাছে ছিলেন প্রাণের শিল্পী। সেই নন্দিত শিল্পী সুবীর নন্দীকে চোখের জলে ভাসিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছায় বিদায় জানালেন বাংলার মানুষ। শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ সংগীত জগতের কলাকুশলী ও শিল্পীদের ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের পদচারণায় ভরে গিয়েছিল। তারা গিয়েছিলেন প্রিয় শিল্পীকে ভালোবাসা জানাতে। গিয়েছিলেন বিদায় জানাতে। তারা বললেন, সুবীর নন্দীর মতো শিল্পীরা কখনো মরেন না। তার নশ্বর দেহ সর্বভূতে মিলিয়ে গেলেও তার গান তার সৃষ্টি বাংলার মানুষের হূদয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।সুবীর নন্দীর মরদেহ গতকাল বুধবার ভোরে দেশে এসে পৌঁছায়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার গ্রীণ রোডের বাসভবনে। যেখানে স্ত্রী পূরবী নন্দী ও মেয়ে ফাল্গুনী নন্দীসহ প্রিয়জনরা শেষ বিদায় জানান। এ সময় কান্নায় ভারী হয়ে উঠে চারপাশের পরিবেশ। পরে তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে। সেখানে ফুলে ফুলে ঢেকে যায় তার কফিন। সেখান থেকে সুবীর নন্দীর মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় সেখানে তার নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে এসে প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, আমাদের সংগীতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ একজন শিল্পী। আমরা শিল্পীরা যেটাকে সত্যিকারের ‘শিল্পী’ বলি।
শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্বে সুবীর নন্দীর মেয়ে ফাল্গুনী নন্দী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সবার প্রতি। বলেন, ‘আমাদের কেউ আর রইলো না। বিশেষ করে আমাকে সারাক্ষণ আগলে রাখতেন বাবা। আমার একটু কষ্ট হলে পাগল হয়ে যেতেন। বাবা জীবনের শেষ দিনগুলোতে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। লড়াই করা শিখিয়েছেন।’
শহিদ মিনারে সুবীর নন্দীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন সর্বস্তরের জনগণ। ব্যক্তিগতভাবে সুবীর নন্দীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, গীতিকার মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুরকার শেখ সাদি খান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, শিল্পী খুরশিদ আলম, রফিকুল আলম, ফকির আলমগীর, তিমির নন্দী, শুভ্র দেব, ফুয়াদ নাসের বাবু, মানাম আহমেদ, সুমনা হক, রবি চৌধুরী, এন্ড্রু কিশোর, এসডি রুবেল, কুমার বিশ্বজিত্, খায়রুল আনাম শাকিল, শহীদুল্লাহ ফরায়েজী, চিত্রনায়িকা নূতন, শিল্পী সাব্বির, নিশিতা বড়ুয়া, কিশোর, মুহিন প্রমুখ।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জয় বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্যজোট, হবিগঞ্জ খেলাঘর, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, সারগাম ,ললিতকলা একাডেমি, বাংলাদেশ বেতার নিজস্ব শিল্পী সংস্থা, গণসাক্ষরতা অভিযান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, দনিয়া সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদ, চট্টগ্রাম মিউজিশিয়ান ক্লাব, জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগ, ছায়ানট, সরকারি সংগীত কলেজসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠন।
এরপর রামকৃষ্ণ মিশনে আরো এক দফা শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সবুজবাগের রাজারবাগ বরদেশ্বরী কালীমন্দির ও শ্মশানে। সেখানেই অনুষ্ঠিত হয় তার শেষকৃত্য।